মিসেস ফিলটার! চেঁচিয়ে ডাকল জিনা। ছুটে গেল গাড়ির দিকে, মিসেস ফিলটার! আপনি কোথায়?
গাড়ির কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে জিনা, এই সময় শোনা গেল একটা বিচ্ছিরি টি-রু-র শব্দ।
জিনা! খবরদার! চেঁচিয়ে উঠল কিশোর।
লাফিয়ে পেছনে সরার চেষ্টা করল জিনা, কিন্তু তাড়াহুড়োয় পিছলে গেল পা। ধড়াস করে চিত হয়ে পড়ল বালিতে। ট্রাকের নিচ থেকে উড়ে এল যেন একটা মোটা দড়ি, ছোবল হানল এক মুহূর্ত আগে জিনার পা যেখানে ছিল ঠিক সেখানে। কুৎসিত একটা চ্যাপটা মাথা, হাঁ করা চওড়া চোয়ালে ভয়ঙ্কর দুটো বিষদাত।
পাথর হয়ে গেছে যেন জিনা।
পুরো এক সেকেণ্ড লম্বা হয়ে পড়ে রইল সাপটা, তারপর লেজের টি শব্দ তুলে গুটিয়ে নিতে লাগলু শরীর।
নড়ে না, জিনা, ফিসফিস করল মুসা। একটা পাথর তুলে নিয়ে নিশানা করে ছুঁড়ে মারল জোরে।
বাহ, এক্কেবারে বুলস-আই, হাততালি দিল রবিন। মাথা খতম। বড় বাঁচা বাচা গেছে জিনা।
কোনমতে উঠে দাঁড়াল জিনা, দুর্বল রোগীর মত রক্তশূন্য চেহারা। কাঁপা গলায় মুসার দিকে চেয়ে শুধু বলল, থ্যাংক।
মরে গেছে সাপটা, কিন্তু এখনও শরীর মোচড়াচ্ছে, পাক খাচ্ছে। ধীরে ধীরে থেমে এল নড়াচড়া।
ট্রাকের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে নিচু হয়ে তলায় উঁকি দিল মুসা। আর না থাকলেই বাঁচি।
সাপটার পাশ ঘুরে ট্রাকের একেবারে কাছে চলে এল ওরা। কেবিনের ভেতরে উঁকি দিল। মিসেস ফিলটার নেই। খালি। সামনে-পেছনে কোথাও মালপত্র নেই। ইগনিশনের চাবিটাও নেই।
এখানে এভাবে গাড়িটা ফেলে গেল, কানের পেছনে চুলকাল রবিন। কিছু বুঝতে পারছি না।
আমিও না, জিনা বলল, কোথায় যেতে পারে? মালপত্রই বা কোথায়?
কোথাও লুকিয়ে নেই তো? এদিক ওদিক তাকাল মুসা। শহরটা খুজে দেখল ওরা। জানালা-দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখল ঘরের ভেতরে। কিন্তু ভাঙা আসবাব আর ময়লা জঞ্জাল ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না। এখানে ওখানে বালিতে পায়ের ছাপ আছে।
মিসেস ফিলটার নেই।
লোক যাতায়াত আছে, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর। আবার পিকআপের কাছে এল ওরা। ওদের পায়ের ছাপ ছাড়াও ছাপ আছে। ওগুলো অনুসরণ করে এগোল কিশোর। বিশ গজ দূরে আরেক সেট টায়ারের দাগ দেখা গেল।
জীপ কিংবা ট্রাক নিয়ে আরও কেউ এসেছিল, মুসা বলল।
দাগ ধরে এগোল ওরা। শহরের এক কিনারে চলে এল। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে গেছে আরেকটা সরু পথ, ওরা যেটা দিয়ে এসেছিল তার উল্টোদিকে, এই পথটা মোটামুটি ভাল অবস্থায়ই রয়েছে।
চুপ করে কিছু দেখছে কিশোর। বলল, কারও সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন কিনা কে জানে। টুইন লেকস থেকে এসেছেন নিজের গাড়ি নিয়ে। আগেই ঠিক করা ছিল অন্য কেউ এখানে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবে। নিজের গাড়িটা এখানে ফেলে মালপত্র নিয়ে অন্য গাড়িতে করে চলে গেছেন মিসেস ফিলটার। জিনা, এ-পথটা কোথায় গেছে?
শিওর না, মাথা নাড়ল জিনা। শুনেছি, ওদিকে মরুভূমি।
নিচে গাছের মাথায় ধুলোর ঝড় দেখা গেল, ঢালের দিক থেকে ভেসে এল এঞ্জিনের শব্দ, লো-গীয়ারে চলছে গাড়ি, ফলে গোঁ গোঁ বেশি করছে।
ফিরে আসছে বোধহয়, ভুরু কুঁচকে পথের মোড়ের দিকে চেয়ে আছে মুসা।
কিন্তু মিসেস ফিলটার ফেরেনি। একটা জীপ। আলগা নুড়িতে ঠিকমত কামড় বসাতে পারছে না চাকা, এবড়োখেবড়ো পথের ঝুঁকুনি আর খাড়াই গাড়ির গতি একেবারে কমিয়ে দিয়েছে। ড্রাইভিং সিটে বসে আছে একজন বয়স্ক লোক, মাথায় ছড়ানোকানাওয়ালা খড়ের তৈরি হ্যাট। পাশে বসা এক মহিলা, পরনে ছাপার সুতি পোশাক।
হাই! পাশে এসে গাড়ি থামাল লোকটা। হাসল।
হাই, হাত তুলে জবাব দিল মুসা।
তোমরাই শুধু?
মাথা নোয়াল মুসা।
বোতল শিকারে এসেছ নিশ্চয়?
বোতল শিকার? জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল রবিন।
আমরা সেজন্যেই এসেছি, মহিলা বলল। সেই ক্যাসা ভারডে থেকে। এসব পুরানো জায়গায় মাঝেসাঝেই পুরানো আমলের চমৎকার সব বোতল পাওয়া যায়। তবে খোঁজার সময় সতর্ক থাকতে হয়। হাত দেয়া উচিত না। লাঠি দিয়ে সরিয়ে নেয়াটাই ভাল। নইলে সাপের যা আজ্ঞা এসব পোছড়া জায়গায়।
জানি, বলল কিশোর। আচ্ছা, আরও নোক আসে নাকি এখানে?
হয়তো আসে, জবাব দিল লোকটা। রাস্তা খুব খারাপ নয় সেটা একটা কারণ। আর বোতল না পাওয়া গেলেও, অন্যান্য জিনিস পাওয়া যায়। গত হপ্তায় অন্য একটা গোস্ট টাউনে গিয়েছিলাম। পুরানো আমলের একটা কেরোসিনের ল্যাম্প পেয়েছি, প্রায় নতুন।
জীপটা চালিয়ে নিয়ে জেনারেল স্টোরের সামনে রাখল সে।
টায়ারের দাগের ব্যাপারে আর শিওর হওয়া যাচ্ছে না, হাত নাড়ল রবিন। যে দাগ ধরে এলাম এখানে, সেটা কোন অ্যানটিক শিকারিরও হতে পারে।
হুঁ, ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর। মিসেস ফিলটারকে খুঁজে বের করার আর কোন উপায় দেখছি না।
১৫
খাবার গরম করে খেয়ে আবার ঘোড়ায় চড়ল ওরা। গতি ধীর। রাস্তা খুব খারাপ, পিছলে পড়ে হাড়গোড় ভাঙার ইচ্ছে নেই কারও। কাছাকাছি রয়েছে ওরা। প্রাণের ভয় সবারই আছে, জানোয়ারগুলোও তাই খুব সর্তক, কিশোরের হোতকাটাও আর ঘাসের লোভ করছে না এখন।
বিশ্বাস হচ্ছে না, এক সময় বলল কিশোর। মিসেস ফিলটারের মত মহিলা আতঙ্কিত হয়ে পালাবেন…।
সব তোমার অনুমান, জিনা বলল। তার আসলে কি হয়েছে কে জানে।
একটা ব্যাপারই হয়েছে, জোর দিয়ে বলল কিশোর, যেই বুঝতে পেরেছেন তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে, অমনি পোটলা বেঁধে পালিয়েছেন। এমনও হতে পারে, টুইন লেকসে তার কোন সঙ্গী ঘোরাঘুরি করছিল কদিন ধরে। ভুলে যাচ্ছ কেন, ছুরিটা এখনও পাওয়া যায়নি।
