লেজ তুলে তার পাশ দিয়ে দৌড়ে যেতে-যেতে একটা সবুজ রঙের গিরগিটি হঠাৎ থেমে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল–ছেলেটা কাঁদছে কেন?
সূর্য-কণার উদ্দেশ্যে উড়তে উড়তে একটা প্রজাপতিও সেই একই প্রশ্ন করল–তাইতো, তাইতো!
একটা ডেইজি ফুল তার প্রতিবেশীকে জিজ্ঞাসা করল–ব্যাপারটা কী বল তো?
উত্তর দিল নাইটিংগেল–ও কাঁদছে লাল গোলাপের জন্যে।
সবাই চিৎকার করে উঠল-লাল গোলাপের জন্য? অবাক কাণ্ড! ওদের মধ্যে সবচেয়ে নৈরাশ্যবাদী বাচ্চা গিরগিটিটা হেসে উঠল হো-হো করে।
কিন্তু ছেলেটির দুঃখ কোথায় তা বুঝল নাইটিংগেল। ওক গাছের পাতার মধ্যে চুপটি করে বসে সে প্রেমের রহস্যের কথা ভাবতে লাগল।
হঠাৎ দুটো ডানা মেলে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল শন্যে; তারপরে হাওযার বকে উডতে লাগল। তারপরে ছায়ার মতো সে বাগানের ওপর দিয়ে গেল উড়ে ঘাসের জডিমের মাঝখানে একটি সুন্দর গোলাপ গাছ দাঁড়িয়ে ছিল। তারই পাশে গিয়ে সে বলল–আমাকে একটা লাল গোলাপ দাও।প্রতিদানে তোমাকে আমি আমার সবচেয়ে মিষ্টি গান শোনাব।
ঘাড় নেড়ে গোলাপ গাছটি বলল–আমার সব ফলই সাদা। সমুদ্রের ফেনার মতো সাদা। পাহাড়ে যে বরফ জমে থাকে এর রঙ তার চেয়েও সাদা। পুরনো সূর্য-ঘডির কাছে আমার ভাই রয়েছে। তুমি বরং সেইখানে যাও; তুমি যা চাইছে সে হয়তো তোমাকে তা দিতে পারে।
সূর্য-ঘড়ির কাছে গিয়ে নাইটিংগেল সেই গোলাপ গাছটিকে বলল–আমাকে একটি লাল গোলাপ দাও। প্রতিদানে আমি তোমাকে আমার সবচেয়ে মিষ্টি গান শোনাব।
গাছটি ঘাড় নেড়ে বলল–আমার ফুল হলদে-জল অপ্সরীদের কেশদামের মতো পীতবর্ণের, মাঠে-মাঠে যে ড্যাফোডিল ফুল ফোটে তাদের চেয়েও বেশি গীত। কিন্তু ওই ছাত্রটির জানালার ধারে আমার একটি ভাই থাকে। তার কাছে যাও, সে হয়তো তোমাকে লাল গোলাপ দিতে পারে।
ছাত্রটির জানালার নীচে যে গোলাপ গাছটি জন্মেছে নাইটিংগেল তার কাছে গিয়ে। বলল–আমাকে একটি লাল গোলাপ দাও। আমি তোমাকে আমার সব চেয়ে মিষ্টি গান শোনাব।
কিন্তু গাছটি ঘাড় নেড়ে বলল–আমার সব গোলাপই লাল-ঘুঘু পাখির পায়ের মতো। লাল-সমুদ্রের তলায় যে প্রবাল রয়েছে তার চেয়েও লাল। কিন্তু শীত আমার শিরাগুলিকে ঠান্ডায় জমাট বাঁধিয়ে দিয়েছে, আর ফোঁটার আগেই কুয়াশা নষ্ট করে দিয়েছে আমার কুঁড়িগুলিকে। ঝড়ে ভেঙেছে আমার ডালা সারা বছরই আমার ডালে কোনো ফুল ফোটেনি।
নাইটিংগেল চিৎকার করেই বলল–আমি কেবল একটি লাল গোলাপই চাই–মাত্র একটি। সেটা পাওয়ার কি কোনো উপায় নেই?
গাছটি বলল–আছে। কিন্তু সেটি এত বিপজ্জনক যে বলতে আমি সাহস পাচ্ছি নে।
আমাকে বল। কোনো কিছু করতেই আমি ভয় পাব না।
গাছটি বলল–যদি তুমি লাল গোলাপ পেতে চাও তাহলে চাদর আলোয় গান গেয়ে তোমাকে তা তৈরি করতে হবেঃ রঙিন করে তুলতে হবে তোমার হৃদয়ের রক্ত দিযে। কাঁটার বুকে বুক ঠেকিযে আমাকে তোমার গান শোনাতে হবে। সারা রাত ধরেই গান গাইতে হবে তোমাকে সেটা প্রবেশ করবে তোমার হৃদয়ের গভীরে, তোমার হৃদয়ের রক্ত ঝরে-ঝরে আমার শিরায় প্রবেশ করে আমার নিজস্ব হয়ে উঠবে।
নাইটিংগেল চিৎকার করে বলল–একটা লাল গোলাপের জন্যে মৃত্য-দামটা বড়ো বেশি। হয়ে যাচ্ছে। জীবন সকলের কাছেই অত্যন্ত প্রিয়। সবুজ অরণ্যের মধ্যে বসে থাকা বড়ো মধুর, বসে-বসে সোনার রথে সূর্য আর মুক্তার রথে চাঁদকে ভেসে বেড়াতে দেখতে খুবই ভালো। লাগে। তবু জীবনের চেয়ে মহত্তর প্রেম; আর মানুষের হৃদয়ের কাছে পাখির হৃদযের দাম কতটুকু!
এই ভেবে তামাটে রঙের পাখা মেলে সে আকাশে উড়ে গেল।
যুবকটির ঘাসের ওপরে পড়ে কাঁদছিল;সে ফিরে এসে দেখল তার সুন্দর চোখ দুটির ওপর থেকে তখনও জলের দাগ মুছে যায়নি।
সে চিৎকার করে বলল–শান্ত হও। লাল গোলাপ তুমি পাবে। চাঁদের আলোতে বুকের রক্ত দিয়ে সারা রাত্রি গান করে তোমার জন্যে একটি লাল গোলাপ আমি সৃষ্টি করব। প্রতিদানে আমি কেবল এইটুকু চাই যে তুমি সত্যিকার প্রেমিক হবে, কারণ বিজ্ঞ দার্শনিকের চেয়েও প্রেম বি, ক্ষমতাশালীর চেয়েও প্রেমের ক্ষমতা অনেক বেশি।
মুখ তুলে তাকিয়ে ছেলেটি কথাগুলি শুনল; কিন্তু পাখিটি কী বলতে চাইছে তা সে বুঝতে পারল না; কী করে পারবে? বই-এ লেখা না থাকলে কোনো কিছুই সে বুঝতে পারে না।
কিন্তু ওক গাছ সবই বুঝতে পারল; এবং পেরে দুঃখিত হল। তার কোটরে নাইটিংগেল পাখি বাসা বেঁধেছিল। তাকে ওক গাছ সত্যিই বড়ো ভালবাসত।
ঝোঁপের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে ছেলেটি নিজের মনে-মনেই বলুল–মেয়েটির চেহারা যে নিখুঁত সে-বিষয়ে কারও কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয় কিন্তু অনুভূতি বলে তার কি কিছু রয়েছে? সেদিক থেকে আমার সন্দেহ যথেষ্ট। আসল কথাটা হচ্ছে অধিকাংশ আর্টিস্টের মতোই তার রয়েছে কেবল ভঙ্গিমা–আর সেটাই হল অন্তঃসারশূন্য। পরের জন্য কোনোরকম আম্লত্যাগ সে করবে না। সে কেবল তার সঙ্গীতের কথাই চিন্তা করে আর সবাই জানে যে কলা মাত্রেই স্বার্থপর, কিন্তু তবু তার কণ্ঠস্বরটি যে বড়ো সুন্দর সেকথা স্বীকার করতেই হবে। কী দুঃখ! কণ্ঠস্বর অর্থহীন। কারও কোনো মঙ্গল তা দিয়ে হয় না।
আকাশে চাঁদ উঠতেই নাইটিংগেল পাখিটি সেই গোলাপ গাছের কাছে উড়ে এল। কাঁটার মুখে ঠেকিয়ে দিল তার বুক। সেইভাবে বুকটা রেখে সারা রাত্রি ধরেই সে গান গাইল। হেলে পড়ে সেই গান শুনতে লাগল চাঁদ। সারা রাত্রি ধরেই গান গাইতে লাগল সে। আর কাঁটাটা মুহূর্তে-মুহূর্তে তার বুকের মধ্যে ঢুকতে লাগল। একটু একটু করে ধীরে-ধীরে চুঁইয়ে-চুঁইয়ে শেষ হয়ে এল তার ধমনীর রক্ত গোলাপ গাছের ডালে একটি সুন্দর ফুল ফুটে উঠল।
