কিশোর, এই কিশোর? ফিসফিস করে ডাকল। রবিন? শুনছ?
উঁ…কি? পাশ ফিরল রবিন।
গোলাঘরের দরজা খুলল কে জানি, উঠে পা টিপে টিপে জানালার দিকে এগোল মুসা। চৌকাঠের ওপর দিয়ে ঝুঁকে তাকাল। পাশে এসে দাঁড়াল অন্য দুজন।
কই, দরজা তো বন্ধ, রবিন বলল।
পর মুহূর্তেই আলো দেখা গেল গোলাঘরের জানালার ময়লা কাচে, নাচছে। আলোটা মৃদু। নিভে গেল। জ্বলল আবার।
দেশলাই জ্বালছে, কিশোর বলল! চলো তো, দেখি।
দ্রুত শার্ট-প্যান্ট আর জুতো পরে নিল ওরা। নিঃশব্দে নেমে এল সিঁড়ি বেয়ে। সাবধানে খুলল সামনের দরজা।
চাঁদ ডুবে গেছে। বেশ অন্ধকার। আগে আগে এগোল গোয়েন্দাপ্রধান, তাকে অনুসরণ করল সহকারীরা। গোলাঘরের দরজার কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে, এই সময় আলগা পাথরে পা পড়ে পিছলাল রবিন, গোড়ালি গেল মচকে, জোরে চিৎকার দিয়ে বসে পড়ল সে।
সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল ঘরের আলো। জানালা অন্ধকার।
খাইছে! জোরে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে মুসা।
একটা পাথরে বসে গোড়ালি ডলতে শুরু করল রবিন, চোখ গোলাঘরের দিকে। খানিক পরেই উঠে দাঁড়াল সে। আবার এগোল তিনজনে। আস্তে করে দরজার বাইরে খিলে হাত রাখল কিশোর, মৃদু খড়খড় করে উঠল ওটা।
ঝটকা দিয়ে খুলে গেল দরজা। বুকে জোর ধাক্কা খেয়ে উল্টে মাটিতে পড়ে গেল কিশোর। মোটাসোটা মূর্তিটাকে দেখেই লাফিয়ে একপাশে সরে গেল মুসা। ওদের মাঝখান দিয়ে ছুটে চলে গেল লোকটা, হারিয়ে গেল গাড়ি পথের ওপাশের ক্রিস্টমাস খেতে।
কে? বাড়ির ভেতর থেকে ডাক শোনা গেল। কে ওখানে?
উঠে দাঁড়াল কিশোর। জবাব দিল, গোলাঘরে চোর ঢুকেছিল।
তাই নাকি? সর্বনাশ! বললেন উইলসন। এখুনি শেরিফকে ফোন করছি।
ম্যাকআরথারের বাড়ির দিকে হাত তুলে বলল মুসা, ব্যাট। ওদিকে গেছে।
কান পেতে রয়েছে ছেলেরা, কিন্তু আর কোন শব্দ শোনা গেল না। অন্ধকার খেত, গাছগুলো নিথর।
বেশি দূর যায়নি, বলল কিশোর।
ঢোক গিলল মুসা, পায়ে পায়ে এগোেল খেতের দিকে। কান খাড়া; কোন গাছ নড়ছে কিনা, অন্ধকারে বোঝার চেষ্টা করছে। তার পেছনেই রয়েছে কিশোর আর রবিন। আরেকটু এগিয়ে আস্তে করে বায়ে সরে গেল কিশোর, রবিন সরলো জানে। খেতে ঢুকে পড়ল মুসা, খুব সাবধানে এগোচ্ছে যাতে নিচের দিকের কোন ডালে পা বেধে হুমড়ি খেয়ে না পড়ে।
হঠাৎ থেমে গেল মুসা! দুরুদুরু করছে বুক, কানের কাছে শুনতে পাচ্ছে যেন রক্তের দ্রুত সঞ্চালন। আরেকটা শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে, জোরে নিঃশ্বাস ফেলার আওয়াজ। জোর করে শব্দটা চেপে রাখতে চাইছে যে লোকটা। দৌড়ে এসে হাঁপিয়ে পড়েছে। রয়েছে কাছেই।
স্থির হয়ে গেছে মুসা, শুনছে ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস। তার কাছ থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে গাছের আড়ালে রয়েছে, হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারে। সঙ্গীদের ডাকার জন্যে মুখ খুলতে গিয়েও থেমে গেল সে। চোরটা ভাগবে তাহলে।
এই সময় গাড়ির আওয়াজ শুনে হাসি ফুটল মুসার মুখে। শেরিফ ছুটে আসছেন। চোরটাকে পাকড়াও করতে পারবে এবার।
গেটের কাছে মোড় নিল গাড়ি, হেডলাইটের আলো ঘুরে এসে পড়ল মুসা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। এক দৌড়ে গিয়ে আরেকটা ঘন ঝাড়ের ভেতরে ঢুকে গেল চোর। লাফিয়ে উঠে তার পিছু নিল মুসা। কিন্তু দুই পা এগিয়েই থেমে গৈল। ওপরের দিকে ভোলা একটা হাত দেখতে পাচ্ছে, নড়তে শুরু করেছে। হাতটা।
ঝট করে নিচু হয়ে গেল মুসা। শাঁ করে তার মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল ধারাল লম্বা ফলা, একটা গাছের মাথা দু-টুকরো হয় গেল, আরেক মুহূর্ত দেরি করলে গাছের পরিণতি হত মুসার।
গাছপালা ভেঙে মাড়িয়ে আবার দৌড় দিল চোর।
সোজা হলো মুসা। হাঁটু কাঁপছে। বড় বাঁচা গেছে, আরেকটু হলেই আজ…আর ভাবতে পারল না সে।
পাশে এসে দাঁড়াল কিশোর।
ভোজালী! কোনমতে বলল মুসা। গাছ কাটার ছুরি! আরেকটু হলেই দিয়েছিল আমার মুণ্ডু আলাদা করে!
৯
সঙ্গে করে এক যুবক সহকারীকে নিয়ে এসেছেন শেরিফ, নাম ডিক। সব কথা মন দিয়ে শুনল ওরা, তার পর জোরাল একটা টর্চ নিয়ে চোর খুঁজতে বেরোল। ক্রিস্টমাস খেতে পায়ের ছাপ পাওয়া গেল, মুসা যেখানে দাঁড়িয়েছিল তার কাছেই। ম্যাকআরবারের সীমানার ভেতরে অন্য অনেকগুলো ছাপের সঙ্গে গিয়ে মিশেছে। চোরের ছাপ। আর অনুসরণ করা গেল না, কোনটা যে কার বোঝাই মুশকিল।
দোতলায় দাঁড়িয়ে দেখছে ছেলেরা।
ম্যাকআরথারকে ডেকে তুলে তার কেবিনে ঢুকলেন শেরিফ আর তার সহকারী। কুকুরটা চেঁচাচ্ছে। কিন্তু কান দিল না ওরা, তিনজনে গিয়ে ঢুকল খনিতে।
মিসেস ফিলটার জেগে গেছেন, আলো দেখা যাচ্ছে তার জানালায়।
মহিলার বাড়িতেও ঢুকলেন শেরিফ, অব্যবহৃত ঘরগুলোতে ঢুকে দেখলেন।
ঘণ্টাখানেক পরে র্যাঞ্চহাউসে ফিরে এলেন শেরিফ আর ডিক।
চোরটা, উলইসনকে বললেন শেরিফ, পাহাড়ের ওদিকে চলে গেছে। অন্ধকারে খুঁজে বের করা যাবে না, তাই আর পিছু নিলাম না। রিপোর্টারদের কেউও হতে পারে। কিছু একটা ঘটলেই পঙ্গপালের মত এসে হেঁকে ধরে। কিন্তু। ছুরিটা কেন নিল বুঝলাম না।
সহকারীকে নিয়ে শহরে ফিরে গেলেন শেরিফ।
দরজা বন্ধ করলেন উইলসন, নিচ তলায় জানালাগুলোও সব বন্ধ করে দিলেন।
সকালে হো-হো হাসি শুনে ঘুম ভাঙল ছেলেদের। নিচে রান্নাঘরে নেমে দেখল বেশ জমিয়ে নিয়েছে জিনা আর ভিকি। টেবিলে বসে কফি খাচ্ছে জিনা।
