পোড়া ধ্বংসস্তুপের দিকে তাকিয়ে একজনও খুশি হতে পারলো না।
এখানে কিছু পাবো না, বললো হাড্ডিসর্বস্ব ইঁদুরমুখো। কি করে বের করবো এখান থেকে, গুড়ু?
রে করতেই হবে, জবাব দিলো বিশালদেহী লোকটা।
সম্ভব না, গুডু, ইঁদুরের মতো কিচকিচ করে কথা বলে মোটা, টাকমাথা লোকটা। কোনো উপায় দেখছি না।
না খুঁজেই ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু করে দিলে? ধমকের সুরে বললো গুড়। এখানেই আছে।
বেশ, দেখছি, ইঁদুরের কণ্ঠ শোনালো আবার মোটো। লাথি মারতে আরম্ভ করলো জঞ্জালে। এমন একটা ভাব করছে, যেন যা খুঁজছে যে কোনো মুহূর্তে লাফ দিয়ে বেরিয়ে চলে আসবে চোখের সামনে।
এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি শুরু করলো ইঁদুরমুখো। খুঁজছে, তবে তেমন মন আছে বলে মনে হলো না। গুডু বলেছে, তাই খুঁজছে, এই আরকি।
রেগে গেল গুড। এটা কিরকম কাজ হচ্ছে নিকি! ভালোমতো খোজো।
গুডুর দিকে দীর্ঘ একটা মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে রইলো ইঁদুর, তারপর খোঁজায় আরেকটু মন লাগালো।
এই, হারনি, তুমিও ফাঁকি মারছে! টাকমাথাকে ধমক লাগালো বিশালদেহী।
সাথে সাথে মেঝেতে বসে পড়লো হারনি। চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে জঞ্জালের তলায়, ফাঁকফোকরে উঁকি দিয়ে দেখতে লাগলো। তার দিকে তাকালো একবার নিকি আর গুডু, দুজনেই বিরক্ত, দরজার ফ্রেমের দুই পাশে খুঁজতে শুরু করলো ওরা।
এখানেই হারিয়েছে? নিকি জিজ্ঞেস করলো গুড়ুকে। তুমি শিওর?
না হলে কি এসেছি নাকি? তাড়াতাড়ি পালানোর জন্যে ইগনিশনের কি করেছিলাম মনে নেই? পরে আরেক সেট লাগাতে হয়েছে।
খুঁজতে খুঁজতে অন্তত বার দুই মুসা আর রবিনের কাছাকাছি চলে এলো ওরা। একবার তো গুডু এতো কাছে চলে এলো, হাত বাড়ালেই তার জুতো ছুঁতে পারতো মুসা। লোকটার বুটের বিশেষ খাপে ঢোকানো ধারালো কাউবয় হুরিটার দিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো সে।
বুঝতে পারছি না কিছু কিছুক্ষণ পর আরও বিরক্ত হয়ে বললো নিকি। আর কোথাও হারায়নি তো?
গাধা নাকি! গর্জে উঠলো গুড়। এখানেই তো…
এতো ধমক মারছো কেন? সমান তেজে জবাব দিলো এবার নিকি। তারপর বললো, দেখি, বাইরে পড়লো কিনা।
আরেকবার খোঁজায় মন দিলো ইদরখো। তার দুরিটাও দেখতে পেলো মুসা।
হুঁ, অবশেষে বললো গুডু, বুঝতে পারছি, এভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আলো দরকার। চলো, আরেকবার গিয়ে খুঁজে দেখি, যেখানে সেদিন পার্ক করেছিলাম। কিছু না পেলে আলো নিয়ে এসে আবার খুঁজবো।
বেরিয়ে গেল তিনজন। চত্বরে ওদের কথা কাটাকাটি শোনা গেল কিছুক্ষণ। তারপর চুপ হয়ে গেল। বোধহয় চলে গেছে। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো রবিন আর মুসা। নির্জন চত্বর।
ওরা কে জানি না, রবিন কললো। তবে একটা কথা বোঝা গেল, আগুন লাগার দিন ওরা এসেছিলো এখানে। রিগোর হাট চুরির সঙ্গে ওদের কোনো সম্পর্ক আছে।
আমার মনে হয় গাড়ির চাবিটাবি হারিয়েছে ওরা।
আমারও তাই মনে হলো। মিষ্টার ডয়েলের ওখানে কাজ করে বোধহয়।
চাবি হারিয়ে থাকলে ব্যাপারটা সত্যি ওদের জন্যে বিপজ্জনক। কিংবা আর কারও জন্যে। এসসা, খুঁজি।
খুঁজলাম তো। ওরাও খুঁজলো নেই।
ওরা ঠিকমতো খোজেনি। এখন আমরা জানি কি খুঁজতে হবে। দরজার আশপাশে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জঞ্জাল তুলে দেখবো। একটা পোড়া কাঠ-টাঠ তুলে আনো না।
একটা বেলচাই পাওয়া গেল। যুই আর জঞ্জাল খুঁচিয়েতুলতে আরম্ভ করলো মুসা। যেই ধাতব কিছুতেই লাগে কেলচা, শব্দ হয়, অমনি দুজনে মিলে বসে পড়ে বেলচায় উঠে আসা জঞ্জালে হাত দিয়ে দেখে। প্রতিটি জিনিস রীক্ষা করে। ওদেরকে সাহায্য করার জন্যেই যেন মেঘ অনেকখানি পাতলা হয়ে এসেছে, আলো বেড়েছে, দেখতে সুবিধে হচ্ছে তাতে। মেঘের ফাঁকে এখন নীল আকাশও বেরিয়ে এসেছে কোথাও কোথাও।
হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো রবিন, মুসাআ! আঙুল নির্দেশ করলো একটা চকচকে জিনিসের দিকে।
তুলে নিলো মুসা। দেখার জন্যে এমনভাবে ঝুঁকে এলো রবিন, মাথা ঠোকাঠুকি হয়ে গেল দুজন্মে। থাবা মেরে প্রায় কেড়ে নিলো জিনিসটা মুসার হাত থেকে।
দুটো চাবি। রিঙে লাগানো। রিঙটায় একটা খাটো চেন, চেনের আরেক মাথায় রূপার একটা নকল ডলার।
কোনো চিহ্নটি আছে? মুসা জিজ্ঞেস করলো। নাম-টাম?
না। তবে গাড়ির চাবি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটাই খুঁজতে এসেছিলো লোকগুলো?
না-ও হতে পারে, অতোটা আশা করতে পারলো না মুসা। রিগোর চাবিও হতে পারে এটা। কিংবা তার কোনো বন্ধুর।
এই, তোমরা এখানে কি করছো?
ঝট্ করে ফিরে তাকালো মুসা আর রবিন। হারনি দাঁড়িয়ে আছে পোড়া দরজার কাছে।
পেছনে। রবিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো মুসা। কুইক! পেছনে ঘুরে দৌড় মারলো দুজনে। লাফিয়ে পেরিয়ে এলো জঞ্জালের কয়েকটা প। গোলাঘরের পেছনে ওক গাছগুলো পোড়েনি, এখনও জীবন্ত। ঢুকে পড়লো ওগুলোর ভেতরে। গাছের আড়ালে থেকে ফিরে তাকালো চত্বরের দিকে।
এই! কে ছেলেগুলো! শুডুর গর্জন শোনা গেল। পোড়া হাসিয়েনডার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
ঠিক এই সময় কোরালের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো নিকি, ডেকে বললো, গুডু, ছেলেগুলো নাকি কিছু পেয়েছে! হারনি বলেছে!
পাগলের মতো আশেপাশে লুকানোর জায়গা খুঁজলো রবিন আর মুসা। হাসিয়েনডার চত্বরে রয়েছে ওদের সাইকেল। ওগুলোর কাছে যেতে হলে লোকগুলোকে
পেরিয়ে যেতে হবে। এখানেও লুকানোর জায়গা নেই।
