মুসার মুখ উজ্জ্বল হলো। হ্যাঁ, তাই তো। ওই ব্যাটাই চুরি করেছে। মিসেস ফিলটারই হয়তো সে-রাতে চোরটাকে নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
খাবার চুরির রহস্যটাই বা কি? রবিন বলল। আর সিগারেটের গোড়া?
কি? জিজ্ঞেস করল জিনা।
হতে পারে চোরটা তখনও মিসেস ফিলটারের ঘরেই ছিল, আমরা যেদিন তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। খিদে পেয়েছিল, তাই আমরা ঘর থেকে বেরোতেই খেয়ে নিয়েছে সে। মনে করে দেখো, খাবার নেই এ-ব্যাপারটা প্রথমে মিসেস ফিলটারের চোখে পড়েনি, কিশোর বলার পর
চমৎকার যুক্তি, রবিন, বলল কিশোর। ঠিক পথেই ভাবছ।
তোমাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে! রেগে গেল জিনা।
উত্তেজিত হয়ো না জিনা, কিশোর বলল। সবই আমাদের অনুমা। অনেকগুলো উদ্ভট ব্যাপার ঘটছে তো। পাঁচ বছরের পুরানো একটা লাশ পেলাম খনিতে, পাঁচ বছর আগের এক ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ছিল লোকটা। সন্দেহভাজন বিধবা মহিলা রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হয়ে গেলেন। গাছ কাটার একটা ছুরি চুরি গেল, ডাকাতদের সঙ্গে এটারও কোন সম্পর্ক থাকতে পারে। একটা বাতিল রূপার খনির মুখ খুলে খনি-খনি খেলা শুরু করেছে এক আধপাগলা কোটিপতি। কুড়িয়ে পেলাম একটা সোনা মেশানো নুড়ি। অথচ, মিসেস ফিলটারের কথামত এক আউন্স সোনা থাকার কথা নয় খনিতে।
হয়তো মিছে কথা বলেছেন, মুসা বলল।
কেন বলবেন? ম্যাকআরবারের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক আছে বলে তো মনে হলো না।
যদি টাকাগুলো খনিতে লুকানো থাকে? মিসেস ফিলটারের সে কথা জানা থাকলে, ম্যাকআরবারের মতই চাইবেন খনিতে কেউ না ঢুকুক।
এরপর বাকি পথটা প্রায় নীরবে পেরোল ওরা, বিশেষ কোন কথা হলো না। শেষ বিকেলে এসে নামল উপত্যকায়। ম্যাকআরবারের লাল ট্রাকটা নেই। কেবিনের কাছে পড়ে রয়েছে রঙের বালতি, কিন্তু মেকসিকান শ্রমিকেরা অদৃশ্য। বিকেলের সোনালি রোদে লম্বা হয়ে শুয়ে ঘুমে অচেতন বিশাল কুকুরটা।
স্তব্ধ নীরবতার মাঝে শুধু ঘোড়ার খুরের খটাখট শব্দ, বেশি হয়ে কানে বাজছে। বেড়ার কিনার দিয়ে এল ওরা। কিন্তু কুকুরটার খবরই নেই যেন, ঘুমাচ্ছে।
অদ্ভুত তো, কিশোর বলল। এতক্ষণ তত বেড়া ভাঙার চেষ্টা করার কথা।
র্যাঞ্চে ফিরে ঘোড়াগুলো খেয়াড়ে ঢুকিয়ে রাখল ওরা। বাড়ির সদর দরজা খোলা। রান্নাঘরের টেবিলে একটা নোট পাওয়া গেল, মিস্টার উইলসন লিখে রেখে গেছেন?
ভিকির বোন জরুরী
খবর দিয়েছে। তাকে
নিয়ে সিলভার
সিটিতে গেলাম।
ফিরতে রাত হবে।
ঠাণ্ডা খাবার দিয়েই
কোনমতে আজ
ডিনার সেরে নিও।
-লাভ, আঙ্কেল
উইলসন।
দারুণ! উজ্জ্বল হয়ে উঠল কিশোরের মুখ।
আমার কাছে তো দারুণ লাগছে না, জিনা বলল তোমার হয়েছে কি, কিশোর, ডিকিখালার বোনের শরীর খারাপও তো হতে পারে?
না হলেই খুশি হব, অন্তর থেকেই বলল কিশোর।
খুশি হয়েছি কেউ নেই দেখে। মিসেস ফিলটার নেই, ম্যাকআরের ট্রাকটা নেই—তারমানে সে-ও নেই, তার শ্রমিকেরা নেই। আঙ্কেল উইলসন আর ভিকিখালাও নেই। দারুণ বলব না? খনিতে ঢোকার এর চেয়ে মোক্ষম সুযোগ আর পাব?
পকেট থেকে নুড়িটা বের করে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে খপ করে ধরল আবার সুে, সঙ্গীদের দিকে তাকাল। চলো, এখুনি। এমন সুযোগ আর পাব না। দেখি গিয়ে কি মেলে খনিতে।
কুত্তাটা? মনে করিয়ে দিল মুসা। কেউ না থাকলেও ওটা তো আছে।
ব্যবস্থা করছি, ফ্রিজের কাছে প্রায় উড়ে গিয়ে পড়ল জিনা। ভেড়ার আস্ত এক রান বের করে নিয়ে বলল, বাঘা কুত্তার ওষুধ। অনেকক্ষণ ব্যস্ত থাকবে।
কয়েক মিনিট পর ম্যাকআরথারের বেড়ার ধারে এসে দাঁড়াল ওরা। কুকুরটা এখনও ঘুমাচ্ছে।
সেৎসি মাছি কামড়েছে নাকি ব্যাটাকে? মুসা বলল।
সেৎসির কামড়ে কুকুরের কিছু হয় না, জানাল রবিন। শুধু মানুষ আর গাধার ওপর কাজ করে ওদের বিষ।
খাইছে! গাধা আর মানুষ তাহলে এক টাইপের প্রাণী? ইজ্জত গেল। হেই কুত্তা, হেই বাঘা। ওঠ, ওঠ।
এই যে তোর খাবার নিয়ে এসেছি, ভেড়ার ঠ্যাঙটা নাড়ল জিনা।
কিন্তু নড়লও না বাবা।
আবার ডাকল মুসা। কিন্তু সাড়া নেই। অশেষে বেড়া ডিঙাল সে, ওপরে চড়ে লাফিয়ে নামল অন্য পাশে, ম্যাকআরবারের সীমানা ভেতরে।
সাবধান, হুঁশিয়ার করল রবিন, জেগে উঠে কামড়ে দিতে পারে।
জিনা, দেখি রানটা দাও তো, বলল মুসা। ওপর দিয়ে ছুঁড়ে দাও। কুত্তা মিয়া কখন আবার লাফিয়ে ওঠে।
রানটা লুফে নিয়ে কুকুরটার দিকে ফিরল মুসা। মরে গেল নাকি?
মুসার মতই বেড়া ডিঙাল তিনজনে। রানটা নিয়ে নিল আবার জিনা। এক সঙ্গে চারজনে এগোল কুকুরটার দিকে।
এই তো ছেলে, লক্ষ্ণী ছেলে, রাগে না, কোমল গলায় বলতে বলতে হাঁটু মুড়ে বলল জিনা। কুকুরটার দিকে হাত বাড়াল।
হুঁশিয়ার! বাঘা কুত্তা কিন্তু, ফিসফিস করে বলল কিশোর।
কিন্তু বাঘা কুত্তার ঘুম ভাঙল না। জিনা গায়ে হাত বোলালে মৃদু লেজ নেড়ে শুধু গোঁ গোঁ করল ঘুমের মধ্যেই।
কুকুরের এত ঘুম? এদিক ওদিক তাকাল সে। বেড়ার কাছে একটা টিন দেখে এগিয়ে গেল। যা সন্দেহ করেছিল। খানিকটা মাংস অবশিষ্ট রয়েছে এখনও। ওখান থেকেই ঘোষণা করল, ঘুমের ওষুধ খাইয়েছে।
কে খাওয়াল, দেখার জন্যেই যেন চারদিকে তাকাল অন্য তিনজন। কিন্তু কাউকে চোখে পড়ল না।
মেকসিকানগুলো গেল কোথায়? নিচু কণ্ঠে বলল রবিন।
এই, শুনছেন? চেঁচিয়ে ডাকল মুসা। কেউ আছেন? প্রতিধ্বনি তুলে তার ডাকের সাড়া দিল শুধু পাহাড়।
