অতএব আদিকাল থেকেই দেখা যাচ্ছে কোনো বহিরারোপিত ধর্মমত বা জীবনাদর্শ বাঙলা দেশে টেকেনি, বাঙালি রা সবসময় নিজেদের জীবন-জীবিকার গরজমত ধর্মমত ইষ্টদেবতা এবং জীবনদর্শন তৈরি করে নিয়েছে। যখনই জীবন-জীবিকায় বিপর্যয় বা বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে তখনই বাঙালি নিজের পসন্দমতো দৈব আশ্রয় খুঁজেছে।
এতে বাঙালি চরিত্রের স্বরূপ ধরা পড়েছে। সাহিত্য মানুষের মানস-মুকুর। তাই সাহিত্য থেকেই জাতির অকৃত্রিম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পাওয়া সম্ভব। বাঙলা সাহিত্যে বাঙালি চরিত্রের যেরূপ প্রতিফলন হয়েছে, তাতে নানা বিরুদ্ধ-গুণের সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায়। ভাবপ্রবণতা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, ভোগলিপ্সা ও বৈরাগ্য, কর্মকণ্ঠা ও উচ্চাভিলাষ, ভীরুতা ও অদম্যতা, স্বার্থপরতা ও আদর্শবাদ, বন্ধন ভীরুতা ও কাঙালপনা প্রভৃতি দ্বান্দ্বিক গুণই বাঙালি চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।
আমাদের মধ্যযুগীয় পাঁচালি সাহিত্যে বিশেষ করে বাঙালি র এই চরিত্র–এই মানসই ফুটে উঠেছে। আমাদের সাহিত্যে তাই ইষ্ট-দেবতাই প্রধান হয়ে উঠেছেন। কারণ তিনি জীবন-জীবিকার অবলম্বন। তবু তার প্রাণপ্রাচুর্যের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে তার স্বধর্মে সুস্থিরতায়। বহিরাগত কোনো ধর্ম, কোনো নীতি-আদর্শ সে মনেপ্রাণে বরণ করে নেয়নি। সে তর্ক করে, যুক্তি মানে, কিন্তু হৃদয়ানুভূতি গোচর না হলে কিছুই গ্রহণ করে না। তাই সে মুখে বড় বড় বুলি আওড়ায় কিছু আচরণে প্রয়োজনকেই কেবল স্বীকৃতি দেয়।
ভাবপ্রবণ বলেই বাঙালি মুখে আদর্শবাদী ও বৈরাগ্যধর্মী, কিন্তু প্রবৃত্তিতে সে আধ্যাত্মবাদীর ভাষায় বস্তুবাদী, গণভাষায় জীবনবাদী এবং নীতিবিদের ভাষায় ভোগবাদী। এজন্যেই নৈরাশ্য ও নিরীশ্বরবাদী নির্বাণকামী বৌদ্ধধর্ম বাঙালি স্বীকার করে নিলেও বৌদ্ধচৈত্য হয়ে উঠেছিল দেবদেবীর আখড়া।
বৌদ্ধযুগে নির্বাণের জন্যে নয়–অমরত্বরও চিরসুখের প্রত্যাশায় সুকঠোর যোগতান্ত্রিক সাধনার মাধ্যমে দৈবশক্তিধর হয়ে নিশ্চিন্তে ও নির্বিঘ্নে জীবনোপভোগের প্রয়াসী হয়ে উঠল বাঙালি। মহাজ্ঞান, তুকতাক, ডাকিনী-যোগিনী প্রভৃতির দ্বারা সিসম ফাঁক আয়ত্ত করে খিড়কীদের দিয়ে জীবনের ভোগ্য সম্পদ আহরণের অপপ্রয়াসই তাদের কর্মাদর্শ বা জীবনের লক্ষ্য হল। যোগ ও সাংখ্য–এই দুই অনার্য দর্শনজাত যোগতান্ত্রিক সাধনাই হল একশ্রেণীর লক্ষ্য। এরই নমুনা পাচ্ছি। চর্যাগীতিতে।
পাল আমল এমনি করেই কাটল। আবার সেন আমলে যখন ব্রাহ্মণ্যধর্ম প্রসার লাভ করে তখন বাঙালি বাহ্যত ব্রাহ্মণ্য মতবাদ গ্রহণ করল। কিন্তু মায়াবাদ, পরব্রহ্মপ্রীতি, জীবাত্মা পরমারাত্মার রহস্য প্রভৃতিতে তার কোনো উৎসাহ ছিল না। তাই নিজের জীবনের নিরাপত্তা ও ভোগের দেবতা সৃষ্টি করে সে আশ্বস্ত হয়। এভাবে সে চণ্ডী, মনসা, শীতলা, ষষ্ঠী, শনি, লক্ষ্মী, সরস্বতী প্রভৃতি দেবতার পূজা দিয়ে জীবন ও জীবিকার ব্যাপারে হয় নিশ্চিত। জয়দেবের গীতগোবিন্দই প্রমাণ করে যে, এ সময় বৈষ্ণব মতবাদও জনপ্রিয় হয়ে উঠে, যদিও ব্রাহ্মণ্যবাদ দৃঢ়মূল করবার জন্যে সমাজকাঠামো স্থায়ীভাবে তৈরি করবার প্রয়াসে সেন রাজারা উচ্চবর্ণের লোক আমদানি করে কৌলীন্যপ্রথা প্রবর্তনে তৎপর হয়ে ওঠেন।
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই লৌকিক দেবতারা তার পরলৌকিক মুক্তির কিংবা আত্মিক বা আধ্যাত্মিক জীবন উন্নয়নের কোনো ব্যবস্থা করতে পারেন না। ডক্টর আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেন, সেন-রাজাদিগের সময় হইতেই ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতি সাধারণের মধ্যে বিস্তৃত হইতেছিল সত্য, কিন্তু এতকালের একটা দেশীয় ধর্ম-সংস্কৃতিও–যাহা জাতির একেবারে মজ্জাগত হইয়া পড়িয়াছিল–মুখ্যত না হউক গৌণত হইলেও এই সমাজ-দেহেই রহিয়া গেল। সেকালের বাঙালি হিন্দুর সামাজিক জীবনের এই সন্ধিযুগে, দেশীয় প্রাচীন সংস্কার ও ব্রাহ্মণ্যধর্মের নতুন আদর্শ–এই উভয়ের সংঘাত মুহূর্তে বাঙলা পুরাণ ও মঙ্গলকাব্যগুলি সর্বপ্রথম আত্মপ্রকাশ করিয়াছিল। তাহারা (বাঙালি রা) নূতনকে (ব্রাহ্মণ্যধর্মকে) যেভাবে গ্রহণ করিল, তাহা পুরাতনেরই রূপান্তর মাত্র হইল। এই দেশীয় প্রচলিত ধর্মসংস্কারই যুগোচিত-পরিমার্জনা মাত্র লাভ করিয়া সমাজের অন্তঃস্থলে প্রচ্ছন্নভাবে বিরাজ করিতে লাগিল। মঙ্গলকাব্যগুলি এই নূতন ও পুরাতনের মধ্যে সুন্দর সামঞ্জস্য বিধান করিয়া দিয়া পরস্পরমুখী দুইটি সংস্কারকে একসূত্রে গাঁথিয়া দিবার চেষ্টা করিয়াছে। বাঙলার জলবায়ুতে দেশীয় লৌকিক সংস্কারের সহিত ব্রাহ্মণ্য সংস্কার যে কীভাবে একদেহে লীন হইয়া আছে, মঙ্গলকাব্যগুলি পাঠ করিলে তাহাই জানিতে পারা যায়। ….. তাহারই ফলে বর্তমান বাঙলার। হিন্দুসমাজের পঞ্চোপাসক হিন্দুসম্প্রদায়ের সৃষ্ঠি।
একই কারণে ইসলামোত্তর যুগে বিশেষত মুঘল আমলে বাঙলাদেশে হিন্দুর পুরোনো দেবতা ও ইসলামের নির্দেশকে ছাপিয়ে ওঠেন সত্যপীর-সত্যনারায়ণ, বনদেবী-বনবিবি, কালুগাজী কালুরায়, বড় খাঁ গাজী-দক্ষিণরায়, ওলাবিবি-শীতলা প্রভৃতি জীবন ও জীবিকার এবং নিরাপত্তা ও কল্যাণের ইষ্ট ও অরিদেবতা। মধ্যযুগে চৈতন্য প্রবর্তিত প্রেমধর্ম এবং গত শতকের রামমোহন প্রচারিত ব্রাহ্মমত এবং শিক্ষিত সাধারণের পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শনানুগত্য বাঙালি র এই বন্ধনমুক্ত মনোভাবের ধারা অব্যাহত রেখেছে। অতএব কোনো বৃহৎ ও মহতের সাধনা বাঙালি র কোনোকালে ছিল না। সে একান্তভাবে জীবনসেবী ও ভোগবাদী। এ ব্যাপারে সে আত্মপরমাত্মাকে তুচ্ছ জেনেছে, স্বর্গ-নরককে করেছে অবহেলা। বৈষ্ণব সমাজের বিকৃতিও এই একই মানসের ফল। এ কারণে বাঙলার সংস্কৃতি চিরকালই পনেরো আনা বাঙালি সংস্কৃতি। চন্দ্ৰশাসনে ও পাল আমলে বৌদ্ধদের যোগতান্ত্রিক সাধনায় আগ্রহের প্রমাণ মেলে চর্যাগীতিতে, ডাকিনী ও যোগিনীর কিংবদন্তিতে, ময়নামতি-মাণিকাদ-গোপীচাঁদ গাথায়, গোরক্ষ-বিজয় প্রভৃতি পাচালিতে এবং যোগীপাল, মহীপাল, ভোগীপাল গীতির ঐতিহ্যে। [যোগী, মহী ও ভোগী নামেতেই রূপকাশ্রিত তত্ত্ব-সিদ্ধান্তের আভাস রয়েছে।]
