কি ব্যাপার? খুব আনন্দে আছ মনে হচ্ছে? হেসে জিনাকে বলল কিশোর।
আনন্দই তো, জবাব দিল ভিকি। পুরানো দিনের কথা মনে করে দিচ্ছে। পঁয়তাল্লিশ বছর আগে টুইন লেকসে এ-রকম উত্তেজনাই ছিল। শনিবারে এমন কোন রাত যেত না, যেদিন মারপিট হত না। শেষে শেরিফকে এসে থামাতে হত।
খালা, জিনা বলল শিও ম্যাকআরখারকে দেখেছু?
দেখব না মানে? হেসে বলল ভিকি। ওসব ভোলা যায় নাকি?
সত্যি এখানে জন্মেছে?
তবে কোথায়? কোর্ট হাউসের কাছে ছোট একটা সবুজ বাড়িতে থাকত তার মা-বাবা। তার বাপ ছিল খনির ফোরম্যান। খনির কাজে ওস্তাদ। হ্যারির পরে আর কোন শিশুকে জন্মাতে দেখিনি এ-শহরে, তার আগেই চলে গিয়েছিলাম। খনিরও। তখন শেষ দশা, লোকে গাঁটরি গোছাতে শুরু করেছে। অনেক দিন পর আমি ফিরেছি। হ্যারিও ফিরল। তার বাবা-মা কেমন, কোথায় আছে, টুইন লেকস থেকে যাওয়ার পর কেমন কেটেছে, গিয়ে জিজ্ঞেস করব ভাবছি একদিন, সময়ই করে উঠতে পারি না। তাছাড়া হ্যারিও খুব ব্যস্ত। সারাক্ষণ লাল ট্রাকটা নিয়ে ঘোরে, কি করে, কে জানে। আজ ভোরে দেখলাম, তাড়াহুড়ো করে কোথায় যাচ্ছে, মাথায় সেই অদ্ভুত হ্যাট। কেন যে পরে, বুঝি না।
রাস্তায় গাড়ির শব্দ হলো।
দোতলায় ছুটল জিনা। নেমে এসে জানাল, ম্যাকআরথার ফিরেছে। সূঙ্গে আরও দুজন লোক। মনে হলো মেকসিকান,বলল সে। আবার কোন্ মতলব?
জিজ্ঞেস করলে না কেন? ভিকি বলে উঠল।
করলেই যেন বলবে। তাছাড়া ওকে বিরক্ত করলে চাচা যাবে রেগে। বলেছে, আমাকে ঘরে তালা দিয়ে রাখবে।
পারবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে আমার, বলে, কোয়ার্টারের দিকে চলে গেল ভিকি।
নাস্তা সেরে খেতে কাজ করতে চলল তিন গোয়েন্দা। বড় একটা খেতের গাছ সব ছেটে আরেকটায় এসে ঢুকল। জিনাও এসে হাত লাগাচ্ছে মাঝে মাঝে, তবে ম্যাকারবারের বাড়ির দিকেই তার খেয়াল। কমেটের পিঠে চড়ে বারবার গিয়ে টু মেরে আসছে ওদিক থেকে। খবর জানাচ্ছে বন্ধুদেরকে। খনিমুখের কাছেই কাঠের ছোট একটা ছাউনি আছে, সেটার দরজায় নাকি এখন ঝকঝকে নতুন তালা ঝুলছে। ম্যাকআরথার তার বিচিত্র পোশাক আর হ্যাট পরে গাড়িতে করে ঘুরছে, সাংঘাতিক ব্যস্ত।
সেদিন নতুন কিছু ঘটল না।
দ্বিতীয় দিনে শ্রমিকেরা এল। ট্রাকে করে নিয়ে এসেছে সিমেন্টের বস্তা, স্টীলের খুঁটি। ম্যাকআরথারের সীমানা ঘিরে আট ফুট উঁচু বেড়া দিতে শুরু করল।
দুপুরে খাওয়ার সময় জিনা বলল, বাতিল একটা খনির জন্যে বেহুদা খরচ করছে লোকটা। ওটা নিয়ে কে মাথা ঘামাতে যাচ্ছে?
তুমি যাচ্ছ, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন তার চাচা। পাগল হয়ে আছ ভেতরে ঢোকার জন্যে। জোকগুলোর কথা বাদই দিলাম। করবে কি বেচারা? ক্রিস্টমাস গাছের প্রতি লোকে এত আগ্রহ দেখালে আমিও বেড়া দিতে বাধ্য হতাম।
খাওয়ার পর রাস্তার ধারের খেতে আগাছা বাছতে চলে গেলেন উইলসন।
চেয়ারে হেলান দিয়ে ভ্রুকুটি করল কিশোর। ক্রিস্টমাস গাছের ব্যাপারে যদি আগ্রহী না-ই হয়, গোলাঘরে ঢুকল কেন চোর?
কেউ জবাব দিল না।
এঁটো বাসনগুলো ঠেলে দিয়ে হাত ধুয়ে বেরিয়ে এল ওরা। গোলাঘরের দিকে চলল। ভালমত দেখবে।
কিচ্ছু নেই, মুসা বলল। খড়, কিছু যন্ত্রপাতি, হোস পাইপ আর একটা পুরানো অচল গাড়ি।
হয়তো ছুরির দরকার পড়েছিল ব্যাটার। খুব খারাপ কথা, রবিন মন্তব্য করল। যা একেকটা ছুরি, এক কোপে ধড় থেকে কল্লা নামিয়ে দেয়া যাবে। ওই জিনিস কার দরকার পড়ল?
গোলা থেকে বেরোল ওরা। গেটের সামনে দিয়ে চলে গেল ম্যাকআরথারের লাল শেভি সুবারব্যান। খনির দিকে চলেছে। ম্যাকআরথারের পাশে বসে আছে আরেকজন, হালকা সামার-সুট আর সাদা হ্যাটে বেশ ভান্ত মনে হচ্ছে।
দৌড়ে র্যাঞ্চ হাউসে চলে এল ছেলেরা, দুপদাপ করে সিঁড়ি বেয়ে এসে উঠল দোতলায়। বাকরুমের ঝোলা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ম্যাকআরথারের বাড়িতে কি ঘটে দেখার জন্যে উদগ্রীব।
শ্রমিক দুজন এখন বেড়া লাগাচ্ছে না। একজন বেরিয়ে এল খনির ভেতর থেকে, একটা ঠেলাগাড়ি ঠেলে নিয়ে, তাতে পাথর আর মাটি বোঝাই। কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে থামাল ম্যাকআরথার, গাড়ি থেকে এক মুঠো মাটি-পাথর তুলে নিয়ে মেলে ধরল তার সঙ্গীর চোখের সামনে। তারপর কিছু বলল শ্রমিককে।
গাড়িটা এক জায়গায় রেখে ওয়ার্কশপ বিল্ডিঙে চলে গেল শ্রমিক।
অতিথিকে নিয়ে ম্যাকআরথার ঢুকল খনিতে।
মিনিটখানেক পর চাপা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল খনির ভেতর থেকে। কয়েক সেকেণ্ড দূরাগত মেঘ গর্জনের মত গুমগুম করে মিলিয়ে গেল শব্দের রেশ।
আবার গুলি করছে, চেঁচিয়ে উঠল জিনা।
গুলি না, মাথা নাড়ল কিশোর। তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। ডিনামাইট।
বারান্দায় বেরিয়ে এলেন মিসেস ফিলটার। ম্যাকআরথারের বাড়ির দিকে নজর।
খনিমুখে দেখা দিল ম্যাকআরথার আর তার অতিথি। পেছনে বেরোল দ্বিতীয় শ্রমিকটা। সে-ও আরেকটা ঠেলাগাড়ি ভরে মাটি আর পাথর নিয়ে বেরিয়েছে।
খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিট কথা বলল ম্যাকআরথার আর তার সঙ্গী। তারপর লাল ট্রাকে চড়ে এগিয়ে এল পথ ধরে।
বারান্দায় একই ভাবেড়িয়ে আছেন মিসেস ফিলটার, তার সামনে দিয়েই গেল ট্রাক, কিন্তু ফিরেও তাকাল না ম্যাকআরথার।
ট্রাকটা চলে যাওয়ার পর রাস্তা পেরিয়ে র্যাঞ্চ হাউসের দিকে এগিয়ে এলেন মিসেস ফিলটার, অধৈৰ্য্যভাবে নাড়ছেন হাতের চুড়ি।
