পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল আমার। তখন ড্রাভট অবশ্য ঘুমে অচেতন। দেখি গ্রামের প্রায় সব প্রীস্ট এসে হাজির হয়েছে, গ্রাম প্রধানরাও রয়েছে সঙ্গে, ফিসফিস করে কী যেন বলছিল তারা, আমাকে আড়চোখে লক্ষ করল।
কী হয়েছে, ফিশ? বাশকাই গ্রাম প্রধানকে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
ঠিক বলতে পারব না।, জবাব দিল বিলি ফিশ। তবে রাজাকে এই পাগলামী ছাড়তে বলুন। না হলে ঘোর বিপদে পড়তে পারেন তিনি। ভাবগতিক তেমন সুবিধের ঠেকছে না আমার কাছে। অবশ্য জনা বিশেক লোক নিয়ে এসেছি সাথে। ওরা আমার কথা শুনবে। কিন্তু অন্যদের কথা বলতে পারছি না। তাদের মধ্যে বিক্ষোভের আলামত পাচ্ছি। ঝড় শেষ হবার সাথে-সাথে আমরা বাশকাই ফিরে যাব।
রাতের বেলা তুষার ঝড় হয়েছে। এখানে জোর বাতাস বইছে। গোটা প্রকৃতি ঢেকে গেছে সাদা বরফে। আকাশে ভারী মেঘের আনাগোনা। দেখলাম ড্রাভট বেরিয়ে এল তার ঘর থেকে, মাথায় সোনার মুকুট, টলছে সে, হাত দোলাতে-দোলাতে এগিয়ে এল আমার কাছে।
শেষ বারের মতো বলছি তোমাকে, ড্যান, ফিসফিস করে করলাম আমি, এসব ছাড়ান দাও। বিলি ফিশ বলছে ঝামেলা হতে পারে।
আমার লোক ঝামেলা করবে? তাচ্ছিল্য প্রকাশ পেল ড্রাভটের কণ্ঠে প্রশ্নই ওঠে না। তুমি তো মস্ত বোকা, পিচি। বিয়ে করার এমন সুযোগ পেয়েও হারালে। যাকগে, মেয়েটা কোথায়? সব প্রীস্ট আর মোড়লদের নিয়ে এসো, সম্রাট নিজের চোখে দেখতে চায় কনেকে তার সাথে মানাবে কি না।
অবশ্য কাউকে ডেকে পাঠানোর দরকার ছিল না। সবাই এসেছে এবং পাইনের বনের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় যে যার বন্দুক এবং বর্শার ওপর। ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। একদল প্রীস্ট গিয়েছিল মন্দির থেকে মেয়েটিকে নিয়ে আসতে।
বিলি ফিশ তার কুড়ি জন সশস্ত্র মানুষ নিয়ে রাজার পেছনে এসে দাঁড়াল। আমি দাঁড়ালাম ড্রাভটের পাশে। আমার পেছনেও বিশ জনের সশস্ত্র একটা দল। ওরা রুপোর গহনা আর মূল্যবান রত্ন পরা একটি মেয়েকে নিয়ে এল। মেয়েটি সুন্দরী, কিন্তু ভয়ে সাদা হয়ে আছে মুখ। সে বারবার পেছন ফিরে প্রীস্টদের দিকে তাকাচ্ছিল।
একে দিয়েই চলবে, মেয়েটার আপাদমস্তক দেখে বলল ড্যান। আমাকে এত ভয় কিসের সুন্দরী? এসো, চুমু খাও। সে মেয়েটির গলা জড়িয়ে ধরল। মেয়েটি সভয়ে চোখ বন্ধ করল, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল অস্ফুট গোঙানি, ড্যানের মস্ত লাল দাড়ির আড়ালে তার মুখখানা হারিয়ে গেল।
শালী আমাকে কামড়ে দিয়েছে। আর্তনাদ করে উঠল ড্যান, ঘাড়ের কাছে হাত বোলাতে লাগল। সত্যি তাই। তার হাত রক্তে লাল হয়ে গেছে। দৃশ্যটা দেখামাত্র বিদ্যুৎ খেলে গেল বিলি ফিশের শরীরে। সে ড্যানকে কাঁধে করে একটানে নিয়ে এল নিজের দলের মাঝখানে।
এদিকে ভয়াবহ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে প্রীস্টদের মধ্যে। ক্রুদ্ধ গলায় গর্জন ছাড়ল তারা। দেবতা বা শয়তান নয়, ওরা আমাদের মতোই মানুষ। হতভম্ব হয়ে গেলাম দেখে এক প্রীস্ট হাতের বর্শা নিয়ে যুদ্ধংদেহি ভঙ্গিতে ছুটে আসছে আমার দিকে। তারপর যা শুরু হলো সে ভয়াবহতার বর্ণনা দেবার সাধ্য আমার নেই।
আক্ষরিক অর্থেই জায়গাটা রণক্ষেত্র হয়ে উঠল। আমরা দেবতা নই, স্রেফ ওদের মতো মানুষ, কারণ আমাদেরও গা থেকে ওদের মতো রক্ত ঝরে, এ ব্যাপারটা উপলব্ধি করার পরে সমস্ত প্রীস্ট, গ্রাম প্রধান এবং শতশত গ্রামবাসী যেন উন্মাদ হয়ে উঠল। আমাদের সাথে রইল শুধু বিলি ফিশ এবং তার দল। আমাদের বন্দুক ওদের চেয়ে উন্নত মানের হলেও অতগুলো হিংস্র মানুষের সাথে পেরে ওঠা মুখের কথা নাকি?
পেছনে বেশ কিছু হতাহত মানুষ ফেলে বিলি ফিশের পরামর্শমতো আমাদের রণেভঙ্গ দিতেই হলো। ড্যান অবশ্য আসতে চাইছিল না। ক্রোধে সে-ও উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু অসম এই যুদ্ধে পেরে উঠব না জেনে ওকে জোর করে আমাদের সঙ্গে নিয়ে চললাম।
কিন্তু ওরা আমাদের পিছু ছাড়ল না। প্রীস্টরা বড়-বড় পাথর গড়িয়ে দিল আমাদের দিকে। আমাদের সৈন্যবাহিনীও প্রাণপণে যুদ্ধ করল। কিন্তু ওরা সংখ্যায় কয়েক শ আর আমরা অল্প কয়েকজন। কোনো মতে ওদের কবল থেকে রক্ষা পেয়ে উপত্যকার নিচে এসে দেখি আমরা মাত্র ন জন বেঁচে আছি। আমি, ড্যান, বিলি ফিশ এবং জনা ছয় সৈনিক।
বিলি ফিশ বলল, আমাদের নিয়ে তার গ্রাম বাশকাইতে যাবে। ওরা সবগুলো গ্রামে খবর পাঠাবে, কিন্তু এখানে তা সম্ভব নয়।
ড্যানের বোধহয় মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সে উন্মাদের মতো আচরণ করছিল। একবার আমাকে খুব বকাঝকা করল। বলল, এ সব কিছু নাকি আমার দোষেই হয়েছে। আমার মাথায় বুদ্ধি নেই তাই রাজার বিরুদ্ধে ওদের ষড়যন্ত্র টের পাইনি, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি প্রত্যুত্তরে কিছু বললাম না। জানি বললে আরো উত্তেজিত হয়ে উঠবে সে। অনেকক্ষণ গজগজ করে শেষে ড্যান বলল, একবার বাশকাই গিয়ে পৌঁছি। তারপর ফিরে এসে সবগুলো বিদ্রোহীর ঝাড়ে-বংশে উৎখাত করে ছাড়ব।
আমরা সারা দিন আর সারা রাত হাঁটলাম। ড্যান বরফের ওপর দিকে হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেল বারবার, অভ্যাস মতো নিজের লাল দাড়ি চিবুতে লাগল আর বিড়বিড় করে সারাক্ষণ কি যেন বকে চলল।
রক্ষা পাবার কোনো উপায় আমাদের নেই, এক সময় হতাশ গলায় বলল বিলি ফিশ, ধর্মগুরুরা এতক্ষণে নিশ্চয়ই গ্রামে খবর পাঠিয়ে দিয়েছে আপনারা দেবতা নন, মানুষ। আপনারা আর কটা দিন কেন দেবতা হয়ে থাকতে পারলেন না? এখন ধরা পড়লে আপনারা তো মরবেনই, আমিও শেষ! বলে বরফের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে, তার দেবতার কাছে প্রার্থনা করতে লাগল।
