বেশিক্ষণ লাগল না। দশ মিনিটেই যোলোটা নাম পেয়ে গেল। কিন্তু পনেরোজনই লর্ডসবুর্গের স্থায়ী বাসিন্দা। বাকি থাকল একজন, তার নাম বেকার। হেইম্যান। পাঁচ বছর আগেরর ডিরেকটরিতে আছে, মাঝখানে কয়েকটা বছর নেই, তারপর একেবারে চলতি বছরের বইতে আবার নাম উঠেছে।
মাঝখানে কোথাও চলে গিয়েছিল হয়তো, কিশোর বলল আবার ফিরেছে। আগে যে বাড়ির ঠিকানা ছিল, এখনও তাই আছে।
না, ও আমাদের চোর না, মাথা নাড়ল মুসা। বোঝা যাচ্ছে, কোথাও নামধাম না লিখিয়েই কেটে পড়েছে লর্ডসবুর্গ থেকে আমাদের বি এইচ।
থাকার তো কথা মাত্র কয়েক মাস, রবিন বলল।
পেয়েছ? নিজের ডেস্ক থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন লাইব্রেরিয়ান।
না, স্যার, হতাশ ভঙ্গিতে জবাব দিল কিশোর। মা বোধহয় ভুল অনুমান করেছে। এখানে আসেইনি মামা। আর এসে থাকলেও হয়তো ডিরেকটরিতে নাম তোলেনি, ফোন নেয়নি। একটা ব্যাপার অবশ্য…মামা যেখানে যায়, শুনেছি কিছু একটা করে মাত করে দেয়, খবরের কাগজে নাম উঠে যায়। পুরানো কাগজগুলো, স্যার…
দেখতে চাও? ওই যে, ওখানে, দেখিয়ে দিলেন লাইব্রেরিয়ান।
একের পর এক পাতা উল্টে চলল ওরা। কিছুই পাওয়া গেল না। অবশেষে, ১০ই মে-তে এসে থমকে গেল। ডেথ ট্র্যাপ মাইনের মুখ বন্ধ করার খবর ছেপেছে। পড়ে বলল রবিন, হুঁ, লর্ডসবুর্গের কাগজেও লিখেছে দেখা যাচ্ছে। হিলারির মৃত্যুর সঙ্গে এর কোন যোগাযোগ থাকতে পারে?
কি জানি, কাঁধ ঝাঁকাল কিশোর। হয়তো খবরটা পড়ে কোন কারণে টুইন লেকসে ছুটে গিয়েছিল হিলারি, খনির ভেতরটা দেখতে। গাড়িটা কবে চুরি হয়েছে, লিখে রেখেছ না?
নোটবুক দেখে জানাল রবিন, মে-র এগারো। লর্ডসবুর্গের কাগজে খবর বেরোনোর পরদিন। আর খনির মুখ বন্ধ করার তিন দিন আগে। যোগাযোগ আছে। মনে হচ্ছে।
কিন্তু কি যোগাযোগ? প্রায় চেঁচিয়ে উঠল জিনা। খনির মুখ বন্ধ করা হবে জানল চোরটা, তারপর এতই উত্তেজিত হয়ে পড়ল, গাড়ি চুরি করে নিয়ে ছুটে গেল ওখানে গর্তে পড়ে মরার জন্যে? যাতে পাঁচ বছর আর কোন খবর না থাকে তার? আমার মনে হয়, ম্যাকআরথারই তাকে ওখানে দেখা করতে…
দূর! বিরক্ত হয়ে বলল মুসা। মুহূর্তের জন্যেও ম্যাকআরথারকে তুলতে পারো না নাকি তুমি?
যে অন্ধকারে ছিলাম, সেখানেই রয়ে গেছি আমরা, রবিন বলল। আমরা জানি, বাড হিলারি লর্ডসবুর্গে এসেছিল, গাড়ি চুরি করেছিল, টুইন লেকমে সে-ই গাড়ি নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু প্রমাণ করতে পারব না। সকালটাই মাটি।
পুরোপুরি মাটি না, সান্ত্বনা দিল কিশোর। নুড়িটা আবার বের করে দেখাল। যেদিন এই নুড়িটা পেলাম, সেদিনই বাড হিলারির লাশও আবিষ্কার করলাম। কি যোগাযোগ আছে জানি না, তবে এটুকু জোর দিয়ে বলতে পারি, যোগাযোগ কিছু একটা আছেই।
১১
বিকেল নাগাদ র্যাঞ্চে ফিরে এল ওরা। গাড়ি থেকে মালপত্র নামাতে উইলসনকে সাহায্য করল ছেলেরা। চারাগুলোকে গোলাঘরের কাছে রেখে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখল। বাড়ির ভেতরে চলে গেছেন উইলসন।
মিসেস ফিলটারের বাড়ির দিকে তাকাল কিশোর। ডেথ ট্র্যাপ মাইনের কথা আর সবার চেয়ে ওই মহিলাই বেশি বলতে পারবেন।
মিসেস ফিলটার? জিনা বলল, হ্যাঁ, তা পারবেন।
চলো যাই তাহলে, তার সঙ্গে দেখা করে আসি।
অন্য দুজনও এক কথায় রাজি। রাস্তা পেরিয়ে মিসেস ফিলটারের বাড়িতে এসে দাঁড়াল চারজনে, দরজায় ধাক্কা দিল কিশোর।
সাড়া দিলেন মিসেস ফিলটার, ভেতরে যেতে বললেন ছেলেদেরকে।
ভেজানো দরজা, ঠেলা দিতেই খুলে গেল। পথ দেখিয়ে ছেলেদেরকে রান্নাঘরে নিয়ে এল জিনা। মিসেস ফিলটারকে জিজ্ঞেস করল, ব্যস্ত?
হাসলেন মহিলা, চোখের কোণের ভাঁজগুলো গভীরতর হলো। আজকাল আর ব্যস্ততা কোথায়? তবে আমাকে যদি একটু সাহায্য করতে, প্লীজ…আমার ট্রাকে কিছু মালপত্র আছে, যদি নামিয়ে দিতে। মুদীর কাছে গিয়েছিলাম।
ঠিক আছে, ঠিক আছে, এক্ষুণি দিচ্ছি নামিয়ে, বলল মুসা।
কাঁচা মাটির গাড়িবারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে মিসেস ফিলটারের ট্রাক। বড় একটা কার্ডবোর্ডের বাক্স বোঝাই বাদামী রঙের কাগজে মোড়া প্যাকেট। রান্নাঘরে বয়ে নিয়ে এল ওটা মুসা, নামিয়ে রাখল।
থ্যাংক ইউ, বললেন মিসেস ফিলটার। বয়েস হয়েছে তো, আগের মত কাজ আর করতে পারি না। প্যাকেট খুলে শাকসজি, রুটি ও টিনের খাবার বের করে তাকে সাজিয়ে রাখতে লাগলেন।
হঠাৎ চাপা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন মিসেস ফিলটার। খনি-খনি খেলা শুরু করেছে আবার ম্যাকআরথার। এটাই আশা করছিলাম। আধ ঘন্টা আগে তার শহুরে বন্ধুকে নিয়ে ঢুকতে দেখেছি তো।
খনি খুঁড়ছে নাকি আবার? বলল কিশোর।
দেখেশুনে তা-ই মনে হয় বটে, সায় দিয়ে বললেন মিসেস ফিলটার। বিস্ফারণ ঘটাচ্ছে খনির ভেতরে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখানেই জন্মেছি তো, ওই শব্দ আমি চিনি, কোনদিন ভুলব না। এই বাড়িতেই বাস করেছি, যখন আমার স্বামী সুপারিনটেনডেন্ট ছিল। খনির সুড়ঙ্গে ডিনামাইট ফাটার শব্দ কয়েকদিন শুনলেই তোমরাও আর ভুলবে না। কিন্তু সব সময় খনিতে বোমা ফাটায়
ম্যাকআরথার, শুধু সঙ্গী থাকলেই ফাটায়। তার লস অ্যাঞ্জেলেসের বন্ধুকে দেখায় বোধহয়।
অদ্ভুত শখ, রনি মন্তব্য করল।
অনেকেরই থাকে এ-রকম, হাসলেন মিসেস ফিলটার। একটা লোককে চিনতাম, তার বাড়ির পেছনে মাঠে তিনশো গজ লম্বা এক লাইন বসিয়েছিল, পুরানো একটা রেলইঞ্জিন কিনে তাতে চালাত। বার বার সামনে-পেছনে করত, চালানোর সময় ড্রাইভারের পোশাক পরে নিত। বেশি টাকা থাকলেই এসব ভূত চাপে লোকের মাথায়। ম্যাকআরথারেরও হয়তো ওরকম কিছু হয়েছে। সারাজীবন বাপের মুখে খনির গল্প শুনে শুনে খনি-খোড়ার ভূত চেপেছে আর কি। সেই পুরানো দিনের স্বাদ পেতে চাইছে। এতে দোষের কিছু দেখি না।
