পরিশেষে আমাকে ‘স্বদেশবাসী’ বলে সম্বোধন করার জন্য আমি আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এই সর্বপ্রথম কোন বিদেশী ইওরোপীয় একজন ঘৃণ্য নেটিভকে ঐ ভাষায় সম্বোধন করতে সাহসী হলেন—তিনি ভারতে জাত বা মিশনরী, যাই হোন না কেন। বন্ধুবর, ঐ একইভাবে ভারতবর্ষেও কি আমাকে সম্বোধন করতে আপনি সাহস করবেন? ভারতে জাত মিশনরীদের অনুগ্রহ করে বলুন, তাঁরা ঐভাবেই যেন আমাদের সম্বোধন করেন, এবং যাঁরা ভারতে জন্মাননি, তাঁদের বলুন তাঁরা যেন ভারতবাসীকে সমপর্যায়ের মানুষ বলে গণ্য করেন। আর বাকী সব বিষয়ে—আপনি নিজেই আমাকে আহাম্মক মনে করবেন, যদি আমি কতকগুলো পৃথিবী-পর্যটক বা অলীক কাহিনীকারের বিবরণ অনুযায়ী আমাদের ধর্ম বা সমাজের বিচার হতে পারে বলে স্বীকার করে নিই। ভ্রাতঃ, ক্ষমা করবেন, ভারতে জন্মালেও আমাদের সমাজ বা ধর্মের বিষয়ে আপনি জানেনই বা কি? কেননা সমাজের দ্বার যেভাবে বন্ধ, কিছু জানা অসম্ভব। সর্বোপরি, সকলেই তার পূর্ব ধারণার মাপকাঠিতে কোন জাতি বা ধর্মের বিচার করে থাকে—করে না কি? প্রভু আপনাকে আশীর্বাদ করুন, আপনি আমাকে ‘স্বদেশবাসী’ বলেছেন। পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে প্রেম ও সৌহার্দ্যের সম্পর্ক এখনও সম্ভব।
ভ্রাতৃপ্রেমবদ্ধ
বিবেকানন্দ
৮৬*
[মিস মেরী হেলকে লিখিত]
ডেট্রয়েট
৩১ মার্চ, ১৮৯৪
প্রিয় ভগিনী,
তুমি ও মাদার চার্চ টাকা পেয়েছ জানিয়ে যে চিঠি দুখানি লিখেছ, তা এইমাত্র একসঙ্গে পেলাম। খেতড়ির পত্রটি পেয়ে সুখী হলাম; তোমাকে ওটি ফেরত পাঠাচ্ছি। পড়ে দেখো—লেখক চাইছেন খবরের কাগজের কিছু কাটিং! ডেট্রয়েটের কাগজগুলি ছাড়া আর কিছু আমার কাছে নেই, তাই পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুমিও কিছু সংগ্রহ করতে পারলে পাঠিয়ে দিও—যদি অবশ্য সুবিধা হয়। ঠিকানা জান তো?—
H. H. The Maharaja of Khetri, Rajputana, India.
চিঠিখানা কিন্তু তোমাদের ধার্মিক পরিবারের মধ্যেই যেন থাকে। মিসেস ব্রীড প্রথমে আমায় এক কড়া ঝাঁঝালো চিঠি দেন। আজ টেলিগ্রামে এক সপ্তাহের জন্য তাঁর আতিথ্যগ্রহণের নিমন্ত্রণ পেলাম। এর আগে নিউ ইয়র্ক থেকে মিসেস স্মিথের এক পত্র পেয়েছি—তিনি, মিস হেলেন গোল্ড ও ডাক্তার—আমাকে নিউ ইয়র্কে আহ্বান করেছেন। আবার আগামী মাসে ১৭ তারিখে লীন ক্লাবের (Lynn Club) নিমন্ত্রণ আছে। প্রথমে নিউ ইয়র্কে যাব, তারপর লীনে তাদের সভায় যথাসময়ে উপস্থিত হব।
ইতোমধ্যে যদি আমি চলে না যাই—মিসেস ব্যাগলির আগ্রহও তাই, তাহলে আগামী গ্রীষ্মে সম্ভবতঃ এনিস্কোয়ামে (Annisquam) যাব। মিসেস ব্যাগলি সেখানে এক সুন্দর বাড়ী বন্দোবস্ত করে রেখেছেন। মহিলাটি বেশ ধর্মপ্রাণা (spiritual), মিঃ পামার কিন্তু বেশ একটু পানাসক্ত (spirituous)—তাহলেও সজ্জন। অধিক আর কি? আমি শারীরিক ও মানসিক বেশ ভাল আছি। স্নেহের ভগিনীগণ! তোমরা সুখী—চিরসুখী হও। ভাল কথা, মিসেস শার্মান নানা রকমের উপহার দিয়েছেন—নখ কাটবার ও চিঠি রাখবার সরঞ্জাম, একটি ছোট ব্যাগ, ইত্যাদি ইত্যাদি—যদিও ওগুলি নিতে আমার আপত্তি ছিল, বিশেষ করে ঝিনুকের হাতলওয়ালা শৌখীন নখকাটা সরঞ্জামটার বিষয়ে, তবুও তাঁর আগ্রহের জন্য নিতে হল। ঐ ব্রাশ নিয়ে কি যে করব, তা জনি না। ভগবান্ ওদের রক্ষা করুন। তিনি এক উপদেশও দিয়েছেন—আমি যেন এই আফ্রিকী পরিচ্ছদে ভদ্রসমাজে না যাই। তবে আর কি! আমিও একজন ভদ্রসমাজের সভ্য! হা ভগবান্, আরও কি দেখতে হবে! বেশী দিন বেঁচে থাকলে কত অদ্ভুত অভিজ্ঞতাই না হয়!
তোমাদের ধার্মিক পরিবারের সকলকে অগাধ স্নেহ জানাচ্ছি। ইতি
তোমার ভ্রাতা
বিবেকানন্দ
৮৭*
[মান্দ্রাজী ভক্তদিগকে লিখিত]
নিউ ইয়র্ক
৯ এপ্রিল, ১৮৯৪
প্রিয় আলাসিঙ্গা,
তোমার শেষ পত্রখানি কয়েকদিন আগে পেয়েছি। দেখ, আমাকে এখানে এত বেশী ব্যস্ত থাকতে হয় আর প্রত্যহ এতগুলো চিঠি লিখতে হয় যে, তুমি আমার কাছ থেকে ঘন ঘন পত্র পাবার আশা করতে পার না। যা হোক, এখানে যা কিছু হচ্ছে, তা যাতে তুমি মোটামুটি জানতে পার, তার জন্য আমি বিশেষ চেষ্টা করে থাকি। আমি ধর্মমহাসভা-সম্বন্ধীয় একখানি বই তোমায় পাঠাবার জন্য চিকাগোয় লিখব। ইতোমধ্যে তুমি নিশ্চয় আমার দুটি ক্ষুদ্র বক্তৃতা পেয়েছ।
সেক্রেটারী সাহেব আমায় লিখেছেন, আমার ভারতে ফিরে যাওয়া অবশ্য কর্তব্য—কারণ ভারতই আমার কর্মক্ষেত্র। এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু হে ভ্রাতৃগণ, আমাদিগকে এমন একটি প্রকাণ্ড মশাল জ্বালতে হবে, যা সমগ্র ভারতে আলো দেবে। অতএব ব্যস্ত হয়ো না, ঈশ্বরেচ্ছায় সময়ে সবই হবে। আমি আমেরিকায় অনেক বড় বড় শহরে বক্তৃতা দিয়েছি এবং ওতে যে টাকা পেয়েছি, তাতে এখানকার অত্যধিক খরচ বহন করেও ফেরবার ভাড়া যথেষ্ট থাকবে। আমার এখানে অনেক ভাল ভাল বন্ধু হয়েছে—তার মধ্যে কয়েকজনের সমাজে যথেষ্ট প্রতিপত্তি। অবশ্য গোঁড়া পাদ্রীরা আমার বিপক্ষে, আর তাঁরা আমার সঙ্গে সোজা রাস্তায় সহজে পেরে উঠবেন না দেখে আমাকে গালমন্দ নিন্দাবাদ করতে আরম্ভ করেছেন, আর ‘ম—’বাবু তাঁদের সাহায্য করছেন। তিনি নিশ্চয় হিংসায় পাগল হয়ে গেছেন। তিনি তাঁদের বলেছেন, আমি একটা ভয়ানক জোচ্চোর ও বদমাশ, আবার কলিকাতায় গিয়ে সেখানকার লোকদের বলেছেন, আমি ঘোর পাপে মগ্ন, বিশেষতঃ আমি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়েছি!!! প্রভু তাঁকে আশীর্বাদ করুন। ভ্রাতৃগণ, কোন ভাল কাজই বিনা বাধায় সম্পন্ন হয় না। কেবল যারা শেষ পর্যন্ত অধ্যবসায়ের সহিত লেগে থাকে, তারাই কৃতকার্য হয়। আমি তোমার ভগিনীপতির৪৯ লিখিত পুস্তিকাগুলি এবং তোমার পাগলা বন্ধুর আর একখানি পত্র পেয়েছি। ‘যুগ’ সম্বন্ধে প্রবন্ধটি বড় সুন্দর—তাতে যুগের যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তাই তো ঠিক ব্যাখ্যা; তবে আমি বিশ্বাস করি, সত্যযুগ এসে পড়েছে—এই সত্যযুগে এক বর্ণ, এক বেদ হবে এবং সমগ্র জগতে শান্তি ও সমন্বয় স্থাপিত হবে। এই সত্যযুগের ধারণা অবলম্বন করেই ভারত আবার নবজীবন পাবে। এতে বিশ্বাস স্থাপন কর।
