বেডরুমের খোলা দরজা দেখাল জিনা। ছোট একটা স্যুটকেস উপড় হয়ে পড়ে আছে বিছানায়, পাশে এলোমেলো কিছু কাপড় চোপড়।
খোলা দরজার কাছে চলে এল কিশোর। এক নজর দেখেই বলল, তিনি অলরেডি চলে গেছেন।
চলে গেছেন? কিশোরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মুসা।
হাত তুলে খোলা আলমারি দেখাল কিশোর। কাপড় কই? সব নিয়ে গেছেন। ড্রয়ারগুলো কিভাবে খুলে আছে, দেখেছ? খালি। তিনি গিয়েছেন, এবং খুব তড়িৎ-অন্তর্ধান।
মানে? জিনা ঠিক মেনে নিতে পারছে না কিশোরের টিটকারি।
দেখে কিছু বুঝতে পারছ না? গতকালও এ-ঘর দেখেছ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে তকতকে। এই ঘর তো ভালই, রান্নাঘরে গিয়ে ভালমত দেখো। নোংরা। এটো বাসনগুলো পর্যন্ত সিংকে ভেজানো রয়ে গেছে। কোন কারণে এক্সপ্রেস ট্রেনের গতিতে তিনি জেগেছেন।
কিডন্যাপ! হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল জিনা। তাকে ধরে নিয়ে গেছে! খাবার চুরি করেছিল যে, নিশ্চয় ওই ব্যাটা…
ঠিক তাই, মাথা দোলাল কিশোর। তা এজন্যেই বুঝি সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি করে লোকটার সঙ্গে কিডন্যাপ হয়েছেন? কেউ কিডন্যাপ করলে এভাবে স্যুটকেস গোছানোর সুযোগ দেয়?
বোধহয় বেড়াতেই গেছেন, মুসা বলল।
সন্দেহ আছে। বেড়াতে গেলে এভাবে নোংরা রেখে যেতেন না বাড়িঘর, এটা তার স্বভাববিরুদ্ধ। তাছাড়া গতকাল ঘুণাক্ষরেও জানাননি বেড়াতে যাবেন।
জরুরী কোন কারণে কোথাও যেতে পারেন, রবিন বলল। আমরা যাওয়ার পর হয়তো ফোন পেয়েছিলেন।
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল কিশোর, কুটি করল, হ্যাঁ, এটা হতে পারে। তবে আরও একটা কারণ হতে পারে। ফিনিক্স থেকে বেরোনো খবরের কাগজটা তুমি দেখে ফেলেছ।
কিন্তু কাগজে কি আছে তিনি জানেন না, প্রতিবাদ করল জিনা। তিনি বাড়ি কেনার আগে থেকেই ওগুলো ছিল ওখানে।
হয়তো ছিল, মেনে নেয়ার ভঙ্গি করল কিশোর। কিন্তু তিনি ডাকাতিতে জড়িত থাকলে আর রবিন হাতে নেয়ার পর কাগজটার হেডলাইন নজরে পড়ে থাকলে, জেনে গেছেন কি লেখা রয়েছে। বুঝে গেছেন, গোলমালে পড়তে যাচ্ছেন। কারণ, তুমি, জরজিনা পারকার, কথা বেশি বলতে গিয়ে বলে ফেলেছ মৃত লোকটার ব্যাপারে তদন্ত করছি আমরা। দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে বেশি সময় যে লাগবে না আমাদের, এটা না বোঝার মত বোকা তিনি নন। এবং বোঝার পর তার কি করা উচিত?
পালানো, ফস করে বলে ফেলল মুসা।
মুখে কিছু আটকায় না তোমাদের। জিনার চোখে তিরষ্কার। এতই যদি আত্মবিশ্বাস, শেরিফকে ডাকছ না কেন?
ডেকে কি বলব? ভুরু নাচাল কিশোর। বলব, মিসেস ফিলটা চলে গেছেন? যে কোন স্বাধীন দেশে স্বাধীন ভাবে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার অধিকার আছে যে কোন স্বাধীন নাগরিকের। ডাকাতির সঙ্গে তিনি জড়িত, এর কোন প্রমাণ নেই আমাদের কাছে সবই অনুমান।
ধুলোয় ঢাকা গাড়িবারান্দায় বেরিয়ে এল কিশোর। মাটির দিকে চোখ রেখে এগোল। এক জায়গায় থেমে বালিতে চাকার দাগ পরীক্ষা করল। পিকআপের চাকার দাগের ওপর অন্য চাকার দাগও পড়েছে। পিছিয়ে গিয়ে রাস্তায় উঠে ম্যাকআরবারের বাড়িমুখো এগিয়েছে।
অদ্ভুত, আঙুল দিয়ে ঠোঁটে টোকা দিল কিশোর। শহরের দিকে যাননি। অন্য দিকে গেছেন।
যদি দাগগুলো তার গাড়ির চাকার হয়ে থাকে, জিনা বলল।
তার গাড়িবারান্দায় যে দাগ দেখেছি, তার সঙ্গে মিল তো রয়েছে।
ধুলোয় ঢাকা পথে চাকার দাগ ধরে ধরে এগোল ওরা। ম্যাকআরবারের গৌ ছাড়িয়ে এল। তাদেরকে দেখেই লাফ দিয়ে বেড়ার কাছে চলে এসেছে বিশাল কুকুরটা, বড় বড় লাফ মারছে পেরোনোর জন্যে, চেচাচ্ছে গলা ফাটিয়ে। বেগ থাকায় কুকুরটাকে আর বাধেনি ম্যাকআরথার। কিন্তু তাকে আর তার মেকসিকান শ্রমিকদেরকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
ম্যাকআরবারের সীমানার পর শ-খানেক গজ দূরে মোড় নিয়েছে গাড়ি, অনেক আগে রাস্তা ছিল এখানে, ভাল করে না তাকালে বোঝাই যায় না এখন। একেবেঁকে তী কয়েকটা মোড় নিয়ে পাহাড়ের দিকে চলে গেছে পথটা।
কিন্তু কেন কেন তিনি পুরানো হ্যামবোনের পথে গেছেন? বলল জিনা।
হ্যামবোন? ফিরে তাকাল কিশোর।
ওই যে ওখানে, চূড়ার ওদিকে একটা সত্যি সত্যি ভূতুড়ে শহর আছে। ওটার নাম হ্যামবোন। আরেকটা খনি আছে ওখানে, ভেথ ট্র্যাপের মতই মৃত। ওখানে টুইন লেকসের মত স-মিলও নেই, তাই শহরটা পুরোপুরি মরে গেছে। কখনও যাইনি, রাস্তা নাকি খুব খারাপ। তবে ফোর-হুইল-ড্রাইভ জীপ বা ট্রাক হলে যাওয়া যায়।
মিসেস ফিলটারের গাড়িটা ফোর-হুইল-ড্রাইভ, কিশোর বলল। তিনি ওদিকেই গেছেন।
উত্তেজিত হয়ে পড়েছে মুসা। তাহলে আমরা যাচ্ছি না কেন? চিহ্ন ধরে ধরে তাকে অনুসরণ করতে পারি। জিনা তোমার চাচার একটা ফোর-হুইল-ড্রাইভ ট্রাক আছে, আর…
আর আমি সেটা চালাতেও পারি, মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল জিনা। তবে সেটা ব্যাঙ্ক এলাকার মধ্যে, সমতল জায়গায়। এখানে আমি তো দূরের কথা, আমার ওস্তাদ… হঠাৎ উজ্জল হলো তার চেহারা। ঘোড় নিতে পারি আমরা। মিসেস ফিলটারের কি অবস্থা কে জানে। গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়ে থাকলে ভীষণ বিপদে পড়বেন। আমরা তাকে সাহায্য করতে পারব। ডিকিখালা এখন দয়া করে যদি কিছু খাবার গুছিয়ে দেয়, আর চাচাকেবোঝায়
…তাহলে সত্যিকারের একটা ভূতুড়ে শহরে দেখতে পাব আমরা, রবিনও উত্তেজিত।
ডিকিখালাকেবোঝানোর দায়িত্ব তোমার, জিনা, হেসে বলল মুসা। তুমি এক মিনিটে যতগুলো মিছে কথা বলতে পারবে, আমরা তিনজনে মিলে এক বছরেও তা পারব না।
১৪
খাবার গুছিয়ে দিতে কার্পণ্য করল না ভিকি। স্যাডল ব্যাগে সেগুলো ঠেসে ভরে নিতে হলো অভিযাত্রীদের।
