কিন্তু যুবক ধীবর কোনো উত্তর দিল না। তার প্রেমের শক্তি এতই বেশি চব্বিশ ঘন্টাই সে তার প্রেয়সীকে ডাকতে লাগল-সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা। কিছু অপ্সরীর দেখা সে পেল না। কোথাও সে তাকে দেখতে পেল না।
দ্বিতীয় বছর এইভাবে শেষ হওয়ার পরে একদিন রাত্রিতে নির্জনে আত্মা তাকে বলল–শোন; তোমাকে আমি অন্যায় কাজ করার জন্যে প্রলুব্ধ করেছি, প্রলুব্ধ করেছি ভালো কাজ করার। জন্যে। কিন্তু দেখছি, আমার চেয়ে প্রেমর শক্তিই তোমার কাছে অনেক বেশি। তাই তোমাকে আর আমি প্রলুব্ধ করব না। অনুরোধ করছি, আমাকে তোমার হৃদয়ে প্রবেশ করতে দাও। আগের মতোই তোমার সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে যাই।
যুবক ধীবর বলল–নিশ্চয়, নিশ্চয়। কারণ হৃদয়হীন হয়ে তুমি যখন বিশ্বে ঘুরে বেড়িয়েছিলে তখন নিশ্চয়ই খুব দুঃখ পেযেছিলে।
আত্মা চিৎকার করে বলল–হায়, হায়! তোমার হৃদয় প্রেমে এমনই ভরাট হয়ে রয়েছে যে ঢোকার কোনো পথই যে আমি পাচ্ছি নে।
সে এই কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গে সমুদ্র থেকে বিরাট একটা আর্তনাদ উঠল। সমুদ্রের কোনো অধিবাসী মারা গেলে মানুষ এইরকম আর্তনাদ শুনতে পায়। এই শুনে যুবক ধীবর লাফিয়ে উঠল; তার কঞ্চির ঘর ছেড়ে দৌড়ে নেমে এল নীচে। কালোকালো ঢেউগুলি ঝাঁপিয়ে পড়ল। তীরের ওপরে। সঙ্গে নিয়ে এল বরফের চেয়ে সাদা একটি বস্তু। দেখে মনে হবে, তীরের ওপরে আছড়ে-পড়া সমুদ্র তরঙ্গ। তরঙ্গের ওপরে ফুলের মতো সেটা যেন আছাড় খেয়ে পড়ল। তাকে তরঙ্গ-শিশুরা তুলে নিল সমুদ্রের কাছ থেকে তাদের কাছ থেকে তাকে তুলে নিল ফেলারা। শেষ পর্যন্ত তাকে তুলে নিল উপকূলে তারপরে দেখা গেল ধীবরের পায়ের কাছে পড়ে রয়েছে জল-অপ্সরীর দেহটি-জল-অপ্সরীর মৃতদেহ।
যন্ত্রণায় পাগল হয়ে সে তার পাশে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার রক্তাক্ত ঠান্ডা ঠোঁটের ওপরে চুমু খেতে লাগল, তার সেই ভিজে সোনালি চুলগুলির ভেতরে আঙুল বোলাতে লাগল, বালির ওপরে লুটিয়ে পড়ে আনন্দ উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে সে কাঁদতে লাগল, দু’হাতে বুকের ওপর জড়িয়ে ধরল তাকে। তার ঠোঁট দুটি ঠান্ডা; তবুও সে তাকে চুম্বন করতে লাগল। তার চুলের স্বাদ নোনা। তবু একটা তিক্ত আনন্দে সে তাকে চুম্বন করল।
সেই মৃতদেহের কাছে সে তার পাপের স্বীকারক্তি করল। তিক্ত, তিক্ত তার আনন্দ; তার যন্ত্রণা একটি অদ্ভুত মাদকতায় উঠল ভরে।
কালো সাগর ক্রমশ তার কাছে এগিয়ে। কুষ্ঠরোগীর মতো সাদা ফেনা করতে লাগল বিলাপ ফেলার সাদা নখ দিয়ে সমুদ্র আঁচড়ে ধরল উপকূলকে। সমুদ্র সম্রাটের প্রাসাদ থেকে আবার বিলাপ ধ্বনি উঠল।
আত্মা বলল–পালাও, পালাও, সমুদ্র এগিয়ে আসছে। আর দেরি করলে ও তোমাকে হত্যা করে ফেলবে। পালাও, পালাও। তোমার মহৎ প্রেমের জন্যে, ভয় হচ্ছে, আমার প্রবেশের পথ হৃদয় তোমার রুদ্ধ করে দিয়েছে। নিরাপদ জায়গায় পালিয়ে যাও। নতুন জগতে নিশ্চয় তুমি আমাকে হৃদয়হীন অবস্থায় তাড়িয়ে দিতে চাও না।
কিন্তু যুবক ধীবর তার আত্মার আবেদনে সাড়া দিল না, সে অপ্সরীকে সম্বোধন করে বুলল–জ্ঞানের চেয়ে প্রেম মহর, সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান, নর্তকীর পায়ের চেয়ে। অনেক বেশি সুন্দর। আগুনে তাকে ধ্বংস করতে পারে না, জল পারে না তাকে নিঃশেষে পাল করতে। প্রভাতে তোমাকে আমি ডেকেছিলাম। সেই ডাক শুনে তুমি এসেছিলো চাঁদ তোমার নাম ডাকতে শুনেছিল; কিন্তু সে-ডাকে তুমি সাড়া দাওনি। কারণ অন্যায় কাজ করার জন্যে আমি তোমাকে ছেড়ে এসেছিলাম। এবং নিজের ক্ষতি করে আমি বিশ্বময় ঘুরে বেড়িয়েছি। তবু তোমার প্রেম আমার হৃদয়ে ভাস্বর হয়ে ছিল। যদিও আমি ভালো আর মন্দ দুই-ই দেখেছি, তবু কেউ তোমার প্রেম থেকে আমাকে বিচ্যুত করতে পারেনি। এখন তুমি মারা গিয়েছ। আমিও নিশ্চয় তোমার সঙ্গেই মারা যাব।
আত্মা তাকে নিরাপদে সরে যেতে অনুরোধ করলেও সে তার কথায় কর্ণপাত করল না। তার ভালোবাসা এতই বিরাট ছিল। সমুদ্র ধীরে-ধীরে কাছে আসতে লাগল তার ঢেউ দিয়ে তাকে গ্রাম করতে চাইল। যখন সে বুঝতে পারল তার সময় শেষ হয়ে আসছে তখন সে উন্মাদের মতো অপ্সরীকে চুমি খেতে লাগল; সেই দুঃখে ভেঙে যেতে লাগল তার হৃদযটা। প্রেমের প্রাচুর্যে তার হৃদযটা ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেল আত্মা-ভেতরে ঢুকে আগের মতোই ধীবরের সঙ্গে আবার এক হয়ে গেল। সমুদ্র এসে তার তরঙ্গ দিয়ে ঢেকে দিল তাকে।
প্রভাতে সমদ্রকে আশীর্বাদ করার জন্যে পাদরি এসে হাজির হলেন, কারণ, সমদ্র বেশ অস্থির হয়ে উঠেছিল। তাঁর সঙ্গে এলেন সন্ন্যাসী আর গাযকরা; আর এলো বাতিধারী কয়েকজন–আর এলো বিরাট একট দল। সমুদ্রের তীরে এসে দেখলেন যুবক ধীবরটি সমুদ্রের জলে ডুবে মরে রয়েছে; তাঁর হাত দুটি জড়িয়ে রয়েছে মৃত জল-অপ্সরীর দেহটিকে। কুটি করে তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন, তারপরে বললেন–এই সমুদ্র বা এই সমুদ্রের কোনো কিছুকেই আমি আশীর্বাদ করব না। সমুদ্রের বাসিন্দারা সব অভিশপ্ত, আর অভিশপ্ত তারা যারা এদের। সঙ্গে মেলামেশা করে আর সেই লোকটি যে তার ভালোবাসার জন্যে ঈশ্বরকে ভুলে। গিয়েছিল, এবং সেই ঈশ্বরের বিচারেই যে তার প্রণঘিনীর পাশে নিহত অবস্থায় পড়ে রয়ছে। তার দেহ আর তার প্রণয়িনীর দেহ এখান থেকে তুলে নিয়ে ফুলারাস-এর মাঠের এক কোণে কবর দাও। তাদের ওপরে কোনো চিহ্ন বা স্মৃতিস্তম্ভ থাকবে না। ওখানে কাদের কবর দেওয়া হয়েছে সেকথা কেউ যেন জানতে না পারে। কারণ বেঁচে থাকতেও তারা অভিশপ্ত ছিল, মৃত্যুতেও তারা তাই।
