এত নির্দোষ ভাবছেন ওকে? জিনার পছন্দ হলো না মিসেস ফিলটারের কথা।
দেখো, কিছু মনে করো না, একটা কথা বলি। কোন সময় সহজ ব্যাপারকে ঘোরাল করবে না। তুমি তার সব কাজেই দোষ দেখতে পাও, তাকে পছন্দ করো না বলে। তবে তোমাকেও দোষ দিই না। নোকটা তেমন মিশুক নয়। সীমানায় বেড়া লাগিয়ে ভালই করেছে। যা একটা কুত্তা পোষে, কখন কাকে কামড়ে দিয়ে বিপদ বাধাবে।
আবার শোনা গেল বিস্ফোরণের শব্দ।
মিসেস ফিলটার, কিশোর বলল, সত্যিই কিছু নেই তো খনিতে? মানে কাজের কাজ কিছু করছে না তো?
জোরে মাথা নাড়লেন মিসেস ফিলটার। ডেথ ট্র্যাপ মাইন শেষ, মরা। চল্লিশ বছর আগেই ফুরিয়ে গেছে রুপা। তোমরাও হয়তো জানো। খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেক দিন খুব দুঃসময় গিয়েছিল আমাদের। এখান থেকে চলেই যেতে হলো শেষে বাধ্য হয়ে। এখানে সামান্যতম সম্ভাবনা থাকলে যেতাম ভাবছ? তারপর রিচার্ড মারা গেল, সে-ও বাইশ বছর আগের ঘটনা। তার বীমার টাকা সব তুলে ফিনিক্সে একটা দোকান দিলাম। ইনডিয়ানদের কাছে মোকাসিন আর গহনা বিক্রি করতাম, কিন্তু ব্যবসার কিছুই বুঝি না, খোয়ালাম সব। দোকান-টোকান বেচে দিয়ে আবার ফিরে আসতে হলো যেখান থেকে গিয়েছিলাম সেখানে। টেনেটুনে চলছি কোনমতে এখন। ঘৃণা ফুটল চোখে, বোধহয় নিজের ওপরই। হঠাৎ করেই কোমল হলো তাঁর দৃষ্টি। তবে, এখানে আসার জন্যে ছটফট করছিলাম আমি। যেখানে জন্মেছি, অনেকগুলো সুখের বছর কাটিয়েছি, সেখানে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটানোর ইচ্ছে কার না হয়? ম্যাকআররও বোধহয় তাই চায়। তার ছোটবেলা দেখেছি, নোঙরা, ললিপপ চুষত, রঙিন লালা লেগে থাকত সারা মুখে। তখনও অদ্ভুত কিছু ছিল ছেলেটার মধ্যে। কী, ঠিক মনে করতে পারছি না।
কিন্তু সত্যি যদি কিছু পাওয়ার আশা করে থাকে ম্যাকআরথার, কোন লাভ হবে না, এটা তো ঠিক? বলল কিশোর।
তা ঠিক। কিচ্ছু নেই আর ওই খনিতে।
রূপা নেই, কিন্তু যদি স্বর্ণ থাকে? দুটো ধাতু অনেক সময় পাশাপাশি থাকে তো।
থাকে। কিন্তু ডেথ ট্র্যাপ মাইনে নেই।
তামা?
না। শুধু রূপা ছিল, শেষ হয়ে গেছে, পুরানো দিনের স্মৃতি মনে করেই বোধহয় বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন মিসেস ফিলটার! সব শেষ। এক কালে কি শহরই না ছিল টুইন লেকস, কি আরামেই না ছিলাম আমরা। আবার যদি অলৌকিক কিছু ঘটত, সত্যি সত্যি কিছু পাওয়া যেত খনিটাতে, বুড়ো বয়েসে আবার হয়তো সুখের মুখ দেখতে পারতাম। কিন্তু তা-তো হবার নয়। যাকগে, এসো আমার ছোটখাট জমিদারী দেখাই তোমাদের, কথাগুলো তিক্ত শোনাল।
ছেলেদেরকে নিয়ে বাইরে বেরোলেন মিসেস ফিলটার। এখানে আসার পর ভেবেছিলাম, দরজায় তালা লাগানোর ব্যবস্থা করব, বললেন তিনি। কিন্তু পরে দেখলাম কোন দরকার নেই। জিনা লাশটা দেখার পর অবশ্য অবস্থা অন্য রকম হয়েছে। এখন অচেনা লোক আসছে। হ্যাঁ, জিনা, ভাল কথা, তোমার চাচার ছুরি পাওয়া গেছে?
নাহ্। নিয়ে গেলে আর কি পায়?
পাবে হয়তো কেউ একদিন পাহাড়ের ওদিকে, মরচে-টরচে পড়া অবস্থায়। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির উত্তর ধারে পুরানো একটা ঘরের কাছে চলে এলেন মিসেস ফিলটার। বললেন, মিলানোর ঘর ছিল এটা। খনির পে-মাস্টার ছিল সে।
দরজায় ঠেলা দিলেন মিসেস ফিলটার। মৃদু ক্যাচকোচ প্রতিবাদ জানিয়ে খুলে গেল দরজা। সবাইকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। দীর্ঘ দিনের অব্যবহৃত আসবাবপত্র, দেয়ালের প্লাসটার খসা, আলমারির দরজা ভেঙে খুলে ঝুলে রয়েছে। ভেতরে নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র, কিছু ভাঙাচোরা, কিছু মোটামুটি ভাল।
অনেকেই অনেক কিছু ফেলে গেছে, বললেন মিসেস ফিলটার। নেয়ার দরকারই মনে করেনি, বোঝা মনে করে ফেলে গেছে।
বাড়িগুলো খালি ফেলে রেখেছেন কেন? জিনা জিজ্ঞেস করল।
তো কি করব?
ভাড়া দিয়ে দিলেই পারেন। অনেক ঝামেলা আছে অবশ্য, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা।
তা নাহয় করলাম। কিন্তু ভাড়া নেবে কে? তোক কোথায়?
ঘুরে ফিরে দেখছে ছেলেরা। বালি উড়ছে, বদ্ধ ঘরের পুরানো ভ্যাপসা গন্ধে বাতাস ভারি। জায়গায় জায়গায় ছাতের প্লাসটার খসে পড়েছে, বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ে আরও বেশি করে নষ্ট হয়েছে ওসব জায়গা। মুসার ভয় হলো, গায়ের ওপরই ধসে পড়ে।
মরচে ধরা একটা স্টোভের কাছে একগাদা খবরের কাগজ স্কুপ হয়ে আছে, হলদে হয়ে গেছে পুরানো হতে হতে।
কাগজের স্তুপের পাশে গিয়ে বসে পড়ল রবিন। উল্টে দেখল দু-একটা। মিসেস ফিলটারকে জিজ্ঞেস করল, আপনি যখন জায়গাটা কেনেন, তার আগে থেকেই ছিল? মানে, পাঁচ বছর আগে যখন এলেন?
বোধহয় ছিল, মনে করার চেষ্টা করছেন মিসেস ফিলটার। হ্যাঁ, ছিলই। নইলে পরে আসবে কোত্থেকে? আমি তো রাখিনি।
ইনটারেসটিং, গালে আঙুল রাখল রবিন। আমি নিতে পারি এগুলো?
এই বস্তাপচা পুরানো খবরের কাগজ দিয়ে কি করবে? ভুরু কোঁচকালেন মিসেস ফিলটার।
ও খবরের কাগজের পোকা, হেসে বলল জিনা। পুরানো কাগজ জোগাড় করা হবি। কত রকম পাগলই তো আছে দুনিয়ায়। লাশটা পাওয়ার পর দি টুইন লেকসের অফিসে গিয়েছিলাম আমরা। জানার চেষ্টা করেছি কেন এসেছিল বাড হিলারি, কি করছিল। অনেক কিছুই জেনেছি, কিন্তু…
বার বার জিনার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপছে কিশোর, কিছু না বলার ইঙ্গিত করছে, কিন্তু দেখছেই না জিনা।
