গেল ব্যাটারা! হঠাৎ বড় বেশি ক্লান্তি লাগলো রবিনের। অবশ হয়ে গেছে যেন হাত-পা।
বেশিক্ষণের জন্যে না, রবিনের মানসিক শান্তি আবার নষ্ট করলো কিশোর। বাঁধের নিচে পড়েনি ওরা, পড়েছে অ্যারোইওর ভেতরে। ভেসে চলে যাবে শেষ মাথায়। স্রোতের জোর কম ওখানে। সাঁতরে পাড়ে উঠে আবার ধরতে আসবে আমাদের।
আগে আগে উঠছে এখন মুসা। কনডর ক্যাসলের চূড়ায় উঠে নিচে তাকালো সবাই। ঢাল থেকে খসে পড়ছে মাটি আর পাথর। বেরিয়ে পড়ছে নতুন নতুন পাথর, শেকড়। মাটি খসে গিয়ে যেন ক্ষত সৃষ্টি করছে পাহাড়ের গায়ে।
যেভাবে মাটি ভাঙছে, পাহাড়টাই না ধসে পড়ে। উল্টোদিকের ঢাল বেয়ে নামার সময় কললো মুসা। এবারেও আগে আগে চলেছে সে।
বেরিয়ে থাকা কয়েকটা পাথরের ওপাশে চলে গেল মুসা।
অন্য তিনজনও এলো পেছনে পেছনে।
কিন্তু মুসা নেই। গেল কোথায়?
১৭
বাতাসে মিলিয়ে গেছে যেন মুসা।
কোথায় গেল? এদিক ওদিক তাকাচ্ছে পিনটু, চোখে অবিশ্বাস।
মুসাআ! চিৎকার করে ডাকলো রবিন।
মুসা, কোথায় তুমি? ডেকে জিজ্ঞেস করলো কিশোর।
ঢালে যতদূর চোখ যায়, চোখ বোলালো ওরা। মুসার চিহ্নও নেই। সাড়াও দিলো। কান পেতে রয়েছে তিনজনে। তারপরে শোনা গেল আওয়াজটা। কোথা থেকে আসছে বোঝা গেল না।
আমি এখানে! নিচে! আবার শোনা গেল কথা। পাহাড়ের গভীর থেকে যেন ভেসে এলো মুসার চাপা কণ্ঠ।
কোথায় তুমি? জিজ্ঞেস করলো পিনটু। বুঝতে পারছি না।
এই যে এখানে। কয়েকটা বড় বড় পাথর আছে না, যেগুলো পেরিয়ে এসেছি, ওগুলোর গোড়ায়!
আরেকটু পাশে সরলো তিনজনে। চোখে পড়লো গর্তটা। আগের বার যখন এখানে এসেছিলো, তখন ছিলো না।
মাটি খসে যাওয়ায় বেরিয়েছে। রবিন কললো।
গর্তের মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো কিশোর, মুসা, বেরোতে পারছো না? সাহায্য লাগবে?
বেরোতে চাই না, জবাব এলো। এটা একটা গুহা। ভেতরে অনেক পাথর আছে। ইচ্ছে করলে গর্তের মুখ ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়া যাবে। কাউবয়েরা দেখতে পাবে না। জলদি নেমে এসো।
পরস্পরের দিকে তাকালো তিন কিশোর।
বেশ, আসছি, জবাব দিলো কিশোর।
তাড়াতাড়ি করো, নইলে ওরা চলে আসবে। অসুবিধে নেই, ভালো জায়গা। শুকনো, খোলামেলা।
একে একে ঢুকে পড়লো তিনজনে। টর্চ বের করলো রবিন।
জানতামই না এখানে গুহা আছে! পিনটুর কণ্ঠে বিস্ময়।
টর্চের আলোয় দেখা গেল, বেশি বড় না গুহাটা। গাড়ি রাখার গ্যারেজের সমান। নিচু হাত। মেঝেতে ছড়িয়ে আছে অনেক পাথর। এখনও শুকনো রয়েছে ভেতরটা। তার মানে মুখটা যে খুলেহে বেশিক্ষণ হয়নি। নইলে যে হারে বৃষ্টি হচ্ছে এতোটা শুকনো থাকার কথা নয়।
আলোটা আরও ঘোরাও তো, কিশোর ললো।
দশ বাই পনেরো ফুট হবে গুহাটা। একপাশে পাথর জমে উঁচু হয়ে গিয়ে হাতে ঠেকেছে। গুহামুখের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকালে কিশোর, বহুদিন বন্ধ হয়ে ছিলো মুখটা। হয়তো ভূমিকম্পে পাথর গড়িয়ে পড়ে…
যেভাবেই হয়েছে, হয়েছে, বাধা দিয়ে বললো মুসা, সেকথা পরেও ভাবা যাবে। এখন মুখটা বন্ধ করে দেয়া দরকার। নইলে কাউবয় ব্যাটারা এসে দেখে ফেলবে।
পাথরের অভাব নেই। চারজনে মিলে গড়িয়ে গড়িয়ে পাথর নিয়ে গিয়ে রাখতে লাগলো মুখের কাছে। দ্রুত বন্ধ করে দিলো গুহামুখ দিয়ে আসা বিকেলের ধূসর আলো। মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টিও আর ভেতরে আসতে পারছে না। দেয়ালে আরাম করে হেলান দিয়ে বসলো ওরা, হাসি ফুটেছে মুখে।
কয়েক ঘণ্টা থাকতে হবে আমাদের। অনুমান করলো কিশোর, আমাদের খুঁজে পাবেনা লোকগুলো। চলে যাবে। তার পর বেরোবো।
কারা ওরা? রবিনের প্রশ্ন।
ডয়েলের লোক, আর কে হবে? বললো পিনটু। নইলে ভাইয়ার হ্যাটই বা চুরি করবে কেন, আর ক্যাম্পফায়ারের পাশেই বা ফেলে রাখবে কেন?
গাড়ির চাবি খুঁজছে ওরা, কিশোর কললো। ভাবছি, গাড়িটা কোথায়? ওদেরকে তো একবারও গাড়িতে দেখা যায়নি।
গাড়ি যেখানেই থাকুক, মুসা বললো, চাবিটা ওদের ভীষণ দরকার। হয়তো ওদেরকে ফাসিয়ে দিতে ওই চাবিই যথেষ্ট, সেজন্যেই ওরকম হন্যে হয়ে খুঁজছে।
হতে পারে…
কি-ক্কি-ক্কিশোর…!
রবিনের তোতলামিতে থেমে গেল কিশোর। তাকালো টর্চের আলোর দিকে। গুহার পেছন দিকে ধরে রেখেছে রবিন।
ওই… ওই পাথরটার…
চোখ! ঢোক গিললো পিনটু। দাঁতও আছে!
খাইছে! কেঁপে উঠলো মুসার কণ্ঠ। খুলি!
স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হলো মুখ। উঠে এগিয়ে গেল সেদিকে।
খুলিই। ওখান থেকে বললো সে। এই এসে, মাটি খুঁড়তে হবে।
হাড়গোড় আছে। অস্বস্তিতে ভরা মুসার কণ্ঠ। ভূমিকম্পে মাটি চাপা পড়ে মরেছিলো হয়তো!
এই, কাপড় আছে, রবিন বললো।
একটা বোতাম! তুলে নিলো পিনটু। তামার তৈরি বোতামটায় ময়লা জমে কালো হয়ে গেছে। ঘষে পরিষ্কার করলো সে। আরি, আমেরিকান আর্মির!
ভূমিকম্পে মরেনি, বুঝলে, খুলিটা দেখতে দেখতে বললো কিশোর। খুন করা হয়েছে একে। এই দেখো, গুলির ফুটো।
উত্তেজিত গলায় বলতে লাগলো গোয়েন্দাপ্রধান, মনে হচ্ছে ঈগলের বাসাটা খুঁজে পেলাম! এখানেই লুকানোর মতলব করেছিলেন ডন পিউটো, তলোয়ারটাও হয়তো এখানেই লুকিয়েছেন। কনডর ক্যাসলের ঠিক নিচে এই গুহা, সূত্রের সঙ্গে মিলে যায়। তাঁর ছেলে স্যানটিনো নিশ্চয় জানতে এই গুহার কথা।
