সতত স্নেহাশীর্বাদক
বিবেকানন্দ
২৪২*
228, West 39th St. নিউ ইয়র্ক
২০ ডিসেম্বর, ১৮৯৫
প্রিয় আলাসিঙ্গা,
এই সঙ্গে ‘ভক্তিযোগে’র কপি কতকটা পূর্ব থেকেই পাঠাচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে ‘কর্ম’ সম্বন্ধেও একটা বক্তৃতা পাঠালাম। এরা এখন একজন সঙ্কেতলিপিকর নিযুক্ত করেছে এবং আমি ক্লাসে যা কিছু বলি, সে সেগুলি টুকে নেয়। সুতরাং এখন তুমি কাগজের জন্য যথেষ্ট মাল পাবে। এগিয়ে চল। স্টার্ডি পরে আরও লিখবে। ইংলণ্ডে এরা নিজেদের একটা কাগজ বের করবে মনে করছে, ‘ব্রহ্মবাদিনে’র জন্য তাই বেশী কিছু করতে পারিনি। কাগজটার বাইরে একটা মানানসই মলাট না দেবার মানেটা কি বল দেখি? এখন কাগজটার ওপর তোমাদের সমুদয় শক্তি প্রয়োগ কর; কাগজটা দাঁড়িয়ে যাক—আমি এটা দেখতে দৃঢ়সঙ্কল্প। ধৈর্য ধরে থাক এবং মৃত্যু পর্যন্ত বিশ্বস্ত হয়ে থাক। নিজেদের মধ্যে বিবাদ করো না। টাকা-কড়ির লেন-দেন বিষযে সম্পূর্ণ খাঁটি হও। তাড়াহুড়ো করে টাকা রোজগারের চেষ্টা করো না—ও-সব ক্রমে হবে। আমরা এখনও বড় বড় কাজ করব, জেনো। প্রতি সপ্তাহে এখান থেকে কাজের একটা রিপোর্ট পাঠান হবে। যতদিন তোমাদের বিশ্বাস, সাধুতা ও নিষ্ঠা থাকবে, ততদিন সব বিষয়ে উন্নতিই হবে। আগামী ডাকে কাগজটা সম্বন্ধে সব কথা আমায় লিখবে।
বৈদিক সূক্তগুলির অনুবাদের সময় ভাষ্যকারদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি রেখো; প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের কথায় এতটুকু মনোযোগ দিও না। ওরা আমাদের শাস্ত্রগুলি সম্বন্ধে কিছুই বোঝে না। নীরস ভাষাতত্ত্ববিদেরা ধর্ম বা দর্শন বুঝতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, ঋগ্বেদের ‘আনীদবাতম্’ শব্দটির অনুবাদ করা হয়েছে—‘তিনি নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস না নিয়ে বাঁচতে লাগলেন।’ প্রকৃতপক্ষে এখানে মুখ্য প্রাণ সম্বন্ধেই বলা হয়েছে এবং ‘অবাতম্’ শব্দের প্রকৃতিগত অর্থ—অবিচলিতভাবে অর্থাৎ অস্পন্দভাবে। কল্পারম্ভের পূর্বে প্রাণ অর্থাৎ সর্বব্যাপিনী জাগতিক শক্তি যে অবস্থায় থাকে, তারই বর্ণনা দেওয়া হয়েছে (ভাষ্যকারগণ দ্রষ্টব্য)। আমাদের ঋষিদের ভাবানুযায়ী ব্যাখ্যা কর, তথাকথিত পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের মতানুসারে নয়। তারা কি জানে?
‘ভক্তিযোগ’ সম্বন্ধে লেখাগুলো অনেকটা প্রণালীবদ্ধ আকারে আছে; কিন্তু ক্লাসে যে-সব বলা হয়েছে, সেগুলি অমনি এলোপাতাড়ি—সুতরাং সেগুলি একটু দেখে-শুনে ছাপাতে হবে। তবে আমার ভাবগুলির ওপর বেশী কলম চালিও না। সাহসী ও নির্ভীক হও—তা হলেই রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। ‘ভক্তিযোগ’টা বহুদিন ধরে তোমাদের কাগজের খোরাক যোগাবে। তারপর ওটা গ্রন্থাকারে ছাপিও। ভারত, আমেরিকা ও ইংলণ্ডে বইটি খুব বিক্রী হবে। মনে রেখো, থিওসফিষ্টদের সঙ্গে যেন কোন প্রকার সম্বন্ধ না রাখা হয়। তোমরা যদি সকলে আমাকে ত্যাগ না কর, আমার পশ্চাতে ঠিক খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পার এবং ধৈর্য না হারাও, তবে আমি তোমাদের নিশ্চয় করে বলতে পারি, আমরা আরও খুব বড় বড় কাজ করতে পারব! হে বৎস, ইংলণ্ডে ধীরে ধীরে খুব বড় কাজ হবে। আমি বুঝতে পারছি, তুমি মাঝে মাঝে নিরুৎসাহ হয়ে পড়; মনে রেখো, ইতিহাসের এই একমাত্র সাক্ষ্য যে, গুরুভক্ত জগৎ জয় করবে। আমি জি.জি.-র চিঠি পেয়ে ভারি খুশী হয়েছি। বিশ্বাসই মানুষকে সিংহতুল্য বীর্যবান্ করে। তুমি সর্বদা মনে রেখো, আমাকে কত কাজ করতে হয়। কখনও কখনও দিনে দু-তিনটা বক্তৃতা দিতে হয়। এইভাবে সর্বপ্রকার প্রতিকূলতা কাটিয়ে পথ করে নিচ্ছি—কঠিন কাজ! আমার চেয়ে নরম প্রকৃতির লোক হলে এতেই মরে যেত। স্টার্ডির প্রবন্ধটা ছাপিয়েছ কি? মিঃ কৃষ্ণমেনন আমাকে বরাবর বলে এসেছে—সে লিখবে; কিন্তু আমার আশঙ্কা হচ্ছে, সে এখনও কিছু লেখেনি। ইংলণ্ডে সে দুরবস্থায় পড়েছে। আমি তাকে ৮ পাউণ্ড দিয়ে সাহায্য করেছি; এর বেশী কিছু করবার ক্ষমতা আমার ছিল না। আমি বুঝতে পারছি না, সে দেশে ফিরছে না কেন। তার কাছ থেকে কিছু আশা করো না। বিশ্বাস ও দৃঢ়তার সহিত লেগে থাক। সত্যনিষ্ঠ, সাধু ও পবিত্র হও, আর নিজেদের ভেতর বিবাদ করো না। ঈর্ষাই আমাদের জাতির ধ্বংসের কারণ।
ডাক চলে যাচ্ছে—তাড়াতাড়ি চিঠিখানা শেষ করতে হচ্ছে। তোমাকে ও আমাদের সকল বন্ধুবান্ধবকে ভালবাসা জানাচ্ছি। ইতি
বিবেকানন্দ
২৪৩*
[স্বামী সারদানন্দকে লিখিত]
228, W. 39th St. নিউ ইয়র্ক
২৩ ডিসেম্বর, ১৮৯৫
প্রিয় শরৎ,
তোমার পত্রপাঠে আমি অত্যন্ত দুঃখিতই হয়েছি। দেখছি, তুমি একেবারে নিরুৎসাহ হয়ে পড়েছ। আমি তোমাদের সকলকে—তোমাদের ক্ষমতা ও অক্ষমতাকে জানি। তুমি কোন কাজে অপারগ হলে সেই কাজের জন্য তোমায় ডাকতুম না, তোমাকে শুধু সংস্কৃতের প্রাথমিক বিষয়গুলি শেখাতে বলতুম এবং অভিধান প্রভৃতির সাহায্যে অনুবাদ ও অধ্যাপনার কাজে স্টার্ডির সহায়তা করতে বলতুম। তোমাকে ঐ কাজের জন্য গড়ে নিতুম। বস্তুতঃ যে-কেহ ঐ কাজ চালাতে পারত—একান্ত প্রয়োজন ছিল সংস্কৃতের শুধু একটু চলনসই জ্ঞানের। যাক, যা হয় সব ভালর জন্যই। এটা যদি ঠাকুরের কাজ হয়, তবে ঠিক জায়গার জন্য ঠিক লোক যথাসময়ে এসে যাবে। তোমাদের কারও নিজেকে উত্ত্যক্ত মনে করার প্রয়োজন নাই। হাইভিউ, কেভার্শ্যাম, রিডিং, ইংলণ্ড—এই ঠিকানায় স্টার্ডির নিকট টাকা পাঠিয়ে দিও।
‘সা—’র বিষয়ে বক্তব্য এইঃ টাকা কে নিচ্ছে বা না নিচ্ছে, আমি তা গ্রাহ্য করি না, কিন্তু বাল্যবিবাহ আমি অত্যন্ত ঘৃণা করি। এজন্য ভয়ানক ভুগেছি, আর এই মহাপাপে আমাদের জাতকে ভুগতে হচ্ছে। অতএব এরূপ পৈশাচিক প্রথাকে যদি আমি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন করি, তবে নিজেই নিজের কাছে ঘৃণ্য হব। আমি তোমাকে এ বিষয়ে স্পষ্টই লিখেছিলাম; … বাল্যবিবাহরূপ এই আসুরিক প্রথার উপর আমাকে যথাশক্তি দৃঢ়ভাবে পদাঘাত করতে হবে, সেজন্য তোমার কোন দোষ হবে না। তোমার ভয় হয় তো তুমি দূর হতে নিজেকে বিপদ থেকে বাঁচাও। আমার সঙ্গে তোমার কোন সম্বন্ধ আছে—এটা অস্বীকার করলেই হল; আর আমিও তা দাবী করার জন্য অতিমাত্রায় আগ্রহান্বিত নই। আমি দুঃখিত—অতি দুঃখিত যে ছোট ছোট মেয়েদের বর যোগাড়ের ব্যাপারে আমি মোটেই নিজেকে জড়াতে পারব না; ভগবান্ আমার সহায় হোন! আমি এতে কোনদিন ছিলাম না এবং কোনদিন থাকবও না। ‘ম—’বাবুর কথা ভাবো দেখি! এর চেয়ে বেশী কাপুরুষ বা পশুপ্রকৃতির লোক কখনও দেখেছ কি? মোদ্দা কথা এই—আমার সাহায্যের জন্য এরূপ লোক চাই, যারা সাহসী, নির্ভীক ও বিপদে অপরাঙ্মুখ। আমি খোকাদের ও ভীরুদের চাই না। প্রত্যুত আমি একাই কাজ করব। একটা ব্রত আমায় উদ্যাপন করতে হবে। আমি একাই তা সম্পন্ন করব। কে আসে বা কে যায়, তাতে আমি ভ্রূক্ষেপ করি না। ‘সা—’ ইতোমধ্যেই সংসারে ডুবেছে, আর তোমাতেও দেখছি তার ছোঁয়াচ লাগছে! সাবধান! এখনও সময় আছে। তোমায় এইটুকু মাত্র উপদেশ দেওয়া আমার কর্তব্য মনে করেছিলাম। অবশ্য এখন তোমরাই মস্ত লোক—আমার কথা তোমাদের কাছে মোটেই বিকোবে না। কিন্তু আমি আশা করি—এমন সময় আসবে, যখন তোমরা আরও স্পষ্ট করে দেখতে পাবে, জানতে পারবে এবং সম্প্রতি যেরূপ ভাবছ তা থেকে অন্যরূপ ভাববে।
