ভালো রিগো। না, আমি ঘরে ঢুকিনি।…আমি…দাঁড়াও দাঁড়াও…হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে!
কী? চেঁচিয়ে উঠলো মুসা। জলদি বলুন! তাগাদা দিলো রবিন।
জ্বলজ্বল করছে এখন রিগোর চোখ। সরাসরি গোলাঘরে ঢুকেছিলাম, মিস্টার পাশাকে মাল দেখানোর জন্যে। ভেতরে আলো কম ছিলো। হ্যাটের কানা ছায়া ফেলছিলো চোখের ওপর, তাই খুলে হাতে নিয়েছিলাম। তারপর, ছেলেদের দিকে তাকালো সে, ওটা দরজার কাছে একটা হুকে ঝুলিয়ে রেখেছিলাম। ওটা ওখানেই থাকলো। হুগো আর ষ্টেফানো যখন আগুন আগুন বলে চিৎকার করে উঠলো হ্যাট না নিয়েই ছুটে বেরোলাম।
হুঁ। তাহলে ওটা ওখানেই থাকার কথা, রবিন কললো। ক্যাম্পফায়ারের কাছে নয়।
তারমানে কেউ একজন, বললো মুসা, ওটা বের করে নিয়ে গেছে ঘরে আগুন লাগার আগেই। নিয়ে গিয়ে রেখে দিয়েছে ক্যাম্পফায়ারের কাছে।
কিন্তু, রিগো কললো, সেটা প্রমাণ করা যাচ্ছে না।
দেখি গোলাঘরে গিয়ে কিছু মেলে কিনা, আশা করলো রবিন। সব নিশ্চয় পুড়ে মাটিতে মিশে যায়নি। সূত্র পেলে পেতেও পারি। মুসা, চলো, কিশোরকে গিয়ে বলি।
রিগোকে গুডবাই জানিয়ে বেরিয়ে এলো দুজনে।
বাইরে বৃষ্টি। তারমধ্যেই সাইকেল চালিয়ে হিসটোরিক্যাল সোসাইটিতে চললো ওরা। কিন্তু ওখানে পাওয়া গেল না কিশোরকে।
গেল কোথায়? রবিনের দিকে তাকালো মুসা।
কি জানি, ঠোঁট কামড়ালো রবিন। অন্ধকার হতে দেরি আছে, আরও ঘণ্টা দুয়েক। চলো, আমরাই গিয়ে খুঁজি।
চলো। কিশোররাও হয়তো ওখানেই গেছে।
আবার বাইরে বৃষ্টিতে বেরিয়ে এলো ওরা। রওনা হলো আলভারেজ র্যাঞ্চে।
১২
হাসিয়েনডার চত্বরে ঢুকলো রবিন আর মুসা। বৃষ্টি থেমেছে। পোড়া কালো ধ্বংসপটা নীরব, নির্জন। কিছু পোড়া খুঁটি আর দেয়াল দাঁড়িয়ে রয়েছে এখনও, যেন ঘরগুলোর কঙ্কাল। হাসিয়েনডার পেছনে পাহাড়ের মাথায় আগের মতোই দাঁড়িয়ে রয়েছে ভাঙা ঘোড়ার মূর্তি, নিচ দিয়ে ভেসে যাওয়া মেঘের মধ্যে কেমন যেন ভূতুড়ে লাগছে ওটাকে। কিশোর আর পিনটুকে দেখা গেল না।
অপেক্ষা করবো? মুসার প্রশ্ন।
এসেছি যখন চুপ করে থেকে লাভ কি? এসো খুঁজি।
ভাঙা দেয়াল, আর পড়ে থাকা কড়িবর্গাগুলোর দিকে বিতৃষ্ণ নয়নে তাকালো মুসা। যা অবস্থা! কি করে খুঁজবো?
বাইরেই খুঁজি আগে। কোনো কিছু পড়ে থাকতে পারে। পায়ের ছাপ পাওয়া যেতে পারে।
কোরালাটা যেখানে ছিলো তার দুপাশে ছড়িয়ে পড়লো দুজনে। মাথা নিচু করে দেখতে দেখতে এগোলো গেটের দিকে। পুরো চত্বরে কাদা হয়ে গেছে বৃষ্টিতে। আঠালো কাদা জুতো কামড়ে ধরে টান দিয়ে তুলতে গেলে বিচিত্র শব্দ হয়ে যায় ফচাৎ করে।
গোলার দরজার কাছে চলে এলো ওরা। পোড়া কাঠামোটা কিম্ভুত ভঙ্গিতে বেঁকেচুরে রয়েছে।
একটা কাঠিও দেখছি না মাটিতে, মুসা বললো। এমন কাদার কাদা, সব ঢেকে
ফেলেছে।
পায়ের ছাপও পাওয়া যাবেনা। চলো, ভেতরে দেখি।
ভেতরের অবস্থা আরও খারাপ। কড়ির্গা, ধসে পড়া দেয়াল, হাত, ঘোড়ার স্টল, আর হাজারটা পোড়া জিনিস যেন জট পাকিয়ে রয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে সেসব জঞ্জাল থেকে পচা গন্ধ বেরোচ্ছে, নাকে জ্বালা ধরায়। কোনো জিনিসই চেনার উপায় নেই। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লো দুজনে।
এখানে পাবো? মাথা নাড়লো মুসা। মনে হয় না। কি খুঁজতে এসেছি সেটাই জানি না!
সূত্র। দেখলেই বুঝে যাবো যে ওটা খুঁজছি। কোনখান থেকে শুরু করবো?
দরজার কাছ থেকে। যেখানে ঝোলানো ছিলো হ্যাটটা। ওই দেখো, বাঁ দিকের দেয়ালে হুকটা এখনও আছে।
আছে। হুকের কঙ্কাল, বিড়বিড় করলো মুসা। পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে কাঠের হুক।
কালো হয়ে থাকা দেয়ালে এখনও গাথা রয়েছে তিনটে হুক, একসারিতে। ওগুলোর নিচের মাটিতে খোঁজা আরম্ভ করলো ওরা।
জঞ্জালের অভাব নেই। অনেক জিনিসই পাওয়া গেল, কিংবা বলা ভালো জিনিসের ধ্বংসাবশেষ, তবে সবই ওগুলো আলভারেজদের জিনিস, কোনো সূত্র-টুত্র না।
অবশেষে কিছু না পেয়ে ধপ করে একটা পোড়া বর্গার ওপর বসে পড়লো মুসা। হবে না। সূত্রটার গায়ে যদি সূত্র সীল মারা থাকে, তাহলেই শুধু চিনবো।
ঠিকই বলেছে, হাল ছেড়ে দিয়েছে রবিনও। এতো বেশি জঞ্জলি…
এই, কে যেন আসছে, লাফ দিয়ে উঠে দরজার দিকে এগোলে মুসা। বোধহয় কিশোর-..। কথা শেষ না করেই চকিতে সরে চলে এলো ভাঙা দেয়ালের আড়ালে। ফিসফিস করে বললো, তিনজন! চিনি না!
জঞ্জালের তূপের আড়ালে বসে পড়ে সাবধানে মাথা তুলে উঁকি দিলো রবিন।
এদিকেই আসছে! জলদি ওখানে ঢোকো। কড়িকৰ্গার ওপর পড়ে থাকা কতগুলো টালি দেখালো সে। ভেতরে ঢোকার জায়গা আছে।
শরীর মুচড়ে মুচড়ে নিঃশব্দে সেই ফাঁকে ঢুকে পড়লো দুজনে। উপুড় হয়ে পড়ে রইলো মাটিতে। নিঃশ্বাস ফেলতেও ভয় পাচ্ছে, পাছে ওনে ফেলে লোকগুলো।
গোলাঘরে এসে ঢুকলো তিন আগন্তুক।
জঘন্য চেহারা, ফিসফিসিয়ে না বলে পারলো না মুসা। তাকে চুপ করতে বললো রবিন।
ঠিক দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক চোখ বোলাতে লাগলো লোকগুলো। একজন বিশালদেহী, কালো চুল, পুরু গোঁফ, মুখে তিন-চার দিনের না-কামানো দাড়ি। দ্বিতীয়জন ছোটখাটো, মুখটা লম্বাটে-মুসার মনে হলো, ইঁদুরের মুখের সঙ্গে যথেষ্ট মিল রয়েছে, কুতকুতে চোখে যেন রাজ্যের শয়তানী ভরা। তৃতীয়জন মোটা, টাকমাথা, টকটকে লাল মোটা নাক, সামনের কয়েকটা দাঁত ভাঙা। তিনজনেই নোংরা, পরনে মলিন জিনস, কাদামাখা কাউবয় বুট পায়ে, গায়ে ওঅর্ক শার্ট, মাথায় তেল চটচটে, ময়লা, দোমড়ানো হ্যাট। হাত-মুখের খসখসে চামড়া দেখে অনুমান করতে কষ্ট হয় না, শেষ গোটা মাসখানেক আগে হয়তো করেছে।
