তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এল ছেলেরা। দরজা খুলে দিল জিনা।
কাণ্ড দেখেছ? যেন জিনাকে বলার জন্যেই এসেছেন মিসেস ফিলটার। খনিতে আবার কাজ শুরু করেছে মিস্টার ম্যাকআরথার।
রান্নাঘর থেকে বেরোল ভিকি। কিন্তু কি লাভ? ওই খনিতে আর কিছু নেই। সব রূপা শেষ।
কিন্তু তা-ও তো কাজ শুরু করল। ডিনামাইট ফাটাল। শোনোনি? আমার ভুল হতে পারে না। ওই শব্দ জীবনে এত বার শুনেছি, কোনদিন ভুলব না।
খেলাধুলা করছে আরকি, হালকা গলায় বলল মুসা। কিংবা টুরিস্ট আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে। জানেনই তো, পুরানো ভূতুড়ে শহর কিনে ঠিকঠাক করে ব্যবসা ফেঁদে বসে লোকে। এ-ও হয়তো তেমনি কিছু।
অস্বস্তি ফুটল মিসেস ফিলটারের চোখে। জায়গাটার বারোটা বাজাবে লোকটা। শান্তি তাহলে শেষ।
তার জায়গা, সে যা খুশি করবে, ঠোঁট বাঁকাল জিনা, আসলে চাচাকে ভেঙাল, উইলসনও এমনি করেই বলেছিলেন।
বিরক্তি চাপতে পারলেন না মিসেস ফিলটার, নাক দিয়ে বিচিত্র একটা শব্দ করে ফিরে চললেন বাড়িতে।
আমার বিশ্বাস হয় না টুরিস্টদের জন্যে খনি ওপেন করতে যাচ্ছে ম্যাকআরথার, বলল কিশোর। টুইন লেকস অনেক দূর, রাস্তাও ভাল না।
কি করছে তাহলে? প্রশ্ন করল মুসা।
হাসল কিশোর। ওর মেকসিকান শ্রমিকদের জিজ্ঞেস করে দেখব। ম্যাকআরথার নেই এখন। চলো তো যাই।
মিনিট কয়েক পর নতুন ভোলা বেড়ার কাছে এসে দাঁড়াল ওরা। শ্রমিকদের ডাকল। ইংরেজিতে কথা বলল ওরা। জবাব নেই। ভাঙা ভাঙা প্যানিশ জানে কিশোর, চেষ্টা করে দেখল। তা-ও সাড়া মিলল না। সন্দিগ্ধ চোখে তাদের দিকে তাকাচ্ছে মেকসিকান দুজন।
হতাশ হয়ে ফিরে এল ওরা। ভিকির সাহায্য চাইল।
তুমি তো মেকসিকোর ভাষা জানো, ভিকিখালা, মুসা বলল। গিয়ে বলে দেখো না একটু। তোমাকে হয়তো বিশ্বাস করবে।
বেশ আগ্রহ নিয়েই গেল ভিকি। ফিরে এল একটু পরেই। ভার দিকে নাকি তাকিয়েও দেখেনি শ্রমিকেরা, তার ওপর রয়েছে কুকুরটা। দেখা মাত্র চিনে ফেলেছে শত্রুকে, ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এসেছে। চেঁচামেচির মাঝেও শ্রমিকদের নিজেদের আলোচনার একটা শব্দ কানে এসেছে, ওরো।
ওরো? ভিকির উচ্চারণের প্রতিধ্বনি করল কিশোর। মানে স্বর্ণ! ম্যাকআরথার কি সোনা খুঁজছে নাকি খনিতে?
কিন্তু ওটা তো রূপার খনি? প্রতিবাদ করল ভিকি।
সোনা আর রূপা অনেক সময় কাছাকাছিই পাওয়া যায়, পকেট থেকে নুড়িটা বের করল কিশোর। জিনা, তোমার চাচা কবে লর্ডসবুর্গ যাবেন, কিছু বলেছেন?
আগামীকাল, জানাল জিনা।
কালই বোঝা যাবে, কি মেশানো আছে নুড়িটাতে।
১০
লর্ডসবুর্গে পোস্ট অফিসের সামনে গাড়ি পার্ক করলেন উইলসন। স্যান জোসেতে চারার অর্ডার দিয়েছিলাম, বললেন তিনি। ওগুলো ডেলিভারি নিয়ে বিল্ডারস সাপ্লাই কোম্পানিতে যাব, কাজ আছে। ঠিক একটায় এখানে থাকব, তোমরাও
থেকো। লাঞ্চ সেরে তারপর বাড়ি রওনা হব।
চাচা, ওদের সঙ্গে আমি যাই? জিনা অনুরোধ করল।
যাবে? ঠিক আছে, যাও। কোন রকম গোলমাল পাকিও না আবার। এখানে অবশ্য খনি-টনি কিছু নেই, কিন্তু তোমাকে বিশ্বাস কি। কখন যে কোথায়… বাক্যটা শেষ করলেন না তিনি।
আর কিছু না বলে পোস্ট অফিসে ঢোকার দরজার দিকে এগোলেন উইলসন।
আগে নুড়িটা দেখাচ্ছ তো? কিশোরকে জিজ্ঞেস করল মুসা। তাতে সময় লাগবে। কোথায় পাওয়া গেছে, বলবে নাকি জুয়েলারকে?
পাগল। টুইন লেকসে সোনা আছে শুনলে মৌমাছির মত গিয়ে ভিড় করবে লোকে। রিপোর্টারদের জ্বালায় পালানো ছাড়া পথ থাকবে না। দেখি, কিছু একটা বানিয়ে বলে দেব জুয়েলারকে।
পোস্ট অফিসের দুটো ব্লক পরেই পাওয়া গেল জুয়েলারের দোকান। জানালায়। সাইনবোর্ড লেখা :
ঘড়ি মেরামত করা হয়।
পুরানো স্বর্ণ আর রৌপ্য
কেনা-বেচা করা হয়।
ঠিক এরকম কাউকেই খুঁজছিলাম, বলে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল কিশোর।
মোটা, প্রায় গোলাপী রঙের একটা লোক বসে আছে কাচের পার্টিশনের ওপাশে। চোখে একটা ঘড়ির মেকানিকের লেন্স, ঘড়ি মেরামত করছে লোকটা। তার পাশে একটা শো-কেসে সাজানো রয়েছে রূপার পুরানো জিনিসপত্র, কয়েকটা সোনার টাই-পিন আর আঙটি।
আপনিই মালিক? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
হাতের ছোট ভ্রু-ড্রাইভারটা রেখে চোখ থেকে লেন্স খুলে রাখল লোকটা। হাসল।
পকেট থেকে নুড়িটা বের করল কিশোর। সিলভার সিটিতে বন্ধুর ওখানে বেড়াতে এসেছি আমরা। গতকাল পাহাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম, এক বুড়োর সঙ্গে দেখা, খনিজ পদার্থের সন্ধানে পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় সে।
মাথা ঝাঁকাল মালিক। আজকাল অনেকেই ঘোরে।
লোকটা বলল, তার টাকা দরকার। এটা বের করে দিল, নুড়িটা বাড়িয়ে দিল কিশোর। বলল, অনেক দিন ধরে আছে তার কাছে। টাকা লাগবে, তাই বিক্রি করে দিতে চায়।
চোখ তেরছা করে নুড়িটা দেখল মালিক, জোরে জোরে ডলল আঙুল দিয়ে। হাসিটা তেমনি রয়েছে। কত দিয়েছ?
পাঁচ ডলার, বলল কিশোর।
এটা আসল? জিজ্ঞেস করল জিনা।
মনে তো হচ্ছে, ঘুরিয়ে বলল লোকটা। স্বর্ণ আছে কিনা বোঝা যাবে এখুনি। ডুয়ার খুলে ছোট একটা শিশি আর একটা উখা বের করল সে। উখা দিয়ে ঘষে সরু একটা দাগ কাটল নুড়ির গায়ে, শিশি থেকে এক ফোঁটা তরল পদার্থ ফেলল খাজে। নাইট্রিক অ্যাসিড, জানাল সে। বেশির ভাগ ধাতুরই বিক্রিয়া ঘটায়, তবে সোনার কিছু হয় না। কয়েক সেকেণ্ড পর মাথা ঝাঁকাল। হ্যাঁ, সোনা আছে।
