কলিকাতায় বন্ধুদের এদিকে একবিন্দু ক্ষমতা নেই, অথচ হামবড়াইটা খুব আছে—তারা নিজেদের এত বড় মনে করে যে, অপরের পরামর্শ শুনতে একদম নারাজ। এই অদ্ভুত ভদ্রলোকদের নিয়ে যে কি করব তা বুঝি না—তাদের কাছ থেকে বেশী কিছু আশা করি না। তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ হোক। তারা যে বাঙলা বইখানি পাঠিয়েছে, তার জন্য লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হচ্ছে। লেখক হয়তো ভেবেছেন যে, তিনি খোলাখুলিভাবে সত্য লিপিবদ্ধ করে যাচ্ছেন, পরমহংসদেবের ভাষা পর্যন্ত বজায় রাখছেন; কিন্তু তিনি এটা ভাবেননি যে, শ্রীরামকৃষ্ণ মেয়েদের সামনে কখনও এ-রকম ভাষা ব্যবহার করতেন না। এই লেখক আশা করেন, তাঁর বই স্ত্রীপুরুষ সমভাবে পড়বে। প্রভু আহাম্মকদের হাত থেকে আমায় রক্ষা করুন! তারা আবার নিজের খেয়ালে চলে মনে করে, তারা সকলেই তাঁকে সাক্ষাৎ দেখেছে! দূর ছাই এরূপ মস্তিষ্কহীনদের ভেতর দিয়ে যা কিছু বেরোয়, তা ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে। নিজেরা ভিখারী—রাজার মত চালচলন দেখাতে চায়। নিজেরা আহাম্মক, মনে করে—আমরা মস্ত জ্ঞানী! নগণ্য দাস সব, মনে করছে—আমরা প্রভু! এই তো তাদের অবস্থা! কি যে করব, কিছু বুঝতে পারি না। প্রভু আমায় রক্ষা করুন! আমার সব আশা-ভরসা তোমাদের উপর। কাজ করে যাও, কলিকাতার লোকদের মতানুসারে চলো না, কেবল তাদের না চটিয়ে খুশী রেখে যাও এই আশায় যে, তাদের মধ্যে কেউ না কেউ ভাল দাঁড়াতে পারে। কিন্তু স্বাধীনভাবে তোমাদের কাজে অগ্রসর হও। ভাত রান্না হলে অনেকেই পাত পেতে বসে যায়। সাবধান—কাজ করে যাও। সতত আশীর্বাদ জানবে। ইতি
বিবেকানন্দ
০৩. পত্রাবলী ১৩৫-১৪৪
১৩৫*
যুক্তরাষ্ট্র, আমেরিকা
৩০ নভেম্বর, ১৮৯৪
প্রিয় কিডি,
তোমার পত্র পেলাম। তোমার মন যে এদিক ওদিক করছে, তা সব পড়লাম। সুখী হলাম যে, তুমি রামকৃষ্ণকে ত্যাগ করনি। আমি তোমাকে পরামর্শ দিচ্ছি—তাঁর সম্বন্ধে যে-সব অদ্ভুত গল্প প্রকাশিত হয়েছে সেগুলি থেকে আর যে-সব অহাম্মক ওগুলি লিখছে তাদের থেকে তুমি তফাত থাকবে। সেগুলি সত্য বটে, কিন্তু আমি নিশ্চিত বুঝছি, আহাম্মকেরা সব তালগোল পাকিয়ে খিচুড়ি করে ফেলবে। তাঁর কত ভাল ভাল জ্ঞানরাশি শিক্ষা দেবার ছিল! তবে সিদ্ধাইরূপ বাজে জিনিষগুলোর ওপর অত ঝোঁক দাও কেন? অলৌকিক ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করতে পারলেই তো আর ধর্মের সত্যতা প্রমাণিত হয় না—জড়ের দ্বারা তো আর চৈতন্যের প্রমাণ হয় না। ঈশ্বর বা আত্মার অস্তিত্ব বা অমরত্বের সঙ্গে অলৌকিক ক্রিয়ার কি সম্বন্ধ? তুমি ঐ-সব নিয়ে মাথা ঘামিও না, তুমি তোমার ভক্তি নিয়ে থাক আর এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে থাক যে, আমি তোমার সব দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এটা ওটা নিয়ে মনকে চঞ্চল করো না। রামকৃষ্ণকে প্রচার কর। যে পানীয় পান করে তোমার তৃষ্ণা মিটেছে, তা অপরকে পান করতে দাও। তোমার প্রতি আমার আশীর্বাদ—সিদ্ধি তোমার করতলগত হোক। বাজে দার্শনিক চিন্তা নিয়ে মাথা ঘামিও না, অথবা তোমার গোঁড়ামি দ্বারা অপরকেও বিরক্ত করো না। একটা কাজই তোমার পক্ষে যথেষ্ট—রামকৃষ্ণকে প্রচার করা, ভক্তি প্রচার করা। এই কাজের জন্য তোমায় আশীর্বাদ করছি—কাজ করে যাও। এখন প্রভুর নাম প্রচার করগে।
সদা আশীর্বাদক
বিবেকানন্দ
১৩৬*
[ডাঃ নাঞ্জুণ্ড রাওকে লিখিত]
যুক্তরাষ্ট্র, আমেরিকা
৩০ নভেম্বর, ১৮৯৪
প্রেমাস্পদেষু,
তোমার মনোরম পত্রখানি এইমাত্র পেলাম। তুমি যে শ্রীরামকৃষ্ণের মহিমা বুঝতে পেরেছ, তা জেনে আমার বড়ই আনন্দ হল। আরও আনন্দ হল তোমার তীব্র বৈরাগ্যের পরিচয় পেয়ে। এই বৈরাগ্যই তো হল ভগবানলাভের অন্যতম প্রথম সাধন। আমি মান্দ্রাজবাসীর উপর চিরকাল অনেক আশা পোষণ করে এসেছি। এখনও আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মান্দ্রাজ থেকেই আধ্যাত্মিক তরঙ্গ উঠে সমগ্র ভারতকে বন্যায় ভাসিয়ে দেবে। আমি কেবল এই প্রার্থনা করতে পারি যে, তোমার শুভ সঙ্কল্প শীঘ্র সিদ্ধ হোক। তবে বৎস, তোমার উদ্দেশ্যসিদ্ধির পথে বিঘ্নগুলির কথাও আমার বলা উচিত। প্রথমতঃ এটি দেখতে হবে যে, হঠাৎ কিছু করে ফেলা কারও পক্ষে উচিত নয়। দ্বিতীয়তঃ তোমার মা এবং স্ত্রীর জন্যও একটু ভাবা উচিত। অবশ্য তুমি বলতে পার, শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্যেরা সংসার ত্যাগ করবার সময় তাঁদের মা-বাপের মতামতে কি সব সময় চলেছিলেন? আমি জানি, নিশ্চিত জানি যে, বড় বড় কাজ খুব স্বার্থত্যাগ ব্যতীত হতে পারে না। আমি নিশ্চিত জানি, ভারতমাতা তাঁর শ্রেষ্ঠ সন্তানগণের জীবন বলি চান, আর আমার অকপট আশা এই যে, তুমিও তাঁর কৃপায় তাঁদেরই অন্যতম হবার সৌভাগ্য লাভ করবে।
সমগ্র জগতের ইতিহাস আলোচনা করলে দেখতে পাবে, মহাপুরুষগণ চিরকাল বড় বড় স্বার্থত্যাগ করেছেন, আর সাধারণ লোক তার সুফল ভোগ করেছে। তুমি যদি তোমার নিজের মুক্তির জন্য সর্বস্ব ত্যাগ কর, সে আর কি ত্যাগ হল? তুমি কি জগতের কল্যাণের জন্য তোমার নিজের মুক্তিকামনা পর্যন্ত ত্যাগ করতে প্রস্তুত আছ? তুমি স্বয়ং ব্রহ্মস্বরূপ এ কথাটা ভেবে দেখ। আমি তোমাকে উপস্থিত এই পরামর্শ দিই যে, তুমি কিছুদিন ব্রহ্মচারীর জীবন যাপন কর অর্থাৎ কিছুদিনের জন্য স্ত্রীর সংস্রব একেবারে ছেড়ে দিয়ে তোমার পিতার গৃহেই বাস কর—ইহাই ‘কুটীচক’ অবস্থা। জগতের কল্যাণের জন্য তুমি যে মহা স্বার্থত্যাগ করতে যাচ্ছ, তাতে তোমার স্ত্রীকেও সম্মত করবার চেষ্টা কর। আর তোমার যদি জ্বলন্ত বিশ্বাস, সর্বজয়ী প্রেম ও সর্বশক্তির চিত্তশুদ্ধি থাকে, তবে তুমি যে তোমার উদ্দেশ্যসাধনে শীঘ্রই সফলতা লাভ করবে, সে বিষয়ে আমার অণুমাত্র সন্দেহ নেই। দেহ মন প্রাণ অর্পণ করে তুমি শ্রীরামকৃষ্ণদেবের উপদেশ-প্রচারকার্যে লেগে যাও দেখি—কারণ, সাধনার প্রথম সোপান হচ্ছে কর্ম। খুব মনোযোগ দিয়ে সংস্কৃত অধ্যয়ন আর খুব সাধনভজনের অভ্যাস কর। তোমাকে মানব-জাতির একজন শ্রেষ্ঠ আচার্য হতে হবে, আর আমার গুরু মহারাজ বলতেন, ‘নিজেকে মারতে হলে একটি নরুন দিয়ে হয়, কিন্তু অপরকে মারতে গেলে ঢাল তরবারের দরকার।’ তেমনি লোকশিক্ষা দিতে হলে অনেক শাস্ত্র পড়তে হয় ও অনেক তর্ক-যুক্তি করে বোঝাতে হয়, কিন্তু নিজের ধর্মলাভ কেবল একটি কথায় বিশ্বাস করলেই হয়। আর যখন ঠিক সময় হবে, তখন তুমি সমগ্র জগতে গিয়ে তাঁর নাম প্রচার করবার অধিকারী হবে। তোমার সঙ্কল্প অতি শুভ ও পবিত্র, সন্দেহ নাই—ভগবান্ শীঘ্র তোমার সঙ্কল্পসিদ্ধির সহায় হোন, কিন্তু হঠাৎ একটা কিছু করে ফেল না। প্রথমে কর্ম ও সাধন-ভজনের দ্বারা নিজেকে পবিত্র কর।
