গুপ্ত বদমাশি, লুকোন জুয়াচুরি যেন কিছু আমাদের মধ্যে না থাকে; কিছুই লুকাইয়া করা হইবে না। কেহ যেন নিজেকে গুরুর বিশেষ প্রিয়পাত্র মনে করিয়া অভিমানে স্ফীত না হন। এমন কি, আমাদের মধ্যে গুরুও কেহ থাকিবে না; গুরুগিরি চলিবে না। হে বীরহৃদয় বালকগণ, কার্যে অগ্রসর হও। টাকা থাক বা না থাক, মানুষের সহায়তা পাও আর নাই পাও, তোমার তো প্রেম আছে? ভগবান্ তো তোমার সহায় আছেন? অগ্রসর হও, তোমার গতি কেহ রোধ করিতে পারিবে না।
ভারত হইতে প্রকাশিত থিওসফিষ্টদের একখানি কাগজে লিখিতেছে, তাঁহারা আমার সাফল্যের পথ প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছিলেন! বটেই তো!!! নিছক বাজে কথা—থিওসফিষ্টরা আমার পথ প্রস্তুত করিয়া দিয়াছে!
সাবধান! আমাদের মধ্যে যাহাতে কিছুমাত্র অসত্য প্রবেশ না করে। সত্যকে ধরিয়া থাক, আমরা নিশ্চয়ই কৃতকার্য হইব। হইতে পারে বিলম্বে, কিন্তু নিশ্চিত কৃতকার্য হইব, এ সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নাই। কাজ করিয়া যাও। মনে কর, আমি জীবিত নাই। এই মনে করিয়া কাজে লাগ, যেন তোমাদের প্রত্যেকের উপর সমুদয় কাজের ভার। ভাবী পঞ্চাশ শতাব্দী তোমাদের দিকে চাহিয়া আছে। ভারতের ভবিষ্যৎ তোমাদের উপর নির্ভর করিতেছে। কাজ করিয়া যাও।
ইংলণ্ড হইতে অক্ষয়ের একখানি সুন্দর পত্র পাইয়াছি। জানি না, কবে ভারতে যাইতে পারিব। এখানে প্রচারের যেমন সুবিধা, সাহায্যপ্রাপ্তিরও সেইরূপ আশা। ভারতে লোকেরা বড় জোর আমার প্রশংসা করিতে পারে, কিন্তু কেহ একটি পয়সা দিতে রাজী নয়। পাইবেই বা কোথায়? নিজেরা যে ভিক্ষুক! তারপর ভারতবাসীরা বিগত দুই সহস্র বা ততোধিক বর্ষ ধরিয়া লোকহিতকর কার্য করিবার শক্তি হারাইয়া ফেলিয়াছে। জাতি (Nation), সর্বসাধারণ (Public) প্রভৃতি তত্ত্ব সম্বন্ধে তাহারা এই নূতন ভাব পাইতেছে। সুতরাং তাহাদিগের উপর আমার দোষারোপ করিবার কোন প্রয়োজন নাই। পরে আরও বিস্তারিত লিখিতেছি। তোমাদিগকে অনন্তকালের জন্য আশীর্বাদ । ইতি—
বিবেকানন্দ
পুনঃ—ফোনগ্রাফ সম্বন্ধে তোমাদের আর খবর লইবার প্রয়োজন নাই। আমি এইমাত্র খেতড়ি হইতে খবর পাইলাম যে, উহা নিরাপদে তথায় পৌঁছিয়াছে। ইতি
বি
১৩৪*
যুক্তরাষ্ট্র, আমেরিকা
৩০ নভেম্বর, ১৮৯৪
প্রিয় আলাসিঙ্গা,
ফোনগ্রাফ ও পত্রখানি তোমার কাছে নিরাপদে পৌঁছেছে জেনে আনন্দিত হইলাম। আমাকে খবরের কাগজের অংশ কেটে আর পাঠাবার দরকার নেই, কাগজের বন্যা আমায় ভাসিয়ে দিয়েছে—এখন যথেষ্ট হয়েছে, আর আবশ্যক নেই। এখন সঙ্ঘের জন্য খাট। আমি ইতোমধ্যেই নিউ ইয়র্কে একটা সমিতি স্থাপন করেছি, তার সহকারী সভাপতি শীঘ্রই তোমাকে পত্র লিখবেন—তুমিও যত শীঘ্র পার তাঁদের সঙ্গে পত্রালাপ করতে আরম্ভ কর। আশা করি, আমি আরও কয়েক জায়গায় সমিতি স্থাপন করতে সমর্থ হব।
আমাদিগকে আমাদের সব শক্তি সংহত করতে হবে—একটা সম্প্রদায় গড়বার জন্যও নয়, আধ্যাত্মিক ব্যাপারের জন্যও নয়, কিন্তু বৈষয়িক দিকটার জন্য। জোরের সহিত প্রচারকার্য চালাতে হবে। তোমাদের সব মাথাগুলো একত্র কর ও সঙ্ঘবদ্ধ হও।
রামকৃষ্ণের অলৌকিক ক্রিয়া সম্বন্ধে কি পাগলামি হচ্ছে? আমার অদৃষ্টে সারা জীবন দেখছি—গরু-তাড়ানো ঘুচল না। মস্তিষ্কহীন আহাম্মকগুলো কেন যে এই বাজে আজগুবিগুলো লেখে তা জানিও না, বুঝিও না। মদকে ‘ডি. গুপ্তের ঔষধে’ পরিণত করা ছাড়া কি রামকৃষ্ণের জগতে আর কোন কাজ ছিল না? প্রভু আমাকে এই কলিকাতার লোকদের হাত থেকে রক্ষা করুন! কি সব লোক নিয়ে কাজ করতে হবে! যদি এরা শ্রীরামকৃষ্ণের একখানা যথার্থ জীবনচরিত লিখতে পারে—তিনি কি জন্য এসেছিলেন, কি শিক্ষা দিতে এসেছিলেন, সেই দিক্ লক্ষ্য রেখে লিখতে পারে, তবে লিখুক। নতুবা এইসব আবোল-তাবোল লিখে তাঁর জীবনী ও উপদেশকে যেন বিকৃত করা না হয়। এ-সব লোক ভগবানকে জানতে চায়—এদিকে রামকৃষ্ণের ভেতর বুজরুকি ছাড়া আর কিছু দেখতে পায় না! খাজা আহাম্মকি! এ-রকম আহাম্মকি দেখলে আমার রক্ত টগবগ ফুটতে থাকে।
কিডি তাঁর ভক্তি, জ্ঞান ও ধর্মসমন্বয়ের কথা এবং অন্যান্য উপদেশ তর্জমা করুন না? এই লিখতে হবে যে, তাঁর জীবনটা একটা অসাধারণ আলোকবর্তিকা, যার তীব্র রশ্মিসম্পাতে লোকে হিন্দুধর্মের সমগ্র দিক্ বা রূপ সত্যসত্যই বুঝতে সমর্থ হবে। শাস্ত্রে যে-সব জ্ঞান মতবাদরূপে রয়েছে, তিনি তার মূর্ত দৃষ্টান্ত। ঋষি ও অবতারেরা যা বাস্তবিক শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন, তিনি নিজের জীবন দ্বারা তা দেখিয়া গেছেন। শাস্ত্রগুলি মতবাদ মাত্র—তিনি ছিলেন তার প্রত্যক্ষ অনুভূতি। এই ব্যক্তি তাঁর একান্ন-বর্ষব্যাপী একটা জীবনে পাঁচ হাজার বছরের জাতীয় আধ্যাত্মিক জীবন যাপন করে গেছেন এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষাপ্রদ আদর্শরূপে আপনাকে গড়ে তুলেছিলেন। ভিন্ন ভিন্ন মত এক একটা অবস্থা বা ক্রম মাত্র, পরধর্ম বা পরমতের প্রতি শুধু দ্বেষভাবশূন্য হলেই চলবে না, আমাদিগকে ঐ ধর্ম বা মতকে আলিঙ্গনও করতে হবে; সত্যই সকল ধর্মের ভিত্তি—তাঁর এই মতবাদ দ্বারা বেদের ব্যাখ্যা ও শাস্ত্রসমূহের সমন্বয় হতে পারে। এসব ভাব নিয়ে তাঁর একখানি সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী জীবনচরিত লেখা যেতে পারে। সময়ে সবই ঠিক হবে। কুরুচিপূর্ণ অসংলগ্ন ভাষা পরিহার করবে। … অন্যান্য জাতিরা এগুলিকে চূড়ান্ত অশ্লীলতা মনে করে। তাঁর ইংরেজী জীবনচরিত সমগ্র জগৎ পড়বে, সুতরাং সাবধান, ঐপ্রকার শব্দ ও ভাব যেন ওর ভিতর প্রবেশ না করে। আমার নিকট প্রেরিত একখানা জীবনচরিত পড়লাম, তাতে এইরূপ বহু শব্দের প্রয়োগ আছে। … সুতরাং খুব সাবধান—খুব সাবধান হয়ে এরূপ ভাষা বা ভাব বাদ দেবে।
