রবিন বুঝল ব্যাপারটা, তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বলল, আমার বাবা খবরের কাগজের লোক। পুরানো কাগজের প্রতি ভীষণ আগ্রহ। সে জন্যেই নিতে চাইছি। নেব?
কিছুটা বিস্মিত মনে হলো মিসেস ফিলটারকে। নাও। নিয়ে যাও।
সাবধানে, যেন না ছেড়ে এমনিভাবে সাজিয়ে কাগজের গাদা তুলে নিল রবিন। ঘর থেকে বেরিয়ে এল সবাই। বাইরে পড়ন্ত বিকেলের সোনালি রোদ।
কিছু খাবে তোমরা? জিজ্ঞেস করলেন মিসেস ফিলটার। ঠাণ্ডা কিছু?
মুসার আপত্তি নেই, হেসে বলল জিনা।
চলো। কমলার শরবত আছে।
মিসেস ফিলটারের ছোট রান্নাঘরে আবার ফিরে এল ওরা। ফ্রিজ খুললেন মহিলা। কিন্তু কমলার রসের বোতল নেই। তাক খোঁজা হলো, আলমারি খোঁজা হলো, কিন্তু কোথাও নেই। আরে, গেল কই? মহিলা তো অবাক। দু বোতল ছিল। আমি তো আজ খাইনি। তাহলে?
সব কিছুই খুঁটিয়ে দেখা কিশোরের স্বভাব। মুদী দোকান থেকে সদ্য আনা জিনিসগুলো যেখানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, সে-তাকের দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। বলল, রুটিও একটা কম। আর এক টিন মাছ। আপনি তখন, রেখেছিলেন, দেখেছি।
কিশোরের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকালেন মহিলা, যেন কথা বুঝতে পারছেন। তাকের দিকে এক নজর চেয়েই দৌড়ে গেলেন দরজার দিকে, বাইরে তাকালেন। যেন দেখতে পাবেন, তার খাবারগুলো হাতে নিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে যাচ্ছে কোন লোক।
খবরের কাগজের গাদা নামিয়ে রাখল রবিন। রান্নাঘরের সিংক থেকে তুলে আনল একটা পোড়া সিগারেটের টুকরো। মিসেস ফিলটার, আপনি নিশ্চয় সিগারেট খান না?
রবিনের হাতের দিকে চেয়ে রইলেন মিসেস ফিলটার। চেঁচিয়ে উঠলেন হঠাৎ, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। এ-কার কাজ? কার এত খিদে পেয়েছে? আমার কাছে চাইলেই পারত, চুরি করল কেন?
শুধু খাবারই, মুসা বলল, হয়তো আরও এমন কিছু দরকার হয়েছে তার, যেটা চাইলে দিতেন না আপনি। আসুন না খুঁজে দেখি। এমনও হতে পারে, চোর এখনও বাড়িতেই লুকিয়ে আছে।
রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এল সবাই। প্রতিটি ঘর, আলমারি, বিছানার তলা খুঁজে দেখল। চোর নেই।
তেমন মূল্যবান কিছু নেই আমার, চোরে নেয়ার মত, বললেন মিসেস ফিলটার। আর কিছু খোয়াও যায়নি।
শেষ পর্যন্ত তালা আপনাকে লাগাতেই হচ্ছে, মিসেস ফিলটার, বলল কিশোর। এখন থেকে বাইরে বেরোলে তালা লাগিয়ে বেরোরেন।
কিন্তু টুইন লেকসে কেউ তালা লাগায় না, করুণ কণ্ঠে বললেন মহিলা।
আগে অচেনা কেউ ছিল না, এখন অনেকেই আসা-যাওয়া করছে। কে ভাল কে খারাপ, কি করে বুঝবেন? এই তো, খাবার চুরি করে নিয়ে গেল। একবার যখন করেছে, খিদে পেলে আবারও আসতে পারে। হুশিয়ার থাকা ভাল না?
১২
র্যাঞ্চ হাউসে ফিরে এল ওরা। দু-হাতে পাজাকোলা করে খবরের কাগজের গাদা নিয়ে এসেছে রবিন।
কেন এনেছ এগুলো? মুসা জিজ্ঞেস করল। ইতিহাসে ডক্টরেট নেবে নাকি? থিসিস লিখবে?
আর আমাকেই বা চুপ করিয়ে দিয়েছিলে কেন তখন? জিনা অনুযোগ করল।
কারও কথারই জবাব না দিয়ে রবিন বলল, বেশির ভাগ কাগজই দা টুইন লেকস। চল্লিশ বছরের আগেও কপিও আছে। তবে এই যে, এটা, ফিনিক্স থেকে বেরোয়, পাঁচ বছর আগের, মে-র নয় তারিখের কপি। দেখো দেখো, হেডলাইনটা দেখো।
দেখে গভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর। হুম! নিরাপদ কোথাও বসে ভালমত পড়া দরকার।
গোপন আর নিরাপদ জায়গা এখানে একটাই গোলাঘরটা। ভেতরে ঢুকে মডেল টি-র ধারে এসে বসল ওরা। কাগজের গাদা নামিয়ে রেখে ফিনিক্স থেকে বেরোনো পেপারটা মেলল রবিন। চারপাশ থেকে ঝুকে এল সবাই ওটার ওপর।
জোরে জোরে পড়ল রবিন :
আর্মার্ড ট্রাক লুট
দশ লক্ষ ডলার নিয়ে পালিয়েছে
মুখোশধারী ডাকাতেরা।
আজ বিকেল তিনটায় নর্থ ইনডিয়ান হেড রোডে এক দুঃসাহসিক ডাকাতি হয়েছে। ট্রাকটা সিকিউরিটিস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির! মুখখাশপরা তিনজন সশস্ত্র ডাকাত অতর্কিতে আক্রমণ করে ড্রাইভার হিনো মারকিং আর গার্ড ডিয়েগো পিটারকিনকে বেঁধে ফেলে, হাত-মুখ বেঁধে রাখে ট্রাকের পেছনে। তারপর দশ লক্ষ ডলার লুট করে নিয়ে পালিয়ে যায়। এখানে উল্লেখযোগ্য, ডাকাতদের হাতে ছিল কাটা-শটগান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য : সাদা একটা ক্রাইসলার সিডানে করে এসেছিল ডাকাতেরা। ফিনিশিয়ান লোন কর্পোরেশনের সামনে এসে আর্মার্ড ট্রাকটা থামার আগে থেকেই পথের ধারে দাঁড়িয়েছিল সাদা গাড়িটা। ডাকাতেরা মেঝেতে লুকিয়েছিল। টাকা লুট করে ওরা সাদা গাড়িতে তোলার পর পরই পাশের একটা কার্ড শপ থেকে এক মহিলা বেরিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল, দ্রুত গাড়ি চালিয়ে চলে গেল ইনডিয়ান হেড রোডের উত্তর দিকে। মুখোশধারীদের চেহারার বর্ণনা পাওয়া যায়নি, তবে মহিলাকে ভালমতই দেখেছে প্রত্যক্ষদর্শী। মহিলার বয়েস পঞ্চাশ থেকে ষাটের মধ্যে, হালকা-পাতলা গড়ন, চুল হালকা ধূসর, গায়ের রঙ তামাটে। পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চিমত লম্বা, ওজন, আন্দাজ একশো তিরিশ পাউণ্ড। গাঢ় রঙের প্যান্ট ছিল পরনে, গায়ে টারটল-নেক সাদা শার্ট। গলায় অস্বাভাবিক বড় একটা ইনিডিয়ান হার ছিল, রূপার তৈরি, নীলকান্তমনি খচিত।
খাইছে! বলে উঠল মুসা। এক মিলিয়ন নিয়ে পালাল?
মে-র নয় তারিখ, বিড় বিড় করল কুিশোর। পাঁচ বছর আগে। রবিন, তার পরদিনই তো ডেথ ট্র্যাপ মাইনের মুখ সীল করার কথা বেরিয়েছিল লর্ডবুর্গের কাগজে?
