সেনদের স্বল্পকাল রাজত্বের সময়কার শূন্য-পুরাণতত্ত্বে, শেখ-শুভোদয়ায়, গীত-গোবিন্দে ব্রাহ্মণ্য-বিকৃতি লক্ষণীয়। রাজধর্মে ও ক্ষাত্রশক্তিতে এসেছিল শিথিলতা। মন্ত্রতন্ত্র প্রভৃতি আধিদৈবিক শক্তির উপর একান্ত নির্ভরতা এ যুগের প্রাসাদ ও কুটির বাসীর চিত্ত-দৌর্বল্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে। বৌদ্ধদের উপর এ সময়ে উৎপীড়ন চলছিল; নিরঞ্জনের রুম্মাই তার সাক্ষ্য। বৌদ্ধেরা তখন শৈব, সহজিয়া, নাথযোগী ও ধর্মপন্থী হয়ে হিন্দুসমাজে আত্মগোপন করতে প্রয়াসী হয়। সেন আমলে নিম্নবর্ণের হিন্দুদেরও দুর্ভোগের সীমা ছিল না। এ সময়ে শূদ্রমাত্রেরই উচ্চশ্রেণীর লেখাপড়ার অধিকার কাড়িয়া লওয়া হইল। … এই জনসাধারণ অজ্ঞ ও মূর্খ রহিয়া গেল। দেশীলোক ও দেশী ভাষার প্রতি অবজ্ঞাবশে সেনেরা বিদেশী ব্রাহ্মণ আনয়নে এবং সংস্কৃত-চর্চার প্রসারে উৎসাহী ছিলেন। এসব কারণে বাঙলাভাষায় লিখিত সাহিত্য সৃষ্টি হতে দেরি হল অনেক। তার জন্যে তুর্কী বিজয়ের প্রয়োজন ছিল। কাজেই তুর্কী বিজয়ে কেবল সধর্মীদেরই পীড়নমুক্তির নিশ্বাস পড়েনি, বাঙলা ভাষারও সুদিনের শুরু হয়েছে। তুর্কী অধিকারে সেন-আমলের বৈষম্যমূলক শাসন রহিত হয়। রাজ্য শাসনে ও রাজস্বব্যবস্থায় এমনকী সৈনাপত্যেও হিন্দুর প্রাধান্য সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। অধিকাংশ আফগানই তাঁহাদের জায়গীরগুলি ধনবান হিন্দুর হাতে ছাড়িয়া দিতেন। … এই জায়গীরগুলির ইজারা সমস্ত ধনশালী হিন্দুরা লইতেন এবং হঁহারাই ব্যবসায় বাণিজ্যের সমস্ত সুবিধা ভোগ করিতেন। বাঙলা দেশে পাঠান প্রাবল্যের যুগ এক বিষয়ে বাঙলার ইতিহাসে সর্বপ্রধান যুগ। আশ্চর্যের বিষয় হিন্দু স্বাধীনতার সময়ে বঙ্গদেশে সভ্যতার যে শ্রী ফুটিয়া উঠিয়াছিল এই পরাধীন যুগে সেই শ্ৰী শতগুণে বাড়িয়া গিয়াছিল। … এই পাঠান যুগে সর্বপ্রথম হিন্দুসমাজে নূতন বিক্ষোভ দৃষ্ট হইল। জনসাধারণের মধ্যে শাস্ত্রগ্রন্থের অনুবাদ প্রচারিত হওয়াতে তাহারা গরুড় পক্ষী হইয়া ব্রাহ্মণের নিকট করজোড়ে থাকিতে দ্বিধাবোধ করিল। ব্রাহ্মণেরা বাধ্য হইয়া শাস্ত্রগ্রন্থ বাঙলায় প্রচার করিলেন; তাহারা ঘোর অনিচ্ছায় ইহা করিয়াছিলেন। এই অনুবাদ কার্য শেষ করিয়া তাঁহারা শাস্ত্রের অনুবাদক ও শ্রোতাগিদের বাপান্ত করিয়া অভিশাপ দিতে লাগিলেন, অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানি চ। ভাষায়াং মানব শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ। একদিকে মুসলমান ধর্মের প্রভাব, অপরদিকে বাঙলা ভাষায় ধর্ম প্রচার–এই দুই কারণে বঙ্গীয় জনসাধারণের মন নব্যভাবে জাগ্রত হইল। শাসন ও রুচি হইতে মুক্ত হইয়া চিন্তাজগতে হিন্দুরাজগণ তান্ত্রিক হইয়া পড়িল। ব্রাহ্মণেরাও রাজ্য শাসন হইতে মুক্তি পাইয়া অবাধে স্বীয় মত সমাজে চালাইতে লাগাইলেন। এই পাঠান-প্রাধান্য যুগে চিন্তাজগতে সর্বত্র অভূতপূর্ব স্বাধীনতার খেলা দৃষ্ট হইল। এই স্বাধীনতার ফলে বাঙ্গালার প্রতিভার যেরূপ অদ্ভুত বিকাশ পাইয়াছিল, এদেশের ইতিহাসে অন্য কোনোও সময়ে দ্রুপ বিকাশ সচরাচর দেখা যায় নাই।
অনার্য সংস্কার বশে নিম্নশ্রেণীর জনগণ কীভাবে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য যুগে রাজশক্তির প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিজেদের পূর্বতন ধর্ম, আচার ও সংস্কার জিইয়ে রেখেছিল, তা আমরা দেখেছি। বৌদ্ধ তারিতা, বজ্রতারা, অবলোকিতেশ্বর শিব কিংবা ধর্মঠাকুর লোক-মানস প্রশ্রয়ে বৌদ্ধ আবরণে যেমন পূজিত হয়েছেন, তেমনি ব্রাহ্মণ্য যুগে তাঁরা যথাক্রমে মনসা, চণ্ডী, লৌকিক বিষ্ণু, শিব, ধর্মঠাকুররূপে নতুন পোশাকে হিন্দুদেবতা রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন; নাথ ও সহজিয়াপন্থও বৌদ্ধ এবং হিন্দুর সাম্প্রদায়িক মত রূপে গৃহীত হয়। এসব সুপ্রাচীন মতের উদ্ভবের স্থান ও কাল সম্বন্ধে মতভেদ আছে। তবে এগুলো যে অতি প্রাচীন অনার্য মানস-সদ্ভূত ও জাদুবিশ্বাস যুগের সৃষ্টি তাতে কেউ সন্দেহ পোষণ করে না।
বৌদ্ধ-হিন্দু যুগে রাজশক্তির বিরূপতায় বহিরাগত বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যবাদী আর্যদের মধ্যে তথা অভিজাত ও উচ্চবর্ণের মধ্যে এসব লৌকিক মত ও দেবতার প্রতিষ্ঠা ছিল না। তুর্কী আমলে রাজভয় থেকে মুক্ত হয়ে জনসাধারণ উচ্চবিত্তের সমাজেও তাদের ধর্ম ও দেবতার সার্বভৌম প্রতিষ্ঠাদানে প্রয়াসী হয়। এ কারণেই তখন থেকে শুরু হয় দেব-মানবের সংগ্রাম। রবীন্দ্রনাথ বলেন, এককালে পুরুষ-দেবতা যিনি ছিলেন; তাঁর বিশেষ কোনো উপদ্রব ছিল না। খামকা মেয়ে দেবতা জোর করে এসে বায়না ধরলেন, আমার পূজা চাই। অর্থাৎ যে-জায়গায় আমার দখল নাই সে-জায়গা আমি দখল করবই। তোমার দলিল কী? গায়ের জোর। কী উপায়ে দখল করবে? যে উপায়েই হোক। তারপর যে-সকল উপায় দেখা গেল মানুষের সদ্বুদ্ধিতে তাকে সদুপায় বলে না। কিন্তু পরিণামে এইসকল উপায়ের জয় হল। ছলনা, অন্যায় এবং নিষ্ঠুরতা কেবল মন্দির দখল করল তা নয়, কবিদের দিয়ে মন্দিরা বাজিয়ে চামর দুলিয়ে আপন জয়গান গাইয়ে নিলেই। মনসা চাঁদের দ্বন্দ্ব, কালকেতু-ধনপতির উপর চণ্ডীর অহেতুক নির্যাতন ও অনুকম্পা, লাউসেনের সৌভাগ্য, ঈছাই ঘোষের বিপর্যয় প্রভৃতি এরই ফল। কবিরাও স্বপ্নদিষ্ট হয়ে মহিমা কীর্তনে তৎপর হয়েছেন। পাঠক-শ্রোতাও বংশনিপাতের ভয়ে শ্রদ্ধা নিয়ে পঠন-শ্রবণে মনোযোগী হয়েছে। এমনি করে উচ্চবর্ণের লোকেরা লৌকিক দেবতার কাছে হার মেনেছে। বাঙলা সাহিত্যের বারোআনা রচনাই নিয়োজিত হয়েছে এই লৌকিক দেবতার প্রতিষ্ঠা প্রয়াসে।
