কিশোর এই দৃশ্য দেখতে আসেনি। সেদিকে তাকালো বটে, তবে তার মন অন্য চিন্তায় ব্যস্ত। বিড়বিড় করে বললো, কোথায় একজন মানুষ দীর্ঘদিন লুকিয়ে থাকতে পারে?
এখানে তো নিশ্চয়ই নয়, বললো মুসা। গুহা তো দূরের কথা, একটা ফাটলও নেই।
আশেপাশে কোথায় গুহা আছে, পিনটু? রবিন জিজ্ঞেস করলো।
কি জানি, মাথা চুলকালো পিনটু। আমি বলতে পারবো না। পর্বতের ওদিকে অবশ্য আছে,
না, অতোদূরে নয়, মাথা নেড়ে বললো কিশোর। কাছাকাছি।
বাঁধের ভেতরটা হয়তো ফাঁপা, মুসা বললো।
আরে নাহ,মানতে পারলো না রবিন।
গোপন কোনো খাদ-টাদ থাকতে পারে, বললো কিশোর। যেখানে তাঁবু বা ঝুপড়ি তুলে থাকা যায়। বাইরে থেকে কারো চোখে পড়বে না।
ওরকম কিছুই নেই এখানে, কিশোর, পিনটু বললো। এদিকের সমস্ত পাহাড় আমি চিনি।
শ্রমিকদের বাড়িঘরের কি অবস্থা? রবিন জিজ্ঞেস করলো। নিশ্চয় অনেক কাজের মানুষ ছিলো ডন পিউটোর?
ছিলো। কিন্তু সব কাউন্টি রোডের ধারে, ভালো জায়গায়। একটাও এখন নেই।
পিনটু, জিজ্ঞাসু চোখে পিনটুর দিকে তাকালো মুসা, কাঁচা রাস্তাটা এক জায়গায় দুভাগ হয়ে গেছে দেখেছি। একটা তো এসেছে বাঁধের দিকে, আরেকটা কোথায় গেছে?
পর্বতের ভেতর দিয়ে ঢুকে আবার বেরিয়ে গিয়ে উঠেছে কাউন্টি রোডে, সিনর হেরিয়ানোর এলাকায়।
অ্যারোইওর ওপাশে দূরে একটা পথ দেখিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলো মুসা, ওই পথটার সাথে কোনো যোগাযোগ আছে ওটার?
পথ? ভুরু কুঁচকে চোখ ছোট ছোট করে তাকালো কিশোর, মুসা যা দেখেছে দেখার জন্যে।
হ্যাঁ, হাত তুললো পিনটু, ওই ওটার কথা বলছো তো? আছে। কাঁচা রাস্তা থেকে বেরিয়ে পাহাড় ঘুরে গেছে।
সবাই দেখেছে পথটা এখন। খুব সরু একটা পায়েচলা পথ, চ্যাপারালের ঝোপের ভেতর দিয়ে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে হারিয়ে গেছে পাহাড়ের গোড়ায় ওকে জঙ্গলে।
ছাউনি! হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো পিনটু। ভুলেই গিয়েছিলাম! পুরানো একটা ঝুপড়ি আছে। অনেক আগে এক বুড়ো বানিয়েছিলো, থাকতো ওখানে। তক্তা আর টিন দিয়ে। অনেক দিন যাই না।
ডন পিউটোর আমলে ছিলো ওটা? কিশোর জিজ্ঞেস করলো।
ছিলো। ভাইয়ার মুখে শুনেছি, আগে নাকি ওখানটায় একটা অ্যাডাব রুম ছিলো।
লুকানো, অব্যবহৃত, আর যাওয়ার পথটা শুধু কনডর ক্যাসল থেকেই দেখা যায়! উত্তেজিত হয়ে উঠেছে গোয়েন্দাপ্রধান। বোধহয় ওটাই জায়গা!
তাড়াহুড়ো করে আবার নামতে শুরু করলো ওরা। টিবির ঢালে পিছলে পড়া ঠেকাতে পারলো না একজনও, কাদায় মাখামাখি হয়ে গেল জুতো, প্যান্টে লেগে গেল কাদা। বাঁধ পার হয়ে যেতে হবে। উপচে পড়া পানির দিকে শঙ্কিত চোখে তাকালো কিশোর। ভেঙে-টেঙে পড়বে না তো পানির চাপে?
সব সময়ই ওরকম পানি হয়, পিনটু জানালো। পড়ে তো না। টিকে আছে শত শত বছর ধরে।
তাহলে চলো,মুসাও ভয় পাচ্ছে এতো পানি দেখে।
নিরাপদেই এসে পায়েচলা সরু পথটায় উঠলো ওরা। পথের দুই পাশে চ্যাপারাল জন্মেছে ঘন হয়ে, মাঝে মাঝে খাটো ওক। এদিকটায় মানুষজন আসে না, কোনো কাজও হয় না, ফলে ইচ্ছেমতো বাড়তে পেরেছে ঝোপঝাড়। একটা পাথুরে পাহাড়ের কাঁধ পেরিয়ে পথটা গিয়ে ঢুকেছে দুটো মাঝারি আকারের পাহাড়ের মধ্যে, গিরিপথ হয়ে গেছে। মেঘলা এই ধূসর দিনে পথটা ছায়াঢাকা, প্রায় অন্ধকারই বলা চলে।
ওই যে, হাত তুলে দেখালো পিনটু।
অনেক গাছপালা আর উঁচু উঁচু ঝোপের মধ্যে, পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে থাকা একটা বড় পাথরের নিচে আড়াল হয়ে আছে ঝুপড়িটা। ওটা যে আছে একথা জানা না থাকলে সহজে কারো চোখে পড়বে না। একচালা টিনের ছাউনি। মরচে পড়ে লাল হয়ে গেছে চাল। কাঠের বেড়া, তক্তার মাঝে বড় বড় ফাঁক। দরজায় ঠেলা দিলো পিনটু। খুলে মাটিতে পড়ে ধুলো ওড়ালো কপাটটা। ওপরের চ্যাপ্টা পাথরটার জন্যে বৃষ্টি পড়ে চালার ওপর। ভেতরটা খটখটে শুকনো।
একটা মাত্র, কাঁচা মেঝে। গারে খুটি ভর রেখেছে চালার। বিদ্যুৎ নেই, জানালা নেই, কোনো আসবাব নেই, শুধু এককোণে পড়ে রয়েছে মরচে পড়া একটা স্টোভ, একসময় ঘর গরম করার কাজে ব্যবহার হতো।
দুতিনটে বছর লুকিয়ে থাকা যাবে এখানে সহজেই, মুসা মন্তব্য করলো। তবে আমি দুই দিন থাকতেও রাজি না।
খুন করার জন্যে যদি সৈন্যরা তেড়ে আসতো, সেকেণ্ড, কিশোর বললো, আর তোমার সাথে থাকতো একটা দামী তলোয়ার, তাহলে তুমিও থাকতে পারতে। তবে জায়গাটা বাজে।
একেবারেই বাজে, বললো রবিন। আর কোনো জায়গাই তো নেই তলোয়ার লুকানোর।
হ্যাঁ, একমত হয়ে মাথা দোলালো পিনটু। মেঝেতে? মাটির দিকে আঙুল তুললো মুসা। পুঁতে রাখেননি তো ডন?
মাথা নাড়লো কিশোর। না। পুঁতলে মাটি খোঁড়ার আলামত বোঝা যেতোই তখন, সৈন্যদের চোখে পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা ছিলো। ওই ঝুঁকি নিশ্চয় নেননি ডন… পুরানো স্টোভটার দিকে চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো সে। একটা চ্যাপ্টা পাথরের ওপর রয়েছে ওটার পায়াগুলো, পাইপটা চালা ভেদ করে উঠে গেছে। স্টোভটা সরানো যায় না?
চেষ্টা করে দেখা যাক,মুসা বললো।
জোরে ঠেলা দিয়ে দেখলো সে। ভারি জিনিস, তবে নড়লো। নিচের পাথরের সাথে লাগানো নয় পায়াগুলো।
পাইপটা খুলতে পারো নাকি দেখো তো, কিশোর বললো। চেষ্টা করে দেখলো মুসা। খাইছে! মরচে। নড়েও না।
নড়বে কি করে? আঠারোশো ছেচল্লিশ থেকেই আছে হয়তো ওই অবস্থায়। পারলে ভেঙে ফেলে।
