একটা জিনিষ করা আবশ্যক—যদি পার। মান্দ্রাজে একটা প্রকাণ্ড সভা আহ্বান করতে পার? রামনাদের রাজা বা ঐরূপ একজন বড় লোক কাকেও সভাপতি করে ঐ সভায় একটা প্রস্তাব করিয়ে নিতে পার যে, আমি আমেরিকায় হিন্দুধর্ম যে ভাবে ব্যাখ্যা করেছি, তাতে তোমরা সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হয়েছ (—অবশ্য যদি তোমরা সত্যই ঐরূপ হয়ে থাক)। তারপর সেই প্রস্তাবটি ‘চিকাগো হেরাল্ড’, ‘ইণ্টার-ওশ্যান’ (Inter-Ocean), ‘নিউ ইয়র্ক সান’ এবং ডেট্রয়েট (মিশিগান) থেকে প্রকাশিত ‘কমার্শিয়াল এডভাটাইজার’ কাগজে পাঠিয়ে দিতে হবে। চিকাগো ইলিনয় রাষ্ট্রে। ‘নিউ ইয়র্ক সান’-এর আর বিশেষ ঠিকানার কোন আবশ্যক নাই। প্রস্তাবের কয়েকটি কপি ধর্ম-মহাসভার সভাপতি ডাঃ ব্যারোজকে চিকাগোয় পাঠাবে—আমি তাঁর বাড়ীর নম্বরটা ভুলে গেছি, রাস্তাটার নাম ইণ্ডিয়ানা এভিনিউ। এক কপি ডেট্রয়েটের মিসেস জে. জে. ব্যাগলির নামে পাঠাবে—তাঁর ঠিকানা ওয়াশিংটন এভিনিউ। এই সভাটা যত বড় হয়, তার চেষ্টা করবে। যত বড় বড় লোককে পার, ধরে নিয়ে এসে এই সভায় যোগ দেওয়াবার চেষ্টা করবে; তাঁদের ধর্মের জন্য, দেশের জন্য তাঁদের এতে যোগ দেওয়া উচিত। মহীশূরের মহারাজ ও তাঁর দেওয়ানের নিকট হতে সভা ও তার উদ্দেশ্যের সমর্থন করে চিঠি নেবার চেষ্টা কর—খেতড়ির মহারাজের নিকট থেকেও ঐরূপ চিঠি নেবার চেষ্টা কর—মোটের উপর সভাটা যত প্রকাণ্ড হয় ও তাতে যত বেশী লোক হয়, তার চেষ্টা কর।
উঠ বৎসগণ—এই কাজে লেগে যাও। যদি তোমরা এটা করতে পার, তবে ভবিষ্যতে আমরা অনেক কাজ করতে পারব নিশ্চয়।
প্রস্তাবটি এমন ধরনের হবে যে, মান্দ্রাজের হিন্দুসমাজ, যাঁরা আমাকে এখানে পাঠিয়েছিলেন, তাঁরা আমার এখানকার কাজে সম্পূর্ণ সন্তোষ প্রকাশ করছেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।
যদি সম্ভব হয়, এইটির জন্য চেষ্টা কর—এ তো আর বেশী কাজ নয়। সব জায়গা থেকে যতদূর পার আমাদের কাজে সহানুভূতি-প্রকাশক পত্রও যোগাড় কর, ঐগুলি ছাপাও, আর যত শীঘ্র পার মার্কিন সংবাদপত্রসমূহে পাঠাও। বৎসগণ, এতে অনেক কাজ হবে। ‘ব্রা—’ সমাজের লোকেরা এখানে যা তা বলছে। যত শীঘ্র হয়, তাদের মুখ বন্ধ করে দিতে হবে। সনাতন হিন্দুধর্মের জয় হোক। মিথ্যাবাদী ও পাষণ্ডেরা পরাভূত হোক। উঠ, উঠ বৎসগণ, আমরা নিশ্চিত জয়লাভ করব। আমার পত্রগুলির প্রকাশ সম্বন্ধে বক্তব্য এই—যতদিন না আমি ভারতে ফিরছি, ততদিন এইগুলির যতটা অংশ প্রকাশ করা উচিত, ততটা আমাদের বন্ধুগণের নিকট প্রকাশ করা যেতে পারে। একবার কাজ করতে আরম্ভ করলে খুব হুজুকে মেতে যাবে, কিন্তু আমি কাজ না করে বাঙালীর মত কেবল লম্বা লম্বা কথা কইতে চাই না।
ঠিক বলতে পারি না, তবে বোধ হয়, কলিকাতার গিরিশ ঘোষ আর মিত্র মহাশয় আমার গুরুদেবের ভক্তদের দিয়ে কলিকাতায় ঐরূপ সভা আহ্বান করাতে পারেন। যদি পারেন তো খুব ভালই হয়। সম্ভব হলে কলিকাতার সভায় ঐ একই রকম প্রস্তাব পাস করিয়ে নিতে বলবে। কলিকাতায় হাজার হাজার লোক আছে, যারা আমাদের কাজের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন। …
আর বিশেষ কিছু লিখিবার নেই। আমাদের সকল বন্ধুকে আমার সাদর সম্ভাষণাদি জানাবে—আমি সতত তাঁদের কল্যাণ প্রার্থনা করছি। ইতি
আশীর্বাদক
বিবেকানন্দ
পুনঃ—সাবধান, পত্র লিখিবার সময় আমার নামের আগে ‘His Holiness’ লিখো না। এখানে উহা অত্যন্ত কিম্ভূতকিমাকার শুনায়। ইতি
বি
৮৮*
[অধ্যাপক রাইটকে লিখিত]
নিউ ইয়র্ক
২৫ এপ্রিল, ’৯৪
প্রিয় অধ্যাপকজী,
আপনার আমন্ত্রণের জন্য গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। ৭ই মে যাচ্ছি। বিছানা?—বন্ধু, আপনার ভালবাসা এবং মহৎ প্রাণ পাথরকেও পাখীর পালকের মত কোমল করতে পারে।
সেলেমে লেখকদের প্রাতরাশে যোগ দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত।
৭ই ফিরছি।
আপনার বিশ্বস্ত
বিবেকানন্দ
৮৯*
[মিস ইসাবেল ম্যাক্কিণ্ডলিকে লিখিত]
নিউ ইয়র্ক
২৬ এপ্রিল
প্রিয় ভগিনী,
গতকাল তোমার চিঠি পেয়েছি। তুমি ঠিকই বলেছ, আমি ‘ইণ্টিরিয়র’-৫০ এর পাগলামিতে খুব মজা বোধ করছি। কিন্তু তুমি ভারতের কাগজপত্রের যে ডাক গতকাল পাঠিয়েছ, তা মাদার চার্চ যেমন বলেছেন—দীর্ঘ বিরতির পর সত্যি সুসংবাদ। ওর মধ্যে দেওয়ানজীর একটি চমৎকার পত্র আছে। বৃদ্ধ লোকটি—প্রভু তাঁকে আশীর্বাদ করুন, যথারীতি সাহায্যের প্রস্তাব করেছেন। ওর মধ্যে কলিকাতায় প্রকাশিত আমার সম্বন্ধে একটি ছোট্ট পুস্তিকা আছে, যাতে দেখা গেল—‘প্রত্যাদিষ্ট ব্যক্তি’ তাঁর নিজ দেশে মর্যাদা পেলেন; আমার জীবনে অন্তত একবারের জন্য এটা দেখতে পেলাম। আমেরিকান ও ভারতীয় পত্র-পত্রিকা থেকে সংগৃহীত আমার বিষয়ক অংশগুলি তার মধ্যে রয়েছে। কলিকাতার পত্রাদির অংশগুলি বিশেষভাবে তৃপ্তিকর, কিন্তু প্রশংসাবাহুল্যের জন্য সেগুলি তোমাকে পাঠাব না। তারা আমার সম্বন্ধে ‘অপূর্ব’, ‘অদ্ভুত’, ‘সুবিখ্যাত’ এইসব নানা আজে-বাজে কথা বলেছে, কিন্তু তারা বহন করে এনেছে সমগ্র জাতির হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা। এখন আমি লোকের কথা আর গ্রাহ্য করি না, আমার নিজের দেশের লোক বললেও না—কেবল একটি কথা। আমার বুড়ী মা এখনও বেঁচে আছেন, সারা জীবন তিনি অসীম কষ্ট পেয়েছেন, সে-সব সত্ত্বেও মানুষ আর ভগবানের সেবায় আমাকে উৎসর্গ করবার বেদনা তিনি সহ্য করেছেন। কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠ আশার, তাঁর সবচেয়ে ভালবাসার যে ছেলেটিকে তিনি দান করেছেন, সে দূরদেশে গিয়ে—কলিকাতায় মজুমদার যেমন রটাচ্ছে তেমনিভাবে—জঘন্য নোংরা জীবন যাপন করছে, এ সংবাদ তাঁকে একেবারে শেষ করে দেবে। কিন্তু প্রভু মহান্, তাঁর সন্তানের ক্ষতি কেউ করতে পারে না।
