ডয়সন্ ডারুইন-মতাবলম্বিগণের হাতে ক্রীড়াপুত্তলিকা মাত্র। বস্তুতঃ ক্রমবিকাশবাদকে উচ্চতর পদার্থবিজ্ঞানের সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। ‘ব্যক্ত’ এবং ‘অব্যক্ত’ ভাব যে পরস্পরকে নিত্য অনুবর্তন করিয়া থাকে—এ তত্ত্ব পদার্থবিজ্ঞানই প্রমাণ করিতে পারে। কাজেই ‘বাসনা’ বা ‘সঙ্কল্পের’ যে অভিব্যক্তি, তাহার পূর্বাবস্থায় ‘মহৎ’ বা ‘বিশ্বচেতনা’ গুপ্ত অথবা সূক্ষ্মভাবে বিরাজ করে। জ্ঞান ভিন্ন সঙ্কল্প অসম্ভব। কারণ আকাঙ্ক্ষিত বস্তু সম্বন্ধে যদি কোন জ্ঞান না থাকে, তবে আকাঙ্ক্ষার উদয় হইবে কিরূপে?
| বিশ্ব-চেতনা বা মহৎ (Universal Consciousness) | ||
|---|---|---|
| | অবচেতন (Sub-conscious) | |
| সজ্ঞান (Conscious) | |
| অতিচেতন (Superconscious) | |
| চৈতন্য-বিবর্জিত সঙ্কল্প বা ক্রিয়া (Unconsious Will) |
যথার্থ সজ্ঞান সঙ্কল্প (Conscious Will Proper) |
অতীন্দ্রিয় জ্ঞান সঙ্কল্প (Superconscious Will) |
এ তত্ত্ব আপাতদৃষ্টিতে যতটা দুর্বোধ্য বলিয়া মনে হয়, জ্ঞানকে ‘চেতন’ ও ‘অবচেতন’ এই দুই অবস্থায় বিভক্ত করিলে ঐ দুর্বোধ্যতা অন্তর্হিত হয়। এবং তাহা না হইবার বা হেতু কি? যদি ‘সঙ্কল্প’ বস্তুটিকেই আমরা ঐরূপে বিশ্লেষণ করিয়া দেখিতে পারি, তবে উহার জনক বস্তুটিকেই বা বিশ্লেষণ করা যাইবে না কেন?
বিবেকানন্দ
১৪. পত্রাবলী ২৪৫-২৫৪
২৪৫*
[মিস ফার্মারকে লিখিত]
নিউ ইয়র্ক
২৯ ডিসেম্বর, ১৮৯৫
প্রিয় ভগিনী,
এই জগৎ—যেখানে কিছুই নষ্ট হয় না, যেখানে আমরা জীবনেই মৃত্যুর মধ্যে বাস করি, সেখানে প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে, জনাকীর্ণ নগরীর পথে বা আদিম যুগের নিবিড় নিভৃত অরণ্যে, যা-কিছু চিন্তা করা হয়েছে, তা-ই থেকে যায়। তারা ক্রমাগত রূপপরিগ্রহ করবার চেষ্টা করছে, এবং যতদিন না প্রকাশ পাচ্ছে, ততদিন অভিব্যক্ত হবার জন্য চেষ্টা করবেই এবং তাদের যতই চাপবার চেষ্টা করা হোক না কেন, তারা কিছুতেই নষ্ট হবে না। কিছুরই বিনাশ নাই—যে-সকল চিন্তা অতীতে অনিষ্টসাধন করেছিল, তারাও রূপপরিগ্রহের চেষ্টা করছে, তারাও পুনঃ পুনঃ প্রকাশের দ্বারা শুদ্ধ হয়ে অবশেষে সম্পূর্ণ সৎ চিন্তায় রূপায়িত হবার চেষ্টা করছে।
সুতরাং বর্তমান কালেও এমন কতকগুলি ভাবরাশি বিদ্যমান, যেগুলি আত্মপ্রকাশে সচেষ্ট। এই অভিনব ভাবরাশি আমাদের বলছে যে, আমাদের অন্তরে যে দ্বৈতবাদের কল্পনা আছে, কোন বস্তু স্বরূপতঃ ভাল বা মন্দ এবংবিধ যে কল্পনা আছে ও তাদের দাবানর জন্য যে ততোধিক উৎকট বৃথা আশা রয়েছে—এ সমস্তকেই পরিহার করতে হবে। ঐ ভাবরাশি আমাদের শেখাচ্ছে, জগতে উন্নতির রহস্য প্রবৃত্তির উচ্ছেদ নহে, পরন্তু উচ্চতর দিকে তার মোড় ফিরিয়ে দেওয়া। ঐ ভাবরাশি শেখাচ্ছে, এই জগৎ ভাল ও মন্দ দিয়ে প্রস্তুত নয়; প্রত্যুত এর উপাদান হচ্ছে ভাল, তার চেয়ে ভাল এবং তার চেয়ে আরও ভাল। সকলে গ্রহণ না করা পর্যন্ত ঐ ভাব শান্ত হয় না। ঐ ভাব শিক্ষা দেয় যে, কোন অবস্থাতেই একেবারে হাল ছেড়ে দেবার দরকার নেই; সুতরাং যে-কোন মনোবৃত্তি, নীতি বা ধর্মকে ঐ ভাব যে-অবস্থায় পায়, সে-অবস্থাতেই সাদরে গ্রহণ করে, এবং সেগুলির উপর বিন্দুমাত্র দোষারোপ না করে বলে, ‘এ পর্যন্ত ভালই করেছ, এখন আরও ভাল করার সময় এসেছে।’ প্রাচীন- কালে চিন্তা করা হত—মন্দকে বর্জন করতে হবে, এই নতুন শিক্ষানুসারে বলা হয়, মন্দ রূপান্তরিত হবে—ভাল থেকে আরও ভাল করবার চেষ্টা করতে হবে। সর্বোপরি এই ভাব শিক্ষা দেয়, যদি পাবার আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে দেখবে যে, স্বর্গরাজ্য আগে থেকেই বিদ্যমান; মানুষের যদি দেখবার সাধ থাকে, তবে সে দেখবে, সে পূর্ব থেকেই পূর্ণ।
বিগত গ্রীষ্মঋতুতে গ্রীনএকারে যে সভাগুলি হয়েছিল, সেগুলি যে এত চমৎকার হয়েছে, তার একমাত্র কারণ, তুমি পূর্বোক্ত ভাবপ্রকাশের উপযুক্ত যন্ত্রস্বরূপ হয়ে অন্তরে ঐ ভাব যাতে অবাধে প্রবেশ করে, তার জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রেখেছিলে, স্বর্গরাজ্য যে পূর্ব থেকেই বিদ্যমান—নতুন চিন্তাপ্রণালীর এই সর্বোচ্চ শিক্ষারূপ ভিত্তির উপর তুমি দণ্ডায়মান ছিলে।
তুমি এই ভাব জীবনে পরিণত করে দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখাবার উপযুক্ত আধাররূপে প্রভু কর্তৃক মনোনীত ও আদিষ্ট হয়েছ, এবং যে তোমাকে এই অদ্ভুত কার্যে সহায়তা করবে, সে প্রভুরই সেবা করবে।
আমাদের শাস্ত্রে আছে—‘মদ্ভক্তানাঞ্চ যে ভক্তাস্তে মে ভক্ততমা মতাঃ।’ অর্থাৎ যারা আমার ভক্তগণের ভক্ত, তারা আমার শ্রেষ্ঠ ভক্ত। তুমি প্রভুর সেবিকা; সুতরাং আমি যেখানেই থাকি না কেন, ভগবৎপ্রেরণায় তুমি যে মহোচ্চ ব্রতে দীক্ষিত হয়েছ, তার উদ্যাপনে যে-কোন প্রকারে সহায়তা করতে পারি, শ্রীকৃষ্ণের অনুগামী আমি তৎসাধনে নিজেকে কৃতার্থ জ্ঞান করব ও তা সাক্ষাৎ প্রভুরই সেবা বলে মনে করব। ইতি
তোমার চিরস্নেহাবদ্ধ ভ্রাতা
বিবেকানন্দ
২৪৬*
[মিঃ স্টার্ডিকে লিখিত]
রিজলী ম্যানর
২৯ ডিসেম্বর, ১৮৯৫
প্রিয় বন্ধু,
বক্তৃতার নকলগুলি ইতোমধ্যে নিশ্চয়ই আপনার কাছে গিয়ে পৌঁছেছে। আশা করি সেগুলি কোন কাজে আসতে পারে।
আমার মনে হয়, প্রথমতঃ অনেক অসুবিধা অতিক্রম করতে হবে; দ্বিতীয়তঃ তারা নিজেদের কোন কাজেরই উপযুক্ত মনে করে না—এই হল ও-দেশের জাতীয় ব্যাধি; তৃতীয়তঃ তারা এখনই শীতের সম্মুখীন হতে সাহস করছে না; তিব্বতের লোকটিকে ইংলণ্ডে কাজ করার মত খুব শক্তসমর্থ বলে তারা মনে করে না। শীঘ্রই হোক আর বিলম্বেই হোক, কেউ না কেউ আসবে।
