আমি যোগেনের জন্য অত্যন্ত দুঃখিত। আমার মনে হয় না যে, কলিকাতা তার পক্ষে অনুকূল। ঠাণ্ডা আবহাওয়াতে হজমের অপূর্ব উপকার হয়।
এবার আসি। আর তোমাদের বিরক্ত করব না; তোমাদের সকলের সর্বপ্রকার কল্যাণ হোক! আমি অতি আনন্দিত যে, কখনও তোমাদের কাজে লেগেছি—অবশ্য তোমরাও যদি তাই মনে কর। অন্ততঃ গুরুমহারাজ আমার উপর যে কর্তব্য অর্পণ করেছিলেন, তা সম্পন্ন করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি—এইভাবে আমি আত্মপ্রসাদ লাভ করছি; ঐ কাজ সুসম্পন্ন হোক আর নাই হোক, আমি চেষ্টা করেছি জেনেই খুশী আছি। সুতরাং তোমাদের নিকট বিদায়! তোমাদের যথেষ্ট শক্তি আছে; আর আমার পক্ষে যতটা হওয়া সম্ভব, তোমরা তার চেয়েও উঁচু; সুতরাং তোমরা নিজেদের পথে চল। ‘সা—’কে বলবে যে, আমি তার উপর মোটেই রাগ করিনি—তবে আমি দুঃখিত, খুব দুঃখিত হয়েছি। এটা টাকার জন্য নয়—টাকাতে আর কি যায় আসে! কিন্তু সে একটা নীতি লঙ্ঘন করেছে এবং আমার উপর ধাপ্পাবাজি করেছে বলেই আমি ব্যথিত হয়েছি। তার কাছে বিদায় নিচ্ছি, আর তোমাদেরও সকলের কাছে। আমার জীবনের একটা পরিচ্ছেদ শেষ হয়ে গেল। অপরেরা তাদের পালা অনুযায়ী আসুক—তারা আমায় প্রস্তুত দেখতে পাবে। তুমি আমার জন্য মোটেই ব্যস্ত হয়ো না। আমি কোন দেশের কোন মানুষের তোয়াক্কা রাখি না। সুতরাং বিদায়। ঠাকুর তোমাদিগকে চিরকাল আশীর্বাদ করুন! ইতি
তোমাদের
বিবেকানন্দ
২৪৪*
[মিঃ স্টার্ডিকে লিখিত]
নিউ ইয়র্ক
ডিসেম্বর, ১৮৯৫
এখানকার কাজ চমৎকার চলিতেছে। এখানে আসার পর হইতেই আমি দৈনিক দুইটি ক্লাসের জন্য অবিরাম খাটিতেছি। আগামীকাল হইতে এক সপ্তাহের অবকাশ লইয়া মিঃ লেগেটের সহিত শহরের বাহিরে যাইতেছি। আপনাদের দেশের জনৈকা প্রসিদ্ধা গায়িকা মাদাম স্টার্লিংকে আপনি জানেন কি? তিনি আমার কাজে বিশেষ আগ্রহান্বিতা।
আমি আমার কাজের বৈষয়িক দিকটা সম্পূর্ণভাবে একটি কমিটির হাতে দিয়া ঐ-সমস্ত ঝঞ্ঝাট হইতে মুক্ত হইয়াছি। বৈষয়িক ব্যবস্থাদি করিবার ক্ষমতা আমার নাই—ঐ-জাতীয় কাজ আমাকে যেন শতধা ভাঙিয়া ফেলে।
নারদসূত্রের কি হইল? আমার বিশ্বাস ঐ বইখানি এখানে প্রচুর বিক্রয় হইবে। আমি এখন ‘যোগসূত্র’ ধরিয়াছি এবং এক একটি সূত্র লইয়া উহার সহিত সকল ভাষ্যকারের মত আলোচনা করিতেছি। এই সমস্তই লিখিয়া রাখিতেছি এবং এই লেখার কাজ শেষ হইলে উহাই ইংরেজীতে পতঞ্জলির পূর্ণাঙ্গ সঠিক অনুবাদ হইবে। অবশ্য গ্রন্থখানি অনেকটা বড় হইয়া যাইবে।
আমার বোধ হয় ট্রুব্নারের দোকানে ‘কূর্মপুরাণের’ একটি সংস্করণ আছে। ভাষ্যকার বিজ্ঞানভিক্ষু পুনঃ পুনঃ ঐ গ্রন্থের বচন উদ্ধৃত করিয়াছেন। আমি গ্রন্থখানি নিজে কখনও দেখি নাই। আপনি কি একবার একটু সময় করিয়া দেখিয়া আসিতে পারেন যে, ঐ গ্রন্থে যোগ সম্বন্ধে গোটা কয়েক পরিচ্ছেদ আছে কিনা? যদি থাকে তবে দয়া করিয়া আমায় একখানি বই পাঠাইয়া দিবেন কি? ‘হঠযোগপ্রদীপিকা’, ‘শিবসংহিতা’ এবং যোগের উপর অন্য কোন গ্রন্থ থাকিলে তাহাও একখানি করিয়া চাই। অবশ্য মূল গ্রন্থগুলিই আবশ্যক। পুস্তকগুলি আসিলেই আমি আপনাকে মূল্য পাঠাইয়া দিব। জন ডেভিসের সম্পাদিত ঈশ্বরকৃষ্ণের ‘সংখ্যাকারিকা’ও একখানি পাঠাইবেন।
এইমাত্র ভারতীয় চিঠিগুলির সহিত আপনার চিঠিও পাইলাম। আসিবার জন্য যে প্রস্তুত, সে অসুস্থ। অন্যেরা বলে যে, তাহারা মুহূর্তের আহ্বানে আসিতে পারে না। এই পর্যন্ত সবই দুরদৃষ্ট মনে হয়। তাহারা না আসিতে পারায় আমি দুঃখিত। কি আর করিব? ভারতে সবই মন্থরগতি।
‘বদ্ধ আত্মায় বা জীবে তাঁহার পূর্ণত্ব অব্যক্ত বা সূক্ষ্মভাবে বিরাজিত; আর যখনই সেই পূর্ণত্বের বিকাশ সাধিত হয়, তখনই জীব মুক্ত হয়’—ইহাই রামানুজের মত। কিন্তু অদ্বৈতবাদী বলেন, ব্যক্ত বা অব্যক্ত কোনটাই প্রকৃত অবস্থা নহে, ঐরূপ প্রতীত হয় মাত্র। উভয় প্রণালীই মায়া—পরিদৃশ্যমান অবস্থা মাত্র।
প্রথমতঃ আত্মা স্বভাবতঃ জ্ঞাতা নহেন। ‘সচ্চিদানন্দ’ সংজ্ঞায় তাঁহাকে আংশিকভাবেই প্রকাশ করা হয় মাত্র, ‘নেতি নেতি’ সংজ্ঞাই তাঁহার স্বরূপ যথাযথ বর্ণনা করে। শোপেনহাওয়ার তাঁহার ‘ইচ্ছাবাদ’ বৌদ্ধদিগের নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছেন। বাসনা, তৃষ্ণা বা তঞ্হা (পালি) প্রভৃতি শব্দেও ঐ ভাবটিই প্রকাশিত হইয়াছে। আমরাও ইহা স্বীকার করি যে, বাসনাই সর্ববিধ অভিব্যক্তির কারণ এবং ইহাই কার্যরূপে পরিণত হয়। কিন্তু যাহাই ‘হেতু’ বা ‘কারণ’, তাহাই সেই (সগুণ) ব্রহ্ম এবং মায়া—এই দুইয়ের সংমিশ্রণে উদ্ভূত। এমন কি ‘জ্ঞান’ও একটি যৌগিক পদার্থ বলিয়া অদ্বৈতবস্তু হইতে একটু স্বতন্ত্র। তবে জ্ঞাত বা অজ্ঞাত সর্বপ্রকার বাসনা হইতেই উহা নিঃসংশয়ে শ্রেষ্ঠ এবং অদ্বিতীয়ের নিকটতম বস্তু। সেই অদ্বৈত-তত্ত্ব প্রথমে জ্ঞান এবং তারপর ইচ্ছার সমষ্টিরূপে প্রতিভাত হন।
উদ্ভিদমাত্রই ‘অচেতন’ অথবা বড়জোর ‘চৈতন্য-বিবর্জিত ক্রিয়াশক্তি মাত্র’ বলিয়া যদি আপত্তি উত্থাপিত হয়, তবে উত্তরে বলা যাইতে পারে যে, এই অচেতন উদ্ভিদশক্তিও সেই বিরাট বিশ্বব্যাপী বুদ্ধিশক্তি, যাহাকে সাংখ্যকার ‘মহৎ’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন—সেই এক চেতন ইচ্ছারই অভিব্যক্তি।
বস্তু জগতের সব কিছুই সেই ‘এষণা’ বা ‘সঙ্কল্প’রূপ আদি বস্তু হইতে উদ্ভূত—বৌদ্ধদিগের এই মতবাদ অসম্পূর্ণ; কারণ প্রথমতঃ ‘ইচ্ছা’ একটি যৌগিক পদার্থ এবং দ্বিতীয়ঃ জ্ঞান বা চেতনারূপ যে প্রাথমিক যৌগিক পদার্থ, উহা ইচ্ছারও পূর্বে বিরাজ করে। জ্ঞানই ক্রিয়াতে পরিণত হয়। প্রথমে ক্রিয়া, তারপর প্রতিক্রিয়া। মন প্রথমে অনুভব করে এবং তৎপর প্রতিক্রিয়ারূপে উহাতে সঙ্কল্পের উদয় হয়। মনেই সঙ্কল্পের স্থিতি, সুতরাং সঙ্কল্পকে মূল বস্তু বলা ভুল।
