সেটা কাল দেখা যাবে। কথা বলতে আর ভাল্লাগছে না এখন। আমি ঘুমাতে যাচ্ছি।
পরদিন বেশ বেলা করে ঘুম ভাঙলো ওদের।
ভাঁড়ারে গিয়ে দেখা গেল, খাবার ফুরিয়েছে। কিশোর আশা করলো, জনি ওদের জন্যে খাবার নিয়ে আসবে। আর যদি না-ই আসে, ওরাই যাবে ফার্মে, খাবার আনতে। রুটি, মাখন আর সামান্য পনির দিয়ে নাস্তা সেরে বসে রইলো জনির অপেক্ষায়।
এখান থেকে সোজা প্রজাপতির খামারে যাবো আমরা, কিশোর বললো। রবিন, মিসেস ডেনভারের সঙ্গে কথাবার্তা তুমিই বলবে। তোমার কথার জবাব হয়তো দিতে পারে। কারণ টাকাটা তুমিই তার হাতে দিয়েছে। কাজেই চক্ষুলজ্জার খাতিরে হলেও কিছু বলে ফেলতে পারে।
ঠিক আছে, মাথা কাত করলো রবিন। তা যাবো কখন? এখনই?
দেখি আরেকটু। জনি আসে কিনা।
জনি এলো না। প্রজাপতির খামারে রওনা হলো গোয়েন্দারা।
কটেজের কাছে এসে সাবধান হলো ওরা। টেড-এর সামনে পড়তে চায় না। কিন্তু কটেজে সে আছে বলে মনে হলো না। এমনকি প্রজাপতি মানবদেরও দেখা
গেল না।
প্রজাপতি ধরতে বেরিয়েছে হয়তো, মুসা বললো। ওই যে, মিসেস ডেনভার। কতগুলো কাপড় ধুয়েছে দেখেছো? খুব পরিশ্রম হয়েছে বোধহয়। দড়িতে টানাতেই হাত কাঁপছে এখন। রবিন, যাও, ওকে সাহায্য করো।
মহিলার কাছে চলে এলো রবিন। মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করলো, এই যে মিসেস ডেনভার, কেমন আছেন?…আহহা, অনেক কষ্ট হচ্ছে তো আপনার। দিন, আমি মেলে দিই। মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলো। ডান চোখের চারপাশ কালো হয়ে ফুলে উঠেছে। আরে, আপনার চোখে কি হলো?
মিসেস ডেনভারের কাছ থেকে কাপড়ের বালতিটা নিয়ে নিলো রবিন। বাধা দিলো না মহিলা। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রবিনের কাজ দেখতে লাগলো।
মিস্টার ডাউসন আর মিস্টার ডরি কোথায়? জিজ্ঞেস করলো রবিন।
বিড়বিড় করে যা বললো মহিলা, বুঝতে বেশ অসুবিধে হলো রবিনের। কথার মর্মোদ্ধার করতে পারলো শুধু, দুজনে প্রজাপতি ধরতে বেরিয়েছে।
আপনার ছেলে টেড কোথায়? আবার প্রশ্ন করলো রবিন।
হঠাৎ ফোঁপাতে আরম্ভ করলো মহিলা। নোংরা অ্যাপ্রন তুলে মুখ ঢেকে এগোলো রান্নাঘরের দিকে।
আশ্চর্য! আনমনে বিড়বিড় করলো রবিন। হলো কি আজ মহিলার! কাপড় মেলা বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি তার পেছনে পেছনে গেল সে। ধরে বসিয়ে দিলো রকিং চেয়ারটায়।
মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে রবিনের দিকে তাকালো মহিলা। তুমিই আমাকে ডলারটা দিয়েছিলে; না? রবিনের হাতে আলতো চাপড় দিয়ে বললো, খুব ভালো ছেলে তুমি। মনটা খুব নরম। জানো, কেউ ভালো ব্যবহার করে না আমার সঙ্গে। আর আমার ছেলেটা তো একেবারেই না। যখন তখন শুধু মারে।
আপনার চোখে ঘুসি মেরেছিলো, না? নরম গলায় সহানুভূতির সুরে বললো রবিন। কবে? কাল?
হ্যাঁ। টাকা চাইছিলো। ও সব সময় আমার কাছে টাকা চায়। আবার ফুপিয়ে উঠলো মহিলা। টাকা দিতে পারিনি বলে মেরেছে। তারপর পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেল ওকে।
কি বললেন! পুলিশ! নিশ্চয় আজ সকালে। অবাক হয়ে গেছে রবিন। পায়ে পায়ে অন্যেরাও এসে দাঁড়িয়েছে দরজার কাছে, তাদের কানেও গেছে কথাটা।
পুলিশ বললো, সে নাকি চোর, ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো মিসেস ডেনভার। মিস্টার হ্যারিসনের হাঁস চুরি করেছে। আগে এরকম ছিলো না আমার ছেলে। ওই শয়তান লোকগুলো এসেই তার সর্বনাশ করেছে, তাকে বদলে দিয়েছে।
কোন লোক? মহিলার হাড্ডি-সর্বস্ব হাতে হাত বুলিয়ে দিয়ে রবিন বললো, আমাদেরকে সব খুলে বলুন, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা আপনাকে সাহায্য করবো।
ওই লোকগুলো তাকে নষ্ট করেছে!
কোন লোক? কোথায় থাকে ওরা? এখনও কি এখানে লুকিয়ে আছে?
ওরা চারজন, এতো নিচু গলায় বললো মহিলা, শোনার জন্যে মাথা নিচু করে কান পাততে হলো রবিনকে। আমার ছেলেকে এসে বললো, ওদেরকে যদি খামারে লুকিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে অনেক টাকা দেবে। বদলোক ওরা, নিশ্চয় কোনো খারাপ মতলব আছে, তখনই বুঝেছি। ওপরে আমার শোবার ঘরে বসে কানাকানি, ফিসফাঁস করতো ওরা, দরজায় আড়ি পেতে সব শুনেছি।
মতলবটা কি ওদের, জানেন?হৃৎপিণ্ডের গতি দ্রুত হয়ে গেছে রবিনের।
কোনো কিছুর ওপর নজর রাখছিলো ওরা। পাহাড়ের ওদিকের কোনো কিছুর ওপর। কখনও দিনে, কখনও রাতে। আমার শোবার ঘরটাও দখল করেছিলো ওরা, এখানে ঘুমাতো। আমি ওদের খাবার বেঁধে দিতাম। কিন্তু এর জন্যে একটা পয়সাও দেয়নি আমাকে। জঘন্য লোক!
আবার কাঁদতে লাগলো মহিলা। সবাই এসে ঘরে ঢুকেছে। কোমল গলায় সান্ত্বনা দিলো কিশোর, কাঁদবেন না, মিসেস ডেনভার। এর একটা বিহিত আমরা করবোই।
বাইরে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল এই সময়। জানালার কাছে এসে দাঁড়ালেন মিস্টার ডাউসন। তোমরা! আবার এসেছে! কিশোর আর মুসার ওপর চোখ পড়তে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি। তোমাদের শাস্তির ব্যবস্থাও হয়েছে। পুলিশকে সব বলে দিয়েছি। আজ সকালে টেডকে যখন নিতে এসেছিলো তখন। রাতের বেলা আমার প্রজাপতির ঘর ভাঙো! মজা টের পাবে। কত্তোবড় সাহস, আবার এসেছে এখানে!
১৪
চলো যাই, জিনা বললো। এখানে আর কথা বলা যাবে না। মিসেস ডেনভারও বোধহয় আর কিছু জানে না। ওর ছেলেটাকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় খুব খুশি হয়েছি। আমি। আর এসে মাকে মারতে পারবে না। এমন বদমাশ ছেলে, মাকে মারে…
তোমরাও কি কম নাকি? জানালার বাইরে থেকে বললেন ডাউসন।
