সে কাপটা নিয়ে পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে ফেলল।
শহর থেকে এক লিগের মতো দূরে গিয়ে ভ্রূকুটি করে কাপটা দূরে ছুঁড়ে দিল; তারপরে আত্মাকে বলল তুমি আমাকে কাপটা নিয়ে লুকিয়ে ফেলতে বললে কেন? কারণ, একাজ করা অন্যায়-তাই না?
আত্মা বলল–শান্ত হও, শান্ত হও।
দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় তারা আর একটি শহরে এসে পৌঁছল। সে জিজ্ঞাসা করল–এই শহরেই কি সেই মেয়েটি নাচে?
তার আত্মা বলল–এই শহরে নয়। অন্য শহরে। তা হোক, চল, ভেতরে যাই।
সুতরাং তারা শহরে ঢুকলা চপ্পলের দোকানের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তারা দেখল এক কলসি জলের পাশে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আত্মা তাকে বলল–এই ছেলেটাকে মার।
সে ছেলেটিকে এমন মার মারল যে ছেলেটি কাঁদতে লাগল। ছেলেটিকে মেরেই তারা তাড়াতাড়ি শহর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
শহর থেকে এক লিগের মতো পথ গিয়ে যুবক ধীবরটি চটে গিয়ে বলল–তুমি আমাকে। ছেলেটিকে মারতে বললে কেন? এটা অন্যায় কাজ তা তুমি ভাল না?
কিন্তু আত্মাটি বলল–শান্ত হও, শান্ত হও।
তৃতীয় দিনের সন্ধ্যাকালে তারা একটি শহরে এসে উপস্থিত হল। যুবকটি ডিজ্ঞাসা। করল–এটা কি সেই শহর?
আত্মা বলল–মনে হচ্ছে যেন। চল, ভেতরে যাই।
সুতরাং তারা ভেতরে ঢুকে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু কোথাও সে কোনো নদী বা নদীর ধারে কোনো সরাইখানা দেখতে পেল না। শহরের লোকেরা তার দিকে কৌতূহলের দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে রইল। ভয় পেয়ে সে আত্মাকে বলল–চল, আমরা এখান থেকে চলে যাই; কারণ সাদা
পা যার সে-মেয়েটি এখানে নাচে না।
কিন্তু আত্মা বলল–না, আমরা এখানে অপেক্ষা করি এস। কারণ রাত অন্ধকার। রাস্তার ওপরে ডাকাতরা সব ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সুতরাং বাজারে সে বিশ্রাম নেওয়ার জন্যে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ পরে, মাথার ওপরে উঁচুটুপি চাপিযে একজন বণিক সেইদিকে এল। তাতারী পোশাক তার গায়ে। বণিক তাকে বলল তুমি এই বাজারে বসে রয়েছে কেন? দোকান বন্ধ রয়েছে না?
যুবক ধীবর বলল–এই শহরে কোনো সরাইখানা দেখছি নে; অথবা, এমন কোনো আত্নীয়-স্বজন এখানে নেই যার বাড়িতে আমরা আশ্রয় পেতে পারি।
বণিকটি বলল–আমরা সবাই সকলের আত্মীয় বই কী? ঈশ্বরই কি আমাদের সবাইকে সৃষ্টি করেননি? সুতরাং আমার সঙ্গে এস; কারণ, আমার একটি অতিথি নিবাস রয়েছে। ধীবর উঠে দাঁড়াল; বণিকের পিছুপিছু তার বাড়িতে এসে হাজির হল। ঘরে ঢোকার পরে বণিক তাকে পাদ্য-অর্ঘ্য দিয়ে অভ্যর্থনা করল, তৃষ্ণা মেটানোর জন্য এনে দিল পাকা তরমুভ। খেতে দিল একথালা ভাত আর একতাল সেদ্ধ মাংস।
খাওয়া-দাওয়ার পরে বণিকটি তাকে অতিথি-নিবাসে নিয়ে গেল, তারপরে তাদের ঘুমিয়ে পড়তে বলল। ধীবরটি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে পাঁঠার লোমের কার্পেটে শুয়ে পড়ল। তারপরে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
সকাল হতে তখন ঘণ্টা তিনেক বাকি, বলতে গেলে তখনো রাত্রি রয়েছে। আত্মা তাকে জাগিয়ে দিয়ে বলল–ওঠ; বণিক যে ঘরে শুয়ে রয়েছে সেই ঘরে গিয়ে তাকে হত্যা করা তারপরে তার ধনরত্ন নিয়ে নাও। কারণ, ওটার প্রয়োজন রয়েছে আমাদের।
যুবক ধীরবটি উঠে গুঁড়ি দিয়ে বণিকের ঘরে হাজির হল। বণিকের পায়ের দিকে একটা বাঁকানো তরোয়আল পড়ে ছিল। হাত বাড়িয়ে সে তরোয়ালটা তুলে নিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে বণিকটি জেগে উঠে বলল–উপকারের প্রতিদানে তুমি আমার এই অপকার করছ? তোমাকে যে দয়া আমি দেখিয়েছি তার পুরস্কার হিসাবে তুমি আমার রক্তপাত করছ?
আত্মা তাকে বলল তুমি ওকে আঘাত কর।
যুবক ধীবর বণিককে আঘাত করতেই সে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। তারপরে ধীবরটি তার নটা সোনার থলি নিয়ে চটপট বেরিয়ে এল তার বাড়ি থেকে। তখন সকাল হয়েছে।
শহর থেকে তারা এক লিগের মতো দূরে গিয়েছে এমন সময় যুবক ধীবরটি নিজের বুক চাপড়ে বলল–বণিককে আঘাত করে তার সোনা নিতে তুমি আমাকে বললেন কেন? নিশ্চয় তুমি আমার দুর্গ্রহ।
কিন্তু আত্মা বলল–শান্ত হও, শান্ত হও।
যুবক ধীবর চিৎকার করে বলল–না, আমি শান্ত হব না। তুমি আমাকে দিয়ে যা করালে সেসব কাজ করে নিজের ওপরে আমার ঘৃণা হচ্ছে তোমাকেও আমি ঘৃণা করি। তুমি আমাকে এই সব কাজ করাতে বাধ্য করলে কেন তা বলতে আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি।
তার উত্তরে আত্মা বলল–যখন তুমি আমাকে বিদায় দিলে তখন হৃদয়টা আমাকে তুমি দাওনি। সেই জন্যেই এই সব কাজ করতে আমার ভালো লাগছে।
যুবক ধীবর গজগজ করল–কী বলছ তুমি?
আত্মা উত্তর দিল-তুমিই তা ভালো জান। তুমি যে আমাকে হৃদয় দাওনি সেকথা কি তুমি ভুলে গিয়েছ? সুতরাং আমার কথা ভেবে তুমি অশান্তি ভোগ করো না। শান্ত হও। কারণ এমন কোনো যন্ত্রণা নেই যা তুমি বিসর্জন দিতে পার না, এমন কোনো আনন্দ নেই যা তুমি পাবে না।
এই সব কথা শুনে কাঁপতে-কাঁপতে সে আত্মাকে বলল–উঁহু। তুমি দুর্গ্রহ। তুমি আমাকে। আমার ভালোবাসাকে ভুলতে বাধ্য করে। আমাকে প্রলুব্ধ করে। পাপের পথে পা দিতে আমাকে প্ররোচিত করেছ।
আত্মা বলল–আমাকে যখন তুমি পৃথিবীর বুকে ছেড়ে দিয়েছিলেন তখন যে তুমি আমাকে হৃদ্য দাওনি সেকথা তোমার ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এস, অন্য এক শহরে আমরা যাই–সেখানে গিয়ে আনন্দ করি। আমাদের হাতে এখন ন‘থলে সোনা রয়েছে।
কিন্তু যুবক ধীবর সেই ন‘থলে সোনা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিল। তারপরে চিৎকার করে বলল–না, তোমাকে আমার আর প্রয়োজন নেই। তোমার সঙ্গে আর আমি কোথও যাব না। তোমাকে আগে একবার আমি যেমন বিতাড়িত করেছিলাম এখনো সেইরকম তাড়িয়ে দিচ্ছি। কারণ তুমি আমার কোনো দল করনি।
