রবিনের ব্যাগে যন্ত্রপাতি রয়েছে। ওগুলোর সাহায্যে গোড়া থেকে পাইপটা ভেঙে ফেললো মুসা। তারপর চারজনে মিলে পাথরের ওপর থেকে ভারি স্টোভটা সরিয়ে আনলো ওর। হাঁটু গেড়ে বসে পাথরটা সরানোর চেষ্টা করলো মুসা।
কিছুক্ষণ ঠেলাঠেলি করে জোরে হাউফ করে উঠে বললো, বেজায় ভারি। একলা পারছি না।
দেয়াল থেকে একটা তক্তা খুলে নেয়া হলো। বেশ শক্ত কাঠ। পাথরের নিচে ছোট একটা গর্ত করলো মুসা। সেটাতে ঢুকিয়ে দিলো কাঠের এক মাথা। ওটাকে লিভার হিসেবে ব্যবহার করে, আর অন্য তিনজনের সহায়তায় অবশেষে নড়াতে পারলো জগদ্দল পাথরটাকে। বেরিয়ে পড়লো একটা গর্ত। গর্তের ভেতরে উঁকি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো পিনটু, কি যেন দেখা যাচ্ছে!
ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে টেনে বের করে আনলো একটুকরো দড়ি, একটা কাগজ-বয়েসের ভারে হলুদ, আর গোল করে পাকানো একটুকরো ক্যানভাস-বাইরের দিকটায় আলকাতরা মাখানো।
কাগজটার দিকে তাকিয়ে পিনটু বললো, স্প্যানিশে লেখা। এই, আমেরিকান আর্মির একটা ঘোষণাপত্র এটা, তারিখ আঠারোশো ছেচল্লিশের নয় সেপ্টেম্বর। কিছু একটা আইন জারি করা হয়েছিলো।
ক্যানভাসটার ভেতর কি? হাত বাড়িয়ে ওটা নিলো কিশোর। সাইজ তো তলোয়ারের সমানই। ভেতরে আছে নাকি? মোড়কটা খুলে ফেললো সে।
দূর, কিছু তো নেই। বড়ই নিরাশ হলো মুসা।
পিনটু, গর্তে আর কিছু আছে?
রবিন এগিয়ে গেল টর্চ হাতে। গর্তের ভেতর ফেললো। পিনটু হাত ঢুকিয়ে হাতড়ে হাতড়ে দেখতে লাগলো। না, নেই…না না, আছে! ছোট পাথরের মতো…
পাথরটা বের করে আনলো সে। সাধারণ পাথরের মতোই দেখতে। তবে মাটি লেগেও ওরকম হয়ে থাকতে পারে ভেবে প্যান্টের কাপড়ে ঘষে পরিষ্কার করতে লাগলো। ঠিকই ভেবেছে। বেরিয়ে পড়লো ঘন সবুজ উজ্জ্বল রং।
এটা…,রবিন ওরু করলো, শেষ করলো কিশোর, পান্না! নিশ্চয়ই তলোয়ারটা লুকানো ছিলো এখানে প্রথমে এখানেই লুকিয়েছিলেন ডন। পালিয়ে আসার পর সরিয়ে ফেলেছিলেন অন্য জায়গায়। নিশ্চয় তার তখন মনে হয়েছিলো এটা নিরাপদ জায়গা নয়।
ঠিকই ভেবেছেন, রবিন বললো। সহজেই তো ব্বে করে ফেললাম আমরা।
তাহলে নিজেও এখানে লুকাননি, পিনটু বললো, এটাও ঠিক।
হ্যাঁ, একমত হলো কিশোর। পেছনে তাড়া করে আসছিলো ডগলাসেরা। সময় বিশেষ পাননি। তলোয়ারটা ব্বে করে নিয়ে গিয়েই তাড়াতাড়ি লুকিয়ে ফেলেছিলেন কোথাও, নিজেও লুকিয়ে পড়েছিলেন।
এই কিশোর,হঠাৎ বলে উঠলো মুসা, কিসের আওয়াজ?
কান পাতলো সবাই। বাইরে থেকে আসছে, বেশ জোরালো, ভূমিধস নামার সময় যেমন হয়, অনেকটা এরকম।
বৃষ্টি, রবিন বললো। সব জায়গায় পড়ছে, শুধু ঝুপড়িটার ওপর ছাড়া। বেশ মজা তো।
না, বৃষ্টি না, অন্য শব্দ, মুসা বললো আবার। শুনছো?
মাথা নাড়লো কিশোর। রবিনও শুনতে পায়নি। তবে পিনটু শুনলো। কথা! ফিসফিস করে বললো সে।
ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে এসে ঘন ঝোপে লুকিয়ে পড়লো ওরা। একটু পরেই দেখলো গিরিপথ ধরে আসছে সেই তিনজন কাউবয়। ভারি বৃষ্টির মধ্যেও হালকা ভাবে ভেসে আসছে ওদের কথা।
এদিকেই আসতে দেখেছি, শুডু। চারজনকেই। এগোও।
ঝুপড়িটার পাশ দিয়ে চলে গেল লোকগুলো, দেখতে পেলো না ওটা। অদৃশ্য হয়ে গেল পাহাড়ের আড়ালে।
উঠে দাঁড়ালো কিশোর। চলো ভাগি। এসে পড়ার আগেই। আবার কনডর ক্যাসলে যাবো।
লোকগুলো যে ঘাপটি মেরেছিলো, বুঝতে পারেনি ছেলেরা। ওরা বেরোতেই পেছনে চিৎকার করে উঠলো গুডু, ধরো! ধরো!
খিঁচে দৌড় মারার কথা বলে দিতে হলো না চারজনের একজনকেও।
১৬
কাদায় ভরা কাঁচা রাস্তায় পৌঁছার আগে থামলো না ছেলেরা। হাঁপাতে হাঁপাতে তাকালো ডানে-বাঁয়ে। বুঝতে পারছে না এখন কোনদিকে যাওয়া দরকার।
এটা দিয়ে গেলে, মুসা বললো, কাউন্টি রোডে যাওয়ার আগেই ধরে ফেলবে।
পাহাড়ে উঠতে গেলেও দেখে ফেলবে, বললো রবিন।
বাঁধের ওপর দিয়েও আর যাওয়া যাবে না এখন, পিনটু বললো। পানির যা তোড়। ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিজছে ওরা। কি করবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে।
বেরিয়ে এলো তিন কাউবয়। ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটে এলো ছেলেদের ধরার জন্যে। সঙ্গীদেরকে চেঁচিয়ে নির্দেশ দিচ্ছে গুড়।
রাস্তার দিকে যাই। মুসা বললো।
জোরে মাথা নাড়লো কিশোর, না না, অ্যারোইও! শেষ মাথায় চলে যাবো, বাঁধের কাছাকাছি। আমরা ওদিকে গেহি এটা ভাববে না ওরা।
একটা মুহূর্ত সময় নষ্ট করলো না হেলেরা, হুড়মুড় করে এসে নামলো অ্যারোইওতে। নিচে নামতে পারলো না, ওখানে পানি, কিনার ধরে চললো। পিচ্ছিল হয়ে আছে ঢালের মাটি, তার ওপর ঝোপঝাড়, দৌড়াতে পারলো না। তবে ঝোপ থাকায় গাহ ধরে ধরে মোটামূটি দ্রুতই এগোতে পারলো।
ওপরে রাস্তার কাদায় ভারি বুটের ছপাৎ হুপাৎ শব্দ হচ্ছে। মাটির ওপর উপুড় হয়ে পড়লো ছেল্লো, পিছলে যাতে পানিতে না গিয়ে পড়ে সেজন্যে গাছ আঁকড়ে ধরে রেখেছে। দুরুদুরু করছে বুক। ঠিক মাথার ওপরেই শোনা গেল কর্কশ কণ্ঠ, গেল কোথায় বদমাশগুলো!
এক্কেবারে ইবলিসের বাচ্চা!
চাবিটা সত্যিই পেয়েছে?
পেয়েছে। নইলে আমাদের দেখলেই পালায় কেন?
বাঁধের দিকে যায়নি তো?
গাধা নাকি? মরতে যাবে?
পাহাড়েও চড়েনি। তারমানে রাস্তা দিয়েই গেছে। এসো।
কাউন্টি রোডের দিকে ছুটলো তিন কাউবয়। চুপ করে পড়ে রইলো ছেলেরা। চ্যাপারালের ঝোপ আড়াল করে রেখেছে তাদের শরীর।
