ভারত দীর্ঘকাল ধরে যন্ত্রণা সয়েছে, সনাতন ধর্মের ওপর বহুকাল ধরে অত্যাচার হয়েছে। কিন্তু প্রভু দয়াময়, তিনি আবার তাঁর সন্তানগণের পরিত্রাণের জন্য এসেছেন। পতিত ভারতকে আবার জাগরিত হবার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পদতলে বসে শিক্ষা গ্রহণ করলেই কেবল ভারত উঠতে পারবে। তাঁর জীবন, তাঁর উপদেশ চারিদিকে প্রচার করতে হবে, যেন হিন্দুসমাজের সর্বাংশে—প্রতি অণুতে পরমাণুতে এই উপদেশ ওতপ্রোতভাবে ব্যাপ্ত হয়ে যায়। কে এ কাজ করবে? শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পতাকা বহন করে কে সমগ্র জগতের উদ্ধারের জন্য যাত্রা করবে? কে নাম, যশ, ঐশ্বর্যভোগ—এমন কি ইহলোক-পরলোকের সব আশা ত্যাগ করে অবনতির স্রোত রোধ করতে এগোবে? কয়েকটি যুবক দুর্গপ্রাচীরের ভগ্নপ্রদেশে লাফিয়ে পড়েছে—তারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে। তারা খুব অল্পসংখ্যক; এইরূপ কয়েক সহস্র যুবকের প্রয়োজন। তারা নিশ্চয়ই আসবে।আমি আনন্দিত যে, আমাদের প্রভু তোমার মনে তাঁদের অন্যতম হবার ইচ্ছা জাগিয়ে দিয়েছেন। প্রভু যাকে মনোনীত করবেন, সে-ই ধন্য—সে-ই মহাগৌরবের অধিকারী। তমোহ্রদে মজ্জমান লক্ষ লক্ষ নরনারীকে প্রভুর জ্যোতির্ময় রাজ্যে আনবার জন্য তোমার সঙ্কল্প উত্তম, আশা উচ্চ এবং লক্ষ্য অতি মহৎ।
কিন্তু হে বৎস, এতে অন্তরায় আছে। হঠাৎ কিছু করে ফেলা উচিত নয়। পবিত্রতা, সহিষ্ণুতা ও অধ্যবসায়—এই তিনটি, সর্বোপরি প্রেম সিদ্ধিলাভের জন্য একান্ত আবশ্যক। তোমার সামনে তো অনন্ত সময় পড়ে আছে, অতএব তাড়াতাড়ি হুড়োহুড়ির কোন প্রয়োজন নেই। তুমি যদি পবিত্র ও অকপট হও, সবই ঠিক হয়ে যাবে। তোমার মত শত শত যুবক চাই, যারা সমাজের উপর গিয়ে মহাবেগে পড়বে এবং যেখানে যাবে সেখানেই নবজীবন ও আধ্যাত্মিক শক্তি সঞ্চার করবে। ভগবান্ শীঘ্র তোমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করুন। ইতি
আশীর্বাদক
বিবেকানন্দ
১৩৭**
[মিস মেরী হেলকে লিখিত]
১৬৮, ব্র্যাট্ল্ ষ্ট্রীট, কেম্ব্রিজ
৮ ডিসেম্বর, ১৮৯৪
প্রিয় ভগিনী,
এখানে তিন দিন আছি। লেডী হেনরী সমারসেটের একটি সুন্দর বক্তৃতা হল। এখানে রোজ সকালে বেদান্ত বা অপরাপর বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে থাকি। তোমাকে পাঠিয়ে দেবার জন্য একখানি ‘বেদান্তধর্ম’ (Vedantism) ‘মাদার টেম্পলের’ নিকট দিয়েছিলাম। সে-খানি বোধ করি পেয়েছ। আর একদিন স্প্যাল্ডিংদের ওখানে খেতে গিয়েছিলাম। আমার আপত্তি সত্ত্বেও সেদিন তারা ধরে বসল মার্কিনদের সমালোচনা করতে হবে। আলোচনা তাদের অপ্রিয় হয়ে থাকবে; হওয়া স্বাভাবিক বটে—সর্বদা, সর্বত্র। চিকাগোয় ‘মাদার চার্চ’ ও পরিবারস্থ সকলের খবর কি? অনেকদিন হল তাঁদের কোন পত্র পাইনি। সময় পেলে এর পূর্বেই চট করে শহরে গিয়ে তোমার সঙ্গে একবার দেখা করে আসতাম। সারাদিনই বেশ ব্যস্ত থাকতে হয়। তারপর ভয়, গিয়েও যদি দেখা না হয়।
তোমার যদি অবসর থাকে লিখো; আমি সুযোগ পাওয়া মাত্রই তোমার সঙ্গে দেখা করে আসব। অপরাহ্ণের দিকে আমার অবকাশ। সকাল থেকে বেলা ১২টা ১টা পর্যন্ত খুব ব্যস্ত থাকতে হয়। এইভাবে চলবে—যে পর্যন্ত এখানে আছি অর্থাৎ এই মাসের ২৭ বা ২৮ তারিখ পর্যন্ত। সকলে আমার প্রীতি জানবে। ইতি
তোমার চিরস্নেহশীল ভ্রাতা
বিবেকানন্দ
১৩৮*
[মিস মেরী হেলকে লিখিত]
কেম্ব্রিজ
ডিসেম্বর, ১৮৯৪
প্রিয় ভগিনী,
এইমাত্র তোমার পত্র পেলাম। তোমাদের সামাজিক প্রথায় যদি না বাধে তা হলে মিসেস ওলি বুল, মিস ফার্মার, এবং মিসেস এডামস্ নামক চিকাগো হতে আগত ব্যায়ামবিশারদের সঙ্গে একবার দেখা করে যাও না কেন?
যে-কোন দিন তাদের সেখানে পাবে।
তোমাদের চিরস্নেহশীল
বিবেকানন্দ
১৩৯*
[মিস মেরী হেলকে লিখিত]
কেম্ব্রিজ
২১ ডিসেম্বর, ১৮৯৪
প্রিয় ভগিনী,
এর পর তোমার আর কোন পত্র পাইনি। আগামী মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে চলে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে তুমি মিসেস বুলের পত্র অবশ্য পেয়ে থাকবে। আমি যে-কোন দিন সানন্দে তোমার কাছে যাব; বক্তৃতা শেষ হওয়ায় আমার এখন অবকাশ আছে—আগামী রবিবার ছাড়া।
চিরস্নেহশীল
বিবেকানন্দ
১৪০*
[আলাসিঙ্গা পেরুমলকে লিখিত]
যুক্তরাষ্ট্র, আমেরিকা
২৬ ডিসেম্বর, ১৮৯৪
প্রিয়বরেষু,
শুভাশীর্বাদ। তোমার পত্র এই মাত্র পেলাম। নরসিংহ ভারতে পৌঁছেছে শুনে সুখী হলাম। ডাঃ ব্যারোজের ধর্মমহাসভা সম্বন্ধে বিবরণ-পুস্তকখানি তোমায় পাঠাতে পারিনি, সেইজন্য আমি দুঃখিত। পাঠাতে চেষ্টা করব। কথাটা হচ্ছে এই যে, ধর্মমহাসভা সম্বন্ধে সব ব্যাপার এদেশে পুরানো হয়ে গেছে। তিনি সম্প্রতি কোন বই লিখেছেন কিনা জানি না, আর তুমি যে কাগজখানির কথা উল্লেখ করেছ, তার সম্বন্ধেও কখনও কিছু জানিনি। এখন ডাঃ ব্যারোজ, ধর্মমহাসভা, তৎসংক্রান্ত এই পত্র ও অন্য যা কিছু সব প্রাচীন ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে, সুতরাং তোমরাও ঐগুলিকে ইতিহাসের সামিল ভাবতে পার।
এখন আমার সম্বন্ধে প্রায়ই শুনে থাকি, কোন না কোন মিশনরী কাগজে আমাকে আক্রমণ করে লিখে থাকে। তার কোনটা আমার দেখবার ইচ্ছাও হয় না। যদি ভারতের ঐ-রকম মিশনরীদের আক্রমণ-সম্বলিত কোন কাগজ আমাকে পাঠাও, তা হলে তা জঞ্জালের সঙ্গে ফেলে দেব। আমাদের কাজের জন্য একটু হুজ্জতের দরকার হয়েছিল—এখন যথেষ্ট হয়েছে। এখন আর লোকে এখানে বা সেখানে আমার পক্ষে বা বিপক্ষে ভালমন্দ কি বলছে, সেদিকে আর লক্ষ্য করো না। তুমি তোমার কাজ করে যাও, আর মনে রেখো—‘ন হি কল্যাণকৃৎ কশ্চিত দুর্গতিং তাত গচ্ছতি।’
