তবু আত্মা তার কাছ থেকে সরে গেল না বা তার কথায় কান দিল না, তাকে বলল–ডাইনি। তোমার ওপরে যে মোহ বিস্তার করেছিল তার মূল্য এখন আর কিছু নেই। কারণ, আমাকে তুমি পরিত্যাগও করতে পারবে না। তোমাকেও আমি ছেড়ে যাব না। মানুষ জীবনে একবার। মাত্র তার আত্মাকে বিসর্জন দিতে পারে; কিন্তু সেই আত্মাকে যখন সে ফিরে পায় তখন সারা। জীবনই তাকে তার ধরে রাখতে হয়। শান্তি বা পুরস্কার যাই বল এইটিই তার প্রাপ্য।
যুবক ধীবরটি এই কথা শুনে বিবর্ণ হয়ে গেল, সে হাত দুটো মুঠো করে চেঁচিয়ে বলল–ডাইনি ঝুটা। সে আমাকে একথা বলেনি কেন?
আত্মা বলল–না, ডাইনি তার দেবতাকে পূজা করে। তাঁর প্রতি সে অবিশ্বাসিনী নয়, তাঁকেই সে চিরকাল সেবা করবে।
যুব ধীবরটি যখন বুঝতে পারল যে আত্মাকে আর সে বর্জন করতে পারবে না, আর সেই আত্মা তার মঙ্গলের প্রতীক নয়, এবং সে তার সঙ্গে চিরকাল থাকবে তখন সে মাটির ওপর লুটিয়ে পড়ে ভীষণভাবে কাঁদতে লাগল।
সকাল হলে যুবক ধীবর উঠে তার আত্মাকে বলল–যাতে তোমার নির্দেশ পালন করতে না হয় সেই জন্যে আমার হাত দুটো বেঁধে ফেলব; যাতে তোমার কথা মুখে উচ্চারণ করতে না হয় সেইজন্যে ঠোঁট দুটো আমি বন্ধ করে রাখব। যেখানে অল্মরী থাকে, যে আমাকে ভালোবাসে, আমি সেইখানেই ফিরে যাব। আমি কী অন্যায় করেছি, আর তুমি আমার কী ক্ষতি করেছ সে-সব কথা তাকে আমি বলব।
আত্মা তাকে প্রলুব্ধ করে বলল–তোমার প্রেয়সী কে যে তুমি তার কাছে ফিরে যাবে? তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর হচ্ছে এই পৃথিবী। এখানে স্যামারিস নর্তকীরা রয়েছে, তারা পাখি আর পশুদের মতো নাচতে পারে। তাদের পালি রঙ দিয়ে চিত্রিত; হাতে তাদের ছোটো-ছোটো তামার ঘন্টা। নাচতে-নাচতে তারা হাসে, তাদের হাসি জলের হাসির মতো। পরিচ্ছন্ন। আমার সঙ্গে এস; আমি তাদের দেখাব। যেটা পান করতে ভালো লাগে তার মধ্যে কি বিষ মেশানো থাকে? পাপ করে বলে চেঁচাচ্ছো কেন? বাজে চিন্তায় কষ্ট না পেয়ে আমার সঙ্গে আর একটি শহরে চল। কাছেই একটা ছোট্ট শহর রয়েছে। সেখানে টিউলিপ গাছের বাগান রয়েছ। এখানে অনেক মযুর রয়েছে। তাদের বুকগুলি সব নীল, সেখানে যে মেয়েটি তাদের খাওয়ায় সে মাঝে-মাঝে হাতের ওপরে নাচে, কখনো বা পায়ের ওপরে। তার নাকটি চড়াই পাখির ডানার মতো। নাচতে নাচতে সে হাসে; নাচার সময় তার নুপুরগুলি রুপোর ঘণ্টার মতো শব্দ করে। সুতরাং বাজে চিন্তা করে নিজেকে কষ্ট না দিয়ে আমার সঙ্গে সেই শহরে চল।
কিন্তু যুবকটি তার আত্মাকে কিছু না বলে ঠোঁট দুটি বন্ধ করে চোখ বুজে রইলা একটা শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধল তার দুটো হাত, যেখান থেকে এসেছিল সেইদিকে ফিরে গেল। তার আত্মা তাকে যতোই প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করুক না কেন সে কোনো উত্তর দিল না। সে তাকে দিয়ে যত অন্যায় কাজ করানোর চেষ্টাই করুক না কেন সেদিকে সে কোনো ভ্রূক্ষেপই করল না। এমনি তার প্রেম।
সমুদ্রের তীরে গিয়ে সে হাতের দড়ি খুলে দিল, ঠোঁট দুটো খুলল; তারপরে জল-অপ্সরীকে ডাকল। সারাদিন ধরেই তাক ডাকল সে; কিন্তু জল-অপ্সরী তার ডাকে সাড়া দিল না।
তখন আত্মা তাকে বিদ্রূপ করে বলল–এখন বুঝতে পারছ প্রেয়সীর কাছ থেকে কোনো আনন্দ পাওয়ারই সম্ভাবনা তোমার নেই। মৃত্যুর সময় ভাঙা কলসির ভেতরে যে মানুষ জল ঢালে তোমার অবস্থা সেই রকমই তোমার যা রয়েছে তাই তুমি বিলিয়ে দিচ্ছ প্রতিদানে কিছুই পাচ্ছ না তুমি আনন্দের উপত্যকা কোথায় রয়েছে তা আমি জানি, সেখানে কী রয়েছে তাও আমার অজানা নয। তাই আমার সঙ্গে আসাই তোমার ভালো।
কিন্তু যুবকটি কোনো উত্তর দিল না; পাহাড়ের ওপরে কঞ্চির একটা ঘর তৈরি করে সেখানে সে। বছর খানেক বাস করল। প্রতিটি দিন সকাল, দুপুর আর রাত্রি চব্বিশ ঘন্টাই সে জল-অপ্সরীকে ডাকত তবু সাগর থেকে উঠে কোনোদিনই সে তাকে দেখা দিল না। তার আত্মা প্রতিদিনই খারাপ কাজ করার জন্যে তাকে প্রলুব্ধ করতে লাগল, কিন্তু তাকে প্রলুব্ধ। করতে পারল না।
বছর খানেক পরে আত্মা ভাবল আমাকে প্রভুকে খারাপ কাজ করার জন্যে আমি প্রলুব্ধ করেছি; কিন্তু আমার চেয়ে তার প্রেমের শক্তি বেশি। আমি এখন তাকে ভালো কাজ করার জন্যে প্রলুব্ধ করব। তাহলে হয়তো সে আমার সঙ্গে আসে পারে।
এই ভেবে সে যুবক ধীবরকে বলল–বিশ্বে যত আনন্দ রয়েছে সে সব কথা আমি তোমাকে বলেছি। তুমি সেসব কথায় কান দাওনি। এখল জগতের দুঃখের কথা আমাকে বলতে দাও। তাহলে হয়তো তুমি তা শুনবে। কারণ সত্যি কথা বলতে কি যন্ত্রণাই হচ্ছে বিশ্বের সম্রাট। এমন কেউ নেই যে সে হাত থেকে বাঁচতে পারে। কারও কারও পরার পোশাক নেই, কারও নেই খাবার। এমন অনেক বিধবা রয়েছে যারা রক্তাক্ত হৃদয়ে বেঁচে রয়েছে এমন অনেক পতিহীনা রয়েছে যারা ছিন্ন পোশাকে বসে থাকে; রাজপথের ওপর দিয়ে ভিক্ষুকরা ঘুরে বেড়ায়; তাদের টাকার থলি শূন্য। শহরের পথে-পথে দুর্ভিক্ষ ঘুর বেড়ায; প্লেগ বসে রয়েছে তাদের ঘরের দরজায। এস, এদের দুঃখ আমর দূর করি। এখানে প্রেমিকাকে ডেকে ডেকে তুমি বৃথা সময়। নষ্ট করছ কেন? দেখতেই পাচ্ছ তোমার ডাকে সাড়া দিচ্ছে না অপ্সরী। তাছাড়া, প্রেমের দামই বা কী?
