বোঝা গেছে, কেউ নেই, উঠে দাঁড়াল জিনা। প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে টর্চটা টেনে বের করে বলল, চলো, কেউ চলে আসার আগেই ঢুকে পড়ি।
খনিমুখের দিকে এগোল সে। অন্ধকার একটা কালো গহ্বর, ভেতরের কিছুই চোখে পড়ছে না। সূর্য ডোবেনি, তবে পাহাড়ের ওপারে অদৃশ্য হয়েছে। অন্ধকার নামছে তাই উপত্যকায়।
ভেতরে ঢুকল ওরা।
আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল জিনা। কি করেছে ব্যাটারা? বোমা মেরেছে কোন জায়গায়?
আসিনি এখনও সেজায়গায়, কিশোর বলল। আরও ভেতরে ঢুকতে হবে। চাপা আওয়াজ হয়েছে, তারমানে অনেক গভীর থেকে বেরিয়েছে। চলো, যে জায়গায় নুড়িটা পেয়েছি সেখানে।
জিনার হাত থেকে টর্চটা নিয়ে আগে আগে চলল কিশোর। আগের বারের মত পরিষ্কার নয় আর এখন পথ, আলগা নুড়ি আর পাথরে বিছিয়ে আছে, জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট খুপ। পঞ্চাশ ফুট মত এগিয়ে পাওয়া গেল ফোকরটা, এখানেই বোমা মারা হয়েছে। ভেতরে কি যেন চকচক করছে।
দেখো দেখো, চেঁচিয়ে উঠল মুসা, সোনা!
ফোকরে ঢুকল কিশোর। টর্চের আলোয় ঝকঝক করছে হলদে ধাতু। আঙুল দিয়ে খুঁচিয়ে টুকরোটা বের করে নিয়ে এল সে। আশ্চর্য!
মিসেস ফিলটার ভুল বলেছেন, জিনা বলল। খনিটাতে স্বর্ণ আছে।
হঠাৎ স্থির হয়ে গেল চারজনেই।
খনির বাইরে শব্দ। গুলি করেছে কেউ, কিংবা গাড়ির এঞ্জিনের মিসফায়ার।
কে যেন আসছে, ফিসফিস করল মুসা।
চলো ভাগি, জরুরী কণ্ঠে বলল জিনা। আবার ধরা পড়তে চাই না।
সোনার টুকরোটা পকেটে রেখে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এল কিশোর, অন্যেরাও বেরোল ফোকর থেকে। মোড় নিয়ে গলি থেকে বেরিয়ে প্রধান সুড়ঙ্গে ঢুকতেই অতি আবছা আলো চোখে পড়ল, খনিমুখ দিয়ে আসছে সঁঝের ফেকাসে সবুজ আলো। টর্চ নিভিয়ে দিল কিশোর। পায়ে পায়ে এগোল মুখের দিকে।
কুকুরটা তেমনি শুয়ে আছে, আবছা অন্ধকারে অস্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে। বেড়ার বাইরে টায়ারের শব্দ তুলে থামল একটা গাড়ি। দুজন লোক বেয়োল গাড়ি থেকে।
হ্যারি, বলল একজন, পাথর দিয়ে বাড়ি মারো।
দরকার কি? খসখসে কণ্ঠস্বর দ্বিতীয় জনের। গুলি করলেই তো হয়।
তোমার যা কথা না। গুলির শব্দ শুনে ফেলুক কেউ, আর মোটকা শেরিফটাকে খবর দিয়ে দিক। নাও, পাথর নাও। দূর থেকেও তার নিঃশ্বাসের ফোঁস ফোঁস শব্দ শুনতে পাচ্ছে ছেলেরা।
কিশোর! ফিসফিসিয়ে বলল মুসা। এই ব্যাটাই! ও-ই ঢুকেছিল সেদিন গোলাঘরে। আমাকে কোপ মারার আগে ওরকম করেই শাস ফেলেছিল।
খনির অন্ধকারে পিছিয়ে এল আবার চারজনে।
কি করি এখন? জিনা বলল। দৌড় দিয়ে পেরোতে পারব না, ধরে ফেলবে। ভাসাব দেখে মোটেই ভাল লোক মনে হচ্ছে না।
পাথর দিয়ে বাড়ি মারার ঠনঠন শব্দ কানে এল। খানিক পরই ভেঙে পড়ল গেটের তালা।
এখনও থাকলে, ওই ঘরেই আছে, হ্যারির খসখসে কণ্ঠ। বিংগো, কি মনে হয় তোমার?
না-ও থাকতে পারে, জবাব দিল ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস। উঠান পেরোচ্ছে ওরা। যথেষ্ট সময় পেয়েছে, সহজেই অন্য কোথাও লুকিয়ে ফেলতে পারে।
ঘরে না পেলে খনিতে খুঁজব।
সেখানে না পাওয়া গেলে চুপ করে গিয়ে লুকিয়ে বসে থাকব। সাহেব এলেই ধরব গলা টিপে।
রসিকতায় হাসন দুজনেই। দরজা খোলার শব্দ হলো। কেবিনে ঢুকছে।
আমাদের দেখে ফেলবে এখানে এনে, চি চি করে উঠল জিনার কণ্ঠ। কোনমতে পালানো দরকার। র্যাঞ্চে গিয়ে শেরিফকে ফোন করব।
পাগল নাকি? আঁতকে উঠল মুসা। ওদের সামনে দিয়ে? বন্দুক আছে।
হামাগুরি দিয়ে খনিমুখের কাছে গিয়ে সাবধানে বাইরে উঁকি দিল কিশোর। ছাউনিটার কাছে এক বালতি তরল পদার্থ পড়ে আছে। আরেকটু এগিয়ে তরলের গন্ধ শুকল সে, ছুঁয়ে দেখল ছাউনির খটখটে শুকনো কাঠের পাল্লা।
খনিতে ফিরে এল কিশোর। রঙ গোলানোর তেল, মেকসিকানরা ফেলে গেছে, বলল সে। ছাউনিতে আগুন ধরিয়ে দিলে শহরের কারও না কারও চোখে পড়বে। ফায়ার ব্রিগেডকে খবর দেবে। মুসা, দেশলাই আছে না তোমার কাছে? হ্যামবোনে খাবার গরম করেছিলে যে?
দেশলাই বের করে দিল মুসা।
ছাউনিতে গিয়ে পালা আর বেড়ার কাঠ তেল দিয়ে ভেজাল যতখানি পারল। কাঠি জ্বেলে তাতে দিল লাগিয়ে। দপ করে জ্বলে উঠল আগুন, চোখের পলকে ছড়িয়ে গেল। সময় মত সরে এল সে।
চমৎকার! হাসিমুখে কাল মুসা। কাজ না হয়েই যায় না।
কি মনে পড়তে আচমকা চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। জলদি জলদি ঢোকো! ধাক্কা দিয়ে জিনাকে সরিয়ে দিল সে আরও ভেতরে, মুসা আর রবিনের হাত ধরে টান দিয়ে নিজে ডাইভ দিয়ে পড়ল মেঝেতে। বিচিত্র ভঙ্গিতে অনেকটা ব্যাঙের মত লাফিয়ে সরে গেল যতটা পারল।
কি ব্যাপার বলতে গিয়ে বাধা পেল মুসা।
ডিনামাইট, বলেই আরও ভেতরে সরে গেল কিশোর। নিশ্চয় ছাউনিতে রেখেছে ম্যাকআরথার।
তার কথার প্রমাণ দিতেই যেন প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল ধরণী।
১৬
একের পর এক বোমা ফাটতে লাগল, বাজ পড়ার মত প্রচণ্ড শব্দে কানে তালা লেগে যাবার জোগাড়।
এক সময় থামল সেটা। পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনির রেশ মিলাতে আরও কয়েক সেকেন্ড লাগল।
হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে কোনমতে খনি থেকে বেরিয়ে এল ছেলেরা। খনিমুখের চারপাশে পোড়া কাঠ আর জ্বলন্ত অন্যান্য জিনিস।
শুধু আগুন চেয়েছিলাম… উত্তেজনায় কথা রুদ্ধ হয়ে গেল মুসার।
এরপর সাংঘাতিক দ্রুত ঘটতে শুরু করল ঘটনা। বিল্ডিঙের দরজা খুলে বেরিয়ে এল দুই মেকসিকান শ্রমিক। বেড়া ডিঙিয়ে ছুটে হারিয়ে গেল খনিমুখের ওপরে পাথরের স্তুপের আড়ালে। কেবিন থেকে লাফিয়ে বেরোল হ্যারি আর বিগো। ঠিক এই সময় গেট দিয়ে ঢুকতে শুরু করল ম্যাকআরবারের লাল ট্রাক।
