ভাবছি, স্যান ফ্রানসিসকো থেকে পালিয়ে এসে কতদিন লর্ডসবুর্গে ছিল হিলারি? আনমনে বলল কিশোর।
লাইনোটাইপ মেশিনের গায়ে হেলান দিল মুসা। কে জানে? পুলিশকে না জানিয়ে পালিয়ে এসে আইন অমান্য করেছে সে, ঠিক। তবে সেটা পাঁচ বছর আগে। এতদিনে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে নিশ্চয় পরিস্থিতি।
হ্যাঁ, মাথা দোলাল কিশোর। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, বিনা কারণেই এসেছিল এখানে। খনিতে ঢুকেছিল। এমন একটা খনি, যেটা কিনেছে হ্যারি ম্যাকআরথার। লাশটা যে ছিল খনিতে, কেন জানল না সে? দুজনের মাঝে, ঘটনাগুলোর মাঝে কি কোন যোগসূত্র রয়েছে? একজন জেলফেরত দাগী আসামী আর একজন রহস্যময় ধনীর মাঝে? একটাই কাজ এখন করার কাছে আমাদের।
কী? আগ্রহে সামনে ঝুঁকল মুসা।
সময়কে পিছিয়ে নিতে পারি আমরা।
হাঁ হয়ে গেল মুসা। কি আবল-তাবল বকছ? এই কিশোর?
অ্যাঁ? সংবিৎ ফিরল যেন কিশোরের। হ্যাঁ, সময়কে পিছিয়ে নিতে পারি। হিলারির অতীত উদঘাটনের চেষ্টা করতে পারি। লর্ডসবুর্গে থেকে থাকলে, নিশ্চয় রাতে ঘুমাতে হয়েছে তাকে। কোথায়? এত বছর পর জানার চেষ্টা করা কঠিন, হয়তো বৃথাই হবে, তবু চেষ্টা করতে ক্ষতি নেই। পুরানো খবরের কাগজ আর টেলিফোন ডিরেকটরি ঘেটে দেখতে পারি। হ্যাঁ, এই একটাই কাজ করার আছে এখন আমাদের।
৮
শেষ বিকেলে বাড়ি ফিরল ওরা।
বারান্দায় অস্থির ভাবে পায়চারি করছেন উইলসন। গাড়ি বারান্দায় তিনটে গাড়ি। জটলা করছে কয়েকজন লোক, কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে।
কারও সঙ্গে কথা বলবে না আমার ভাস্তি, রাগ করে বললেন উইলসন। এমনিতেই ও বদমেজাজী, তার ওপর এই ঘটনায় মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেছে… ছেলেদেরকে দেখে থেমে গেলেন। জিনা, ঢোকো। সোজা ওপরতলায়। লাফ দিয়ে সিঁড়ির কাছে এসে জিনার বাহু ধরে টেনে নিয়ে ঠেলে দিলেন ঘরের ভেতরে। পিঠে ধাক্কা দিয়ে ছেলেদেরও ঢুকিয়ে দিলেন তাড়াতাড়ি। নিজেও ঢুকে দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন দরজা।
রিপোর্টার না জোক, লাল হয়ে গেছে তার মুখ। একটা কথাও বলবে না ওদের সঙ্গে।
কেন, কি হবে? প্রশ্ন না করে পারল না জিনা। আমি তো এখন মস্ত বড় খবর, তাই না?
কি হবে? তোমার মা শুনলে আমার মুণ্ডু কেটে নেবে, এই হবে।
আগে হুঁশিয়ার করলে না কেন? আমি তো সব বলে এসেছি সম্পাদক পিটারসনকে।
পিটারসনের কথা আলাদা, ছেলেদের অবাক করে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন উইলসন। সে চালায় একটা অখ্যাত পত্রিকা। জাপানে বসে এটা পাবে না তোর মা, জানবেও না কিছু। যা বলছি, শুনবি। বাড়ি থেকে একদম বেরোবি না আজ। কালও যদি জোকগুলো না যায়, কালও বেরোনো চলবে না।
আংকেল, কিশোর বলল, কাল আমরা লর্ডসবুর্গে যেতে চাই।
কেন?
পকেট থেকে নুড়িটা বের করল কিশোর, আগের দিন খনিতে যেটা কুড়িয়ে পেয়েছিল। দেখিয়ে বলল, জুয়েলারকে দেখাব।
হাসলেন উইলসন। সোনার টুকরো মনে করেছ? হতাশ হবে। ডেথ ট্র্যাপে সোনা নেই। যেতে পারো, তবে কাল নয়। এ-হপ্তায়ই আমি যাব, তুমি আর জিনা যেতে পারবে তখন। চাইলে, চারজনেই যাবে। তোমাদেরকে রেখে যাওয়ার চেয়ে নিয়ে যাওয়াই নিরাপদ।
রিপোর্টারদের বিদায় করার জন্যে আবার বেরোলেন উইলসন।
সারাটা বিকেল বই পড়ে আর আলোচনা করে কাটাল ওরা। খানিক পর পরই বাংরুমের লাগোয়া ঝোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকাল ম্যাকআরথারের বাড়ির দিকে। জিনা এসে জানাল একবার, শটগান হাতে গুহা পাহারা দিচ্ছে ম্যাকআরথার। তার হারামী কুত্তাটা দর্শক তাড়াতে তাড়াতে এতই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, ঘেউ ঘেউ করারও আর শক্তি নেই। লম্বা হয়ে মাটিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
রাতে সকাল সকাল খেয়ে বাংরুমে এসে ঢুকল ছেলেরা। ম্যাকআরবারের জানালায় আলো দেখতে পেল। কিন্তু ওরা বিছানায় ওঠার আগেই নিভে গেল আলো। একটু পরে মিসেস ফিলটারের বাড়ির আনোও নিভে গেল।
সবাই যেন আজ বেশি ক্লান্ত, বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে বলল মুসা। আমিও। কিন্তু কেন বুঝতে পারছি না।
উত্তেজনা, ব্যাখ্যা করল রবিন। প্রচণ্ড উত্তেজনায় দ্রুত ক্ষয় হয় শরীর, কাহিল হয়ে পড়ে। এখানকার সবার বেলায়ই তো আজ এই ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া কোন কারণে হঠাৎ বেশি চমকে গেলেও পরে অবসাদ আসে শরীরে। কাল খনিতে যা দেখলাম, ভয়ানক দৃশ্য। বড় কষ্ট পেয়ে মরেছে বেচারা।
কিন্তু কি করছিল সে ওখানে? সারা দিন নিজেকে অনেকবার প্রশ্নটা করেছে কিশোর। লর্ডসবুর্গে হয়তো কোন জবাব মিলবে।
জুয়েলারকে পাথর দেখাতে সত্যি যাচ্ছ? রবিন জিজ্ঞেস করল।
ক্ষতি কি? এটা একটা ভাল ছুতো, আংকেলের কাছ থেকে সরে যাওয়ার। যদি ঘুণাক্ষরেও টের পেয়ে যান, খনি-রহস্যের তদন্ত করছি আমরা, মুহূর্তের জন্যে কাছছাড়া করবেন না আর।
জিনা কিন্তু হিলারিকে নিয়ে মোটেও ভাবছে না। তার একটাই লক্ষ্য, ম্যাকআরথারকে ভণ্ড প্রমাণ করা।
কিন্তু লাশটাকে কেন আগে দেখল না ম্যাকআরথার? প্রশ্নটা খালি খোচাচ্ছে। আমাকে। নিজের খনি একটু ঘুরে দেখার কৌতুহলও হলো না?
নানারকম প্রশ্ন মনে নিয়ে একে একে ঘুমিয়ে পড়ল তিনজনেই।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল মুসার। অন্ধকারেই ভ্রুকুটি করে কান পাতল। কিছু একটা নড়ছে বাইরে, জানালার নিচে কোথাও। আরেকবার শোনা গেল, শব্দটা, মচমচ, ক্যাঁচকোচ। কনুয়ের ওপর ভর রেখে উঠল সে।
