ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়েছে—আমি না চাইতেই। ঐ সম্পাদকটি কে জান?—আমাদের দেশের অন্যতম প্রধান সংবাদপত্রের সম্পাদক, যিনি আমার অত প্রশংসা করেছেন এবং আমেরিকায় আমি হিন্দুধর্মের পক্ষ-সমর্থনে এসেছি বলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, তিনি মজুমদারের সম্পর্কিত ভাই!! হতভাগ্য মজুমদার! ঈর্ষায় জ্বলে মিথ্যা কথা বলে নিজের উদ্দেশ্যেরই ক্ষতি করলে। প্রভু জানেন, আমি আত্মসমর্থনের কিছুমাত্র চেষ্টা করিনি।
‘ফোরাম’-এ মিঃ গান্ধীর রচনা এর পূর্বেই আমি পড়েছি। যদি গতমাসের ‘রিভিউ অফ রিভিউজ’টা পাও, তাহলে সেটা মায়ের কাছে পাঠ কর। তাতে আফিং-সংক্রান্ত ব্যাপারে ভারতীয় চরিত্র সম্পর্কে বৃটিশ ভারতের জনৈক সর্বোচ্চ রাজকর্মচারীর অভিমত পাবে। তিনি ইংরেজদের সঙ্গে হিন্দুদের তুলনা করে হিন্দুদের আকাশে তুলেছেন। আমাদের জাতির একজন চরমতম শত্রু ঐ স্যার লেপেল্ গ্রিফিন্! তাঁর এই মত-পরিবর্তনের কারণ কি?
বষ্টনে মিসেস ব্রীড-এর বাড়ীতে আমার সময় কেটেছে চমৎকার। অধ্যাপক রাইটের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয়েছে। আমি আবার বষ্টনে যাচ্ছি। দরজীরা আমার নূতন গাউন তৈরী করছে। কেম্ব্রিজ (হার্ভার্ড) ইউনিভার্সিটিতে বক্তৃতা দিতে যাব। সেখানে অধ্যাপক রাইটের অতিথি হব। বষ্টনের কাগজপত্রে আমাকে বিরাট করে স্বাগত জানিয়েছে।
এই সব আজে-বাজে ব্যাপারে আমি পরিশ্রান্ত। মে মাসের শেষের দিকে চিকাগোয় যাব। সেখানে কয়েকদিন কাটিয়ে আবার ফিরব পূর্বদিকে।
গত রাত্রে ওয়ালডর্ফ হোটেলে বক্তৃতা দিয়েছি। মিসেস স্মিথ প্রতি টিকিট দু-ডলার করে বেচেছেন। ঘর-ভর্তি শ্রোতা পেয়েছিলাম, যদিও ঘরটি বেশী বড় ছিল না। টাকাকড়ির দর্শন এখনও পাইনি। আজকের মধ্যে পাবার আশা রাখি।
লীন-এ যে এক-শ ডলার পেয়েছি, তা পাঠালাম না, কারণ নূতন গাউন তৈরী ইত্যাদি বাজে ব্যাপারে খরচ করতে হবে।
বষ্টনে টাকার ভরসা নেই। তবু আমেরিকার মস্তিষ্কটিকে স্পর্শ করতেই হবে, তাতে নাড়া দিতেই হবে, দেখি যদি পারি।
তোমার প্রিয় ভ্রাতা
বিবেকানন্দ
৯০*
[মিস ইসাবেল ম্যাক্কিণ্ডলিকে লিখিত]
নিউ ইয়র্ক
২ (যথার্থতঃ ১) মে, ’৯৪
প্রিয় ভগিনী,
পুস্তিকাটি তোমাকে এখনই পাঠাতে পারব বলে মনে হয় না, তবে গতকাল ভারত থেকে সংবাদপত্রের যে-সব অংশ এসেছে, তা তোমায় পাঠিয়ে দিচ্ছি। সেগুলো পড়ে অনুগ্রহ করে মিসেস ব্যাগলির কাছে পাঠিয়ে দিও। ঐ সংবাদপত্রটির সম্পাদক হচ্ছেন মিঃ মজুমদারের আত্মীয়। বেচারা মজুমদারের জন্য এখন আমার দুঃখ হয়!!
আমার কোটের ঠিক কমলা রঙটি এখানে খুঁজে বার করতে পারলাম না। সুতরাং তার কাছাকাছি ভাল রঙ যা মিলল—পীতাভ রক্তিম—তাতেই খুশী থাকতে হল। কয়েকদিনের মধ্যেই কোটটি তৈরী হয়ে যাবে।
সেদিন ওয়ালডর্ফের বক্তৃতা থেকে ৭০ ডলার পেয়েছি। আগামীকালের বক্তৃতা থেকে আরও কিছু পাবার আশা রাখি। ৭ থেকে ১৯ তারিখ পর্যন্ত বষ্টনে বক্তৃতাদি আছে, তবে সেখানে তারা খুব কমই পয়সা দেয়।
গতকাল ১৩ ডলার দিয়ে একটা পাইপ কিনেছি—দোহাই, ফাদার পোপকে কথাটি বল না যেন। কোটের খরচ পড়বে ৩০ ডলার। খাবার-দাবার ঠিকই মিলছে … এবং যথেষ্ট টাকা। আশা হয়, আগামী বক্তৃতার পরেই অবিলম্বে ব্যাঙ্কে কিছু রাখতে পারব।
… সন্ধ্যায় এক নিরামিষ নৈশভোজে বক্তৃতা দিতে যাচ্ছি!
ঠিক, আমি নিরামিষাশী … কারণ যখন নিরামিষ জোটে, তখন তাই আমার পছন্দ। লাইম্যান অ্যাবট-এর কাছে আগামী পরশু মধ্যাহ্ন-ভোজের আর একটি নিমন্ত্রণ আছে। সময় মোটের উপর চমৎকার কাটছে। বষ্টনেও তেমনি সুন্দর কাটবে আশা হয়—কেবল ঐ জঘন্য, অতি জঘন্য বিরক্তিকর বক্তৃতা বাদে। যা হোক, ১৯ তারিখ পার হলেই এক লাফে বষ্টন থেকে … চিকাগোয়, … তারপরে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেব, আর টানা বিশ্রাম—দু-তিন সপ্তাহের। তখন গ্যাঁট হয়ে বসে শুধু গল্প করব—আর পাইপ টানব।
ভাল কথা, তোমার নিউ ইয়র্কীরা লোক খুবই ভাল, কেবল তাদের মগজের চেয়ে টাকা বেশী।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কাছে বক্তৃতা দিতে যাব। বষ্টনে তিনটি বক্তৃতা এবং হার্ভার্ডে তিনটি—সকলেরই ব্যবস্থা করেছেন মিসেস ব্রীড। এখানেও ওরা কিছু ব্যবস্থা করছে। সুতরাং চিকাগোর পথে আমি আর একবার নিউ ইয়র্কে আসব—কিছু কড়া বাণী শুনিয়ে টাকাকড়ি পকেটস্থ করে সাঁ করে চিকাগোয় চলে যাব।
চিকাগোয় পাওয়া যায় না এমন কিছু যদি নিউ ইয়র্ক বা বষ্টন থেকে তোমার দরকার থাকে, সত্বর লিখবে। আমার এখন পকেট-ভর্তি ডলার। যা তুমি চাইবে এক মুহূর্তে পাঠিয়ে দেব। এতে অশোভন কিছু হবে—কখনও মনে কর না। আমার কাছে বুজরুকি নেই। আমি যদি তোমার ভাই হই তো ভাই-ই! পৃথিবীতে একটি জিনিষই আমি ঘৃণা করি—বুজরুকি।
তোমার স্নেহময় ভাই
বিবেকানন্দ
১০. পত্রাবলী ৯১-১০০
৯১*
[অধ্যাপক রাইটকে লিখিত]
নিউ ইয়র্ক
৪ মে, ১৮৯৪
প্রিয় অধ্যাপকজী,
আপনার সহৃদয় লিপি এখনই পেলাম। আপনার কথামত কাজ করে আমি যে খুবই সুখী হব, তা বলাই বাহুল্য।
কর্ণেল হিগিন্সনের চিঠিও পেয়েছি। তাকে উত্তর পাঠাচ্ছি। আমি রবিবার (৬ই মে) বষ্টনে যাব। মিসেস হাউ-এর উইমেন্স্ ক্লাবে সোমবার বক্তৃতা দেবার কথা।
আপনার সদা বিশ্বস্ত
বিবেকানন্দ
৯২*
১৭ বীকন ষ্ট্রীট, বষ্টন
মে, ১৮৯৪
প্রিয় অধ্যাপকজী,
ইতোমধ্যে আপনি পুস্তিকা এবং চিঠিগুলি পেয়ে গেছেন। যদি আপনি চান, তাহলে চিকাগো থেকে ভারতীয় রাজা ও রাজমন্ত্রীদের কয়েকখানি চিঠি পাঠাতে পারি। ঐ মন্ত্রীদের একজন ভারতের রাজকীয় কমিশনের অধীন বিগত ‘আফিং কমিশন’-এর অন্যতম সদস্য ছিলেন। আমি যে প্রতারক নই, তা আপনাকে বিশ্বাস করবার জন্য তাদের আপনার কাছে লিখতে বলব, আপনি যদি এটা পছন্দ করেন। কিন্তু ভ্রাতঃ, এ সব বিষয়ে গোপনতা ও অপ্রতিকারই আমাদের জীবনের আদর্শ।
