তিনি যা বললেন লোকেরা তাই করল। ফুলারাস-এর মাঠের এক কোণে যেখানে কোন শাকসজি জন্মাতো না, তারা গভীর গর্ত খুঁড়ে সেই মৃতদেহ দুটিকে শুইয়ে দিল।
তৃতীয় বছর শেষ হলে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিনে পাদরি গির্জায় গেলেন। ঈশ্বরের ক্ষত দেখানোর জন্যে সেখানে তিনি উপস্থিত হলেন। অনেক লোকও জমায়েত হয়েছিল সেখানে। ঈশ্বরের ক্রোধের সম্বন্ধে তাদের তিনি কিছু বলতে চেয়েছিলেন।
ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পোশাক পরে, তিনি গির্জায় ঢুকেলেন, বেদীর সামনে নোয়ালেন তাঁর মাথা। এমন সময় তাঁর চোখে পড়ল বেদীর ওপরে অদ্ভুত কতগুলি ফুল ছড়ানো রয়েছে। দেখতে সেগুলি কেবল অদ্ভুত-ই নয়-সৌন্দর্যও তাদের বড়ো অদ্ভুত। সেই সৌন্দর্য তাঁকে অস্থির করে তুলল। তাদের গন্ধ তাঁর নাকে ঢুকল। কারণটা বুঝতে পারলেন না বটে, কিন্তু তাঁর বেশ ভালো লাগল। গির্জার দরজা খুলে রঙিন চিঠির কাগজটা বার করলেন। তারপরে কাপড়ের মধ্যে সেটিকে জড়িয়ে ঈশ্বরের ক্রোধের কথা সমবেত জনতাকে বোঝাতে চাইলেন। কিন্তু সাদা ফুলগুলির সৌন্দর্য তাঁকে অস্থির করে তুলল। কিন্তু সে সব কথা তাঁর মুখ দিয়ে বেরোল না; যা বেরোল তা হচ্ছে প্রেমময় ঈশ্বরের কথা।
সেই কথা শোনার পরে সবাই অশ্রু বিসর্জন করল। গির্জার যে সব কর্মচারী কবর খোঁড়ার কাজ করে তাদের কাছে তিনি গেলেন। চোক দুটোতে তখন তাঁর জল ছাপিয়ে উঠেছে। নিম্নপদস্থ কর্মচারীরা এসে তাঁর ধর্মীয় পোশাকগুলি খুলে দিল। তিনি স্বপ্নাচ্ছন্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
পোশাক খোলার পর্ব শেষ হলে তিনি তাদের দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন–দেবীর ওপরে যে ফুলগুলি ছড়ানো রয়েছে ওগুলি কী ফুল? কোথা থেকেই বা ওগুলি তোমরা সংগ্রহ করেছ?
তারা বলল–ফুলগুলি কী তা আমরা জানি নে, কিন্তু ওগুলি এসেছে ফুলারাস-এর মাঠ থেকো।
এই কথা শুনে পাদরি কেঁপে উঠলেন নিজের ঘরে গিয়ে প্রার্থনায় বসলেন।
পরের দিন প্রত্যুষে, সঙ্গীদের নিয়ে তিনি সমুদ্রের তীরে এসে হাজির হলেন; সমুদ্রকে আশীর্বাদ করলেন; সেই সঙ্গে আশীর্বাদ করলেন সমুদ্রে যারা বাস করে তাদেরও রোমক বনদেবতা, বনের মধ্যে যে সব ছোটো ছোটো প্রাণি নেচে-নেচে বেড়ায তাদের আশীর্বাদ। করলেন–ঈশ্বরের সমস্ত সৃষ্ট প্রাণীদের মঙ্গলের জন্যে প্রার্থনা করলেন তিনি। জনতার মন আনন্দে ভরে উঠল। তারপর থেকে ফুলারাস-এর মাঠে আর কোনোদিন কোনো ফুল ফোটেনি; আগের মতোই জায়গাটা অনুর্বর রয়ে গেল। সামুদ্রিক প্রাণীরা আগের মতো সেই উপকূলে আর এল না–তারা অন্য উপকুলে চলে গেল।
নাইটিংগেল পাখি ও গোলাপ ফুল
The Nightingale and the Rose
একটি তরুণ ছাত্র আক্ষেপ করে বলল–মেয়েটি কথা দিয়েছে আমি যদি তাকে একটি লাল। গোলাপ এনে দিতে পারি তাহলে সে আমার সঙ্গে নাচবে। কিন্তু হায়রে, আমার সারা বাগানে একটি লাল গোলাপ নেই।
ওক গাছের ডালে বসে একটি নাইটিংগেল তার কথাগুলি শুনল; তারপরে সে পাতার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।
ছেলেটির সুন্দর চোখ দুটি জলে টলটল করছে।
সারা বাগানে আমার একটিও লাল গোলাপ ফোটেনি। হায়রে, কত ছোট ছোট জিনিসের ওপরেই না মানুষের সুখ নির্ভর করে! জ্ঞানী মানুষেরা আজ পর্যন্ত যা কিছু লিখেছেন সে-সবই আমি পড়েছি; দর্শনশাস্ত্রের গোপন রহস্যটুকুও আমার জানা। তবু একটি লাল গোলাপের অভাবে আমার জীবন আজ নষ্ট হতে বসেছে।
নাইটিংগেল পাখি বলল–এতদিন পরে সত্যিকারের একজন প্রেমিকের দেখা পেলাম। আমি জানতাম না এই জন্যে রাতের পর রাত আমি প্রেমের গান গেযেছি। রাত্রির পর রাত্রি নক্ষত্রদের কাছে আমি এরই গল্প বলেছি। এখন সাস্কাতে দেখলাম একো এর চুলগুলি। কচুরিপানার ফুলের মতো কালো কুচকুচে, ঠোঁট দুটি কামনার গোলাপী রঙে রাঙানো; কিন্তু উদগ্র কামনার বিবর্ণ হাতির দাঁতের মতো এর রঙ; গভীর একটা দুঃখ এর কপালে তার চিহ্ন এঁকে দিযেছে।
যুবকটি বিড়বিড় করে বলল–কাল রাত্রিতে রাজকুমার নাচের আসর বসাবেন। আমার প্রেমিকা যাবে সেখানে নাচতে। আমি যদি তাকে একটা লাল গোলাপ দিতে পারি তাহলে সে আমার সঙ্গে সারা রাত নাচবো আমি যদি তাকে একটা লাল গোলাপ এনে দিতে পারি। তাহলে সে আমার বাহুর মধ্যে ধরা দিয়ে আমার বুকের ওপরে তার মাথাটা রাখবে; তার দুটি হাত আমার দুটির কাছে আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু আমার বাগানে কোনো লাল গোলাপ নেই তাই আমি নিঃসঙ্গ অবস্থায় বসে রয়েছি, সে আমাকে অগ্রাহ্য করে চলে যাবে, সে তাকাবে না আমার দিকে; আমার হৃদয় যাবে ভেঙে।
নাইটিংগেল বলল–এইতো আসল প্রেমিক। আমি যে দুঃখের গান গাই সেই দুঃখই এ ভোগ করছে; আমার কাছে যেটা আনন্দ, এর কাছে সেইটাই দুঃখ প্রেম কতই না আশ্চর্য বস্তু! এমারেলড-এর চেয়েও দামি, ওপ্যাল পাথরের চেয়েও ও প্রিয়। কোনো দামেই ওকে কেনা যায় না; হাটে-বাজারে ও-জিনিস বিকোয় না।
যুবকটি আক্ষেপ করতে শুরু করল নাচের মজলিসে বাজনাদারেরা বসে-বসে বাজনা বাড়াবে, সেই বাজনার সুরে-সুরে আমার প্রেমিকা নাচবো এম লঘু পদসঞ্চারে সে নাচবে যে মেঝের ওপরে তার পা-ই যাবে না দেখা। রাজপুরুষেরা ভিড় করে দাঁড়াবে তার চারপাশে, কিন্তু আমার সঙ্গে সে আর নাচবে না–আমি তাকে কোন লাল গোলাপ দিতে পারিনি।–এই বলে সে ঘাসের ওপরে মুখ লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতে থাকো।
