আর যদিও বা অলৌকিক ভাবে বছরখানেক পরে ডেংগু খুঁজে পায় দ্বীপটা, ওদের লাভ কি তাতে? সে এসে দেখবে, চারটে ঝকঝকে কঙ্কাল পড়ে রয়েছে প্রবাল পাথরের মাঝে, অবশ্যই যদি ঝড়ের সময় পানিতে ভাসিয়ে না নিয়ে যায় লাশগুলো।
ডেংগু হয়ত ওদেরকে মরার জন্যে রেখে যায়নি। খানিকটা শাস্তি দিতে চেয়েছে। এটা ভেবেই ফেলে গেছে, আবার তে; আসছেই, ততদিন মরবে না ওরা। কিন্তু কিশোর যা করে রেখেছে, সময় মত কিছুতেই আসতে পারবে না ডেংগু।
রবিন আর মুসা জানলে কি বলবে? কুমালোও কি তাকেই দোষারোপ করবে তাদের মৃত্যুর জন্যে? মুখে হয়ত কেউই কিছু বলবে না, কিশোরের মানসি যন্ত্রণা বাড়াতে চাইবে না, কিন্তু মনে মনে? না খেয়ে মরার জন্যে কি দোষ দেবে না তাকে? আচ্ছা, না খেয়ে, পিপাসায় ধুকে ধুকে মরতে কতটা কষ্ট হবে? খুব বেশি?
আপাতত কাউকে কিছু না বলার সিদ্ধান্ত নিল কিশোর ! শুনলে মনমরা হয়ে পড়বে মুসা আর রবিন, একেবারে নিরাশ হয়ে যাবে। কুমালোর সেবাযতের দিকে আর মন দেয়ার প্রয়োজন বোধ করবে না।
ভয়ঙ্কর ভাবনাগুলো জোর করে মন থেকে বিদেয় করল কিশোর কুমালোর সেবায় মন দিল। রক্তপাত বন্ধ হয়েছে। কাজ করেছে টোটকা ওষুধ। সাবধানে টর্নিকেটটা খুলতে লাগল কিশোর। বেশিক্ষণ বেঁধে রাখা ঠিক না, গ্যাংগ্রিন হয়ে যেতে পারে। টনিকেটটা খোলার পরেও রক্ত বেরোল না। নারকেল-বাকলের পাউডারের ওপর শ্রদ্ধা জন্মাল কিশোরের। এত ভাল অ্যাসট্রিনজেন্ট এই জিনিস, কনাই করতে পারবে না অনেকে।
হেঁড়া শার্টটা নিয়ে গিয়ে পানিতে ভেজাল কিশোর। চিপে বাতাসে ছড়িয়ে নাড়ল, যাতে ঠাণ্ডা হয়। তারপর এনে রাখল কুমালোর কপালে। ভীষণ জ্বর। কি হচ্ছে না হচ্ছে জানতেই পারল না বেচারা।
রবিন সাহায্য করছে কিশোরকে।
মুসা বিশেষ সুবিধে করতে পারছে না। এসব দ্বীপে ছাউনির চালা বলতে একমাত্র নারকেল পাতা। একসময় অনেকই ছিল, এখন একটাও নেই। ঝড়ে ছিঁড়ে যেগুলো পড়েছিল, সেগুলোকেও ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ঢেউ।
পাথরের খাঁজে খুঁজে আটকে রয়েছে কিছু ভাঙা কাণ্ড। কয়েকটা মাথা আছে। তাতে ডালও রয়েছে, তবে একটাও পাতা মেই। যেন ছুরি দিয়ে চেঁছে নিয়ে গেছে। বাতাস। হারিকানের এই প্রচণ্ড ক্ষমতা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
নারকেল পাতা পাওয়া যাবে না, নিশ্চিত হয়ে গেল সে। তাহলে আর কি আছে? কি দিয়ে ছাউনি হবে? চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগল। ভাবনার একাগ্রতার জন্যে চোখের পাতা বোজেনি, বুজেছে রোদের মধ্যে চোখ মেলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে বলে। প্যানডানাস পাতা দিয়ে ছাউনি বানায় দ্বীপবাসীরা, ট্যারো পাতা দিয়েও হয়। কলাপাতা পেলেও সাময়িক কাজ চালানো যায়। জাহাজডুবি হয়ে নির্জন দ্বীপে উঠে খুব আরামে থাকে নাবিকেরা, এরকম অনেক গল্প পড়েছে সে। তবে ওদের কেউই কোন মরা দ্বীপে ওঠে না। নানারকম রসাল ফলের গাছ থাকে, সুন্দর পাখি থাকে, হরিণ থাকে, মিষ্টি পানির ঝর্না থাকে ওসব দ্বীপে। বাঁচতে অসুবিধে হয় না মানুষের।
ওরকম একটা দ্বীপে আটকে গেলে কিছুই মনে করত না মুসা। হাত বাড়ালেই পেয়ে যেত পাকা কলা, ছিঁড়ে নিতে পারত রুটিফল, বুনো কমলা, আম, পেঁপে, পেয়ারা, আঙর। ল্যাগুন থাকত মাছে বোঝাই। সৈকত থাকত সাদা বালির, জোয়ারের পানি তাতে এনে ফেলত মোটা মোটা চিংড়ি। আর এত বেশি পাখি থাকত, খালি হাতেই ধরে ফেলা যেত ওগুলো, কারণ মানুষকে ভয় পায় না ওরা, আগে মানুষ দেখেনি তো কখনও। দ্বীপের কিনারে পাহাড়ে থাকত অগণিত পাখির বাসা, তাতে ডিম। পাহাড়ি ঝর্নায় আশ মিটিয়ে গোসল করত, নারকেলের মিষ্টি পানি খেত, থাকত বাঁশের তৈরি সুন্দর কুঁড়েতে। রাতে ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় মাথা দোলাত নারকেল গাছ, রহস্যময় সরসর শব্দ তুলত বাঁশের কঞ্চি, সবুজ বন থেকে ভেসে আসত নিশাচর পাখির ঘুমপাড়ানি ডাক…
চোখ মেলতে বাধ্য, হল মুসা। ঘাড়ের চামড়া যেন পুড়ে যাচ্ছে রোদে। সাদা পাথরে রোদ প্রতিফলিত হয়ে চোখে এসে লাগতে গুঙিয়ে উঠল সে। তাকানই যায় না।
পাথরের দিক থেকে চোখ সরাতেই চোখে পড়ল ওটা। মস্ত দুটো পাথরের খাঁজে কি যেন একটা পড়ে আছে, পানির, কিনারে। ধড়াস করে উঠল তার বুক। নৌকা না তো! দেখে তো মনে হয় নৌকাই উল্টে পড়ে আছে। হয়ত ঝড়ে ভেসে এসে ঠেকেছে ওখানে!
উত্তেজনায় বুকের খাঁচায় দাপাদাপি শুরু করে দিল হৃৎপিণ্ডটা। আশার আলো জ্বলল মনে। নৌকা হলে এই মৃত্যুদ্বীপ থেকে বেরোতে পারবে। প্রবালের চোখা, ধারাল বাধা অমান্য করে দৌড় দিল সে।
নাহ্, নৌকা নয়! বিশাল এক মাছ। পেট আকাশের দিকে, মরে ঠাণ্ডা হয়ে আছে। পুরো তিরিশ ফুট লম্বা।
চামড়ার রঙ বাদামী, তাতে সাদা ফুটকি। কুৎসিত মুখ, ব্যাঙের মুখের মত অনেকটা। মুখের তুলনায় ছোট দুটো চোখ।
তিরিশ ফুট শরীরের তুলনায়ও মুখের হাঁ বিশাল। চার ফুট চওড়া। দুই কশ বেয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে এখনও, যেন শ্যাওলা লেগে আছে।
এত বড় আর কুৎসিত মাছ দেখলে প্রথমেই মনে হবে ওটা মানুষখেকো ভয়ঙ্কর হিংস্রজীব। কিন্তু মুসা জানে, এই মাছ একেবারেই নিরীহ, যদিও হিংস্রতম প্রজাতিরই বংশধর এটা। মাছের মধ্যে সব চেয়ে বড় মাছ, নাম হোয়েল শার্ক বা তিমি-হাঙর। এখানে যেটা পড়ে আছে সেটা ছোট, এর দ্বিগুণ বড়ও হয় এ মাছ। হাঙর গোষ্ঠির প্রাণী, অথচ ছোট জাতভাইদের মত রক্তলোলুপ নয়। খুব ছোট ছোট জলজ জীব খেয়ে বেঁচে থাকে। ওসব জীবের কোন কোনটা এত ছোট, খালি চোখে দেখা যায় না, অণুবীক্ষণ যন্ত্র লাগে।
