খাবার গরম করার সময় খুব সাবধান, হুঁশিয়ার করে দিল ভিকি। পুরো পূর্বতটা জ্বালিয়ে এসো না আবার, বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাল সে।
জিনা চড়েছে তার প্রিয় অ্যাপলুসায়। কিশোরেরটা মোটাসোটা মাদী ঘোড়া। মুসারটা হাড় জিরজিরে। হেসেই বাঁচে না জিনা, ঠাট্টা করে বলেছে, দেখো, তোমার যা ওজন, বেচারার মেরুদণ্ড না বাঁকিয়ে দাও। রবিনেরটা আংকেল উইলসনের তৃতীয় এবং সর্বশেষ, বেশ তেজী একটা ঘোড়া, ধূসর রঙের চামড়ায় সাদা ফুটকি।
মাঝারি কদমে ম্যাকআরথারের গেট পেরোল ওরা। ওদের দেখে যেন পাগল হয়ে গেল কুকুরটা, তার চিৎকারে ফিরে না চেয়ে পারল না দুই মেকসিকান শ্রমিক। ওরা এখন কেবিন রঙ করায় ব্যস্ত।
পাহাড়ী পথ ধরে আগে আগে চলেছে জিনা। তার কাছাকাছি রয়েছে কিশোর, কমেটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হিমশিম খাচ্ছে হোঁতকা মাদীটা। তাছাড়া তাল রাখার দিকে থােরাই নজর ঘোড়াটার, তার খেয়াল পথের দুপাশে কোথায় তাজা। ঘাস আছে। দেখলেই সেদিকে এগোনোর চেষ্টা। সামলাতে সামলাতে ইতিমধ্যেই ঘেমে উঠেছে কিশোর। এক সময় হাল ছেড়ে দিল। মনের ভাব : যা খুশি করগে মুটকির বেটি মুটকি।
বাধ্য হয়ে সাহায্যের হাত বাড়াতে হলো জিনাকে। কমেটকে ঘুরিয়ে এনে মাদীটার পাশাপাশি হলো, কিশোরের হাত থেকে রাশ নিয়ে জোরে টান দিয়ে দেখিয়ে দিল অবাধ্য ঘোড়াকে কি করে বাগ মানাতে হয়।
জোরে রাশ টেনে ধরে ঘোড়ার মাথা ওপরের দিকে তুলে রাখল কিশোর। কিন্তু কতক্ষণ আর এভাবে জোর জবরদস্তি করা যায়, কয়েক মিনিট পরই ঢিল দিয়ে দিল। আবার সেই একই কাণ্ড, হাঁটার চেয়ে ঘাস খাওয়ার দিকে মনযোগ বাড়াল ঘোড়া।
এভাবে গেলে তো সারা দিন লাগবে, বিরক্ত হয়ে বলল জিনা।
ঘোড়র পেটে জোরে লাথি লাগাল কিশোর, এই মুটকি, হাট।
বড় জোর দশ কদম ঠিকমত এগোল ঘোড়া, তারপর আবার এক পা বাড়ে তো দুপা পাশে সরে। একটা বাংলা কবিতা মনে পড়ে গেল কিশোরের, বিড়বিড় করল?
এক যে ছিল সাহেব তাহার
গুণের মধ্যে নাকের বাহার
তার যে গাধা বাহন সেটা
যেমন পেটুক তেমনি চেঁটা
ডাইনে বললে যায় সে বামে
তিন পা যেতে দুবার থামে…
ব্যাপার দেখে এমনি তরো
সাহেব বললেন সবুর করো
মূলোর কুঁটো ঝুলিয়ে নাকে…
এ পর্যন্ত বলেই আপনমনে হাসল কিশোর, বলল, দাঁড়াও, তোমার ব্যবস্থাও করছি, বলেই নেমে পড়ল ঘোড়া থেকে। রাশটা জিনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে রাস্তার পাশ থেকে একটা লাঠি কুড়িয়ে নিল। খুব তাজা আর সবুজ দেখে এক আঁটি ঘাস তুলে নিয়ে বাঁধল লাঠির মাথায়। তারপর আবার ঘোড়ায় চেপে লাঠিটা ধরল ওটার নাকের সামনে, এমনভাবে, যাতে কোনমতেই নাগাল না পায় ঘোড়া।
ব্যস, কাজ হয়ে গেল। ঘাস ধরার জন্যে মাথা উঁচু করে ছুটল ঘোড়া, যতই ছোটে ততই আগে বাড়ে ঘাস, নাগাল আর মেলে না। হাসতে হাসতে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো মুসার। জিনা আর রবিনও হাসছে। হাসতে হাসতে রবিন বলল, জিনা, তোমার রাশ টানার চেয়ে কিশোরের ঘাস টানার বুদ্ধি
অনেক মোক্ষম হা-হা-হা!
টায়ারের দাগ ধরে এগিয়ে চলেছে ওরা। দু-ধারে পাইনবন, তার ওপাশে পর্বতের ঢালে কি আছে দেখা যায় না। বেলা একটার দিকে নয় চূড়ায় পৌঁছলো ওরা, দ্রুত নেমে চলল হ্যামবোনের ধুলোয় ঢাকা প্রধান সড়ক ধরে। চারপাশে খটখটে শুকনো কাঠের বাড়িঘর, ভাঙাচোরা জানালা, রঙচটা সানশেড়। সাইনবোর্ডগুলো পড়া যায় না। পথের ওপর পড়ে আছে বিছানা আর সোফায় মরচে ধরা স্প্রিং, ভাঙা আসবাবপত্র, কাচের টুকরো, ছড়িয়ে আছে বাড়ির সামনে, আনাচে-কানাচে।
একটা বাড়ির সামনে এসে ঘোড়া থেকে নামল জিনা। এককালে ওটা হ্যামবোনের জেনারেল স্টোর ছিল। বারান্দার রেলিঙের সঙ্গে ঘোড়াটাকে বাঁধল সে।
ছেলেরাও নামল। অনেকক্ষণ ঘোড়ার পিঠে বসে থেকে শক্ত হয়ে গেছে যেন শরীর। যার যার ঘোড়া বেঁধে, হাত-পা ঝাড়া দিল।
বাবারে, কি নির্জন, চার দিকে তাকাতে তাকাতে বলল মুসা, আশঙ্কা করছে যেন এখুনি একটা ভূত বেরিয়ে আসবে।
লোক থাকে না বলেই তো ভূতুড়ে শহর বলে, জিনা বলল। রাস্তার মাথায় বড় একটা ছাউনির দিকে হাত তুলল। বেড়া আর ছাত করোগেটেড টিনের, জায়গায় জায়গায় মস্ত কালো ফোকর। শ্রমিকরা নিশ্চয় কাজ করত ওখানে।
মস্ত ছাউনিটার দিকে এগোল ওরা।
দেখেশুনে চলবে, হুঁশিয়ার করল জিনা। ওই যে, টিনের টুকরো কাঠের টুকরো পড়ে আছে, ওগুলোর কাছে যাবে না, কোন জিনিস তোলার চেষ্টা করবে না। রোদ থেকে বাচার জন্যে র্যাটল স্নেক লুকিয়ে থাকে ওসবের নিচে। ভয় পেলে
জানি কি করে, বলল মুসা। ভেব না। জঞ্জালের ভেতর কিছু খুঁজতে যাচ্ছি না আমরা।
ছাউনির কাছে এসে দাঁড়াল ওরা। অনেক আগেই খসে পড়ে গেছে দরজার পান্না। উঁকি দিয়ে ভেতরের বিষণ্ণতা দেখল সবাই।
হুঁ, কাঠের মেঝে, রবিন বলল। আমাদের ভার সইতে পারবে?
সওয়াতে যাচ্ছে কে, কিশোর বলল। ভেতরে ঢুকছি না আমরা। ট্রাক নেই ওখানে। শুধু ভূতুড়ে শহর দেখতে আসিনি আমরা। রাস্তায় সরে এসে টায়ারের দাগ পরীক্ষা করল। দাগ ধরে ধরে গিয়ে থামল ছাউনির এক কোণে। উঁকি দিয়ে একবার তাকিয়েই বলে উঠল, ওই তো।
কি? ছুটে এল জিনা।
মুসা আর রবিনও এল।
পিকআপটা দাঁড়িয়ে রয়েছে।
