একটু বাদেই ছেলে-সহ দিদি এ-ঘরে এলো। তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যস্ত হয়ে বলল, তুমি দাঁড়িয়েই আছ এখনো, বোস বোন, বোসোতোমার কিছু ভাবনা নেই, নিজের দিদির কাছেই এসে পড়ছে ভাবো। সাগ্রহে আবার আপাদ-মস্তক দেখে নিল, তারপর মুখের দিকে চেয়ে হেসে বলল, কিন্তু দিদি হলেও গরীব দিদি, তোমার কষ্ট হবে।
সমস্ত দিনের দুশ্চিন্তার পর এই কথাগুলো যশোমতীর ভালো যেমন লাগল, লজ্জাও তেমনি পেল। দারিদ্রটা যে যশোমতীর চোখে বেশ বড় হয়ে ধাক্কা দিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। অল্প হেসে বলল, কষ্ট হবে না।
আর একবার তার ঝকমকে গয়নাগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে দিদি বলল, হলেই বা আর কি করবে বলে? এক কাজ করো, কুয়োতলা থেকে একেবারে হাত-মুখ ধুয়ে কাপড় বদলে ঠাণ্ডা হয়ে বসে। খিদেও পেয়েছে নিশ্চয়, রাত না করে আগে খেয়ে নাও তারপর কথা হবে। আমার সঙ্গে এস–
লণ্ঠন তুলে নিয়ে থমকালো।–ও, তোমার তো ব্যাগও চুরি হয়ে গেছে, পরবেই বা কি…আমার তো সবই থান!
যশোমতী তাড়াতাড়ি বলল, এইটেই পরব’খন, আপনি ব্যস্ত হবেন না!
দিদির মনঃপুত হল না, বল, রাস্তার কাপড়, তাছাড়া এই ভাল শাড়িটা নষ্ট হবে
যশোমতী বলতে পারল না এটা তার ভালো শাড়ির মধ্যে গণ্য নয়। তবু যাহোক কিছু বলার আগেই মহিলা এক কাণ্ড করে বসল। এ-ঘরে দাঁড়িয়েই ডাক দিল, শঙ্কর! ওরে শঙ্কর, তুই যা তো, ও-বাড়ির বাচ্চর মায়ের কাছ থেকে একটা ধোয়া শাড়ি চেয়ে আন চট্– করে-হাত-মুখ ধুয়ে এসে মেয়েটা পরবে কি!
হুকুম শুনে যশোমতী তটস্থ। ফলাফল পরক্ষণেই দেখল। গম্ভীর মুখে শঙ্কর দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। যশোমতী মুখ দেখেই বুঝল দিদির ওপর চটেছে।
–সমস্ত দিন বাদে এসে এই রাতে এখন আমি আধ মাইল রাস্তা শাড়ি আনতে ছুটব?
দিদি বলল, তোর সবেতে বেশি-বেশি, সবে তো সন্ধ্যে পার হল, আর এখান থেকে এখানে আধ মাইল হয়ে গেল! যাবি আর আসবি, একটা শাড়ি না পেলে ও পরবে কি?
শঙ্কর সারাভাই সাফ জবাব দিল তোমার যা আছে তাই দাও। আমি এখন যেতে পারব না।
যশোমতী ব্যস্ত হয়ে আবারও কি বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু অবকাশ পেল না। মুখের কথা মুখে থেকে গেল, তার আগেই দিদিটি ক্রুদ্ধ। মেয়েটা বাড়িতে এলো, আর আমি তাকে থান পরতে দেব। কোনো কাণ্ডজ্ঞান আছে তোর? নিজে না যাস, বিহারীকে পাঠা, আমার নাম করে একটা ধোয়া শাড়ি চেয়ে আনে যেন।
যশোমতী সশঙ্কে তাকাল দরজার দিকে, অর্থাৎ দরজার ওধারে যে দাঁড়িয়ে আছে তার দিকে। এবারে তাকেই দু’কথা শোনাবে কিনা কে জানে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল, রাজ্যের বিরক্তি সত্ত্বেও সে আর দ্বিরুক্তি না করে পায়ে পায়ে প্রস্থানই করল।
একটু চুপ করে থেকে বিব্রত মুখে যশোমতী বলল, আমি সেই থেকে খুব অসুবিধে করছি
দিদির সাধাসিধে কথাগুলো সত্যি মিষ্টি। বলল, অসুবিধে আবার কি! তুমিই কি কম অসুবিধেয় পড়েছ! মুখের দিকে চেয়ে থমকালো একটু, শঙ্কর কিছু বলেছে বুঝি? বকা-ঝকা করেনি তো? ওর কথায় তুমি কান দিও না, ওর ওই রকমই মেজাজ–তার ওপর নড়বড়ে ব্যবসা নিয়ে নাজেহাল হয়ে হয়ে মনটা বিগড়েই আছে। নইলে এমনিতে কারো কষ্ট দেখতে পারে না।
খাওয়া-দাওয়ার পর যশোমতী ঠাণ্ডা হয়ে সুস্থ মাথায় একটু চিন্তা করবে ভেবেছিল। ব্যাগটা চুরি গিয়ে তার ভাবনা কত যে বাড়িয়ে দিয়েছে ঠিক নেই। ওটা সঙ্গে থাকলে আর কিছু না থোক, কথায় কথায় এরকম মর্মান্তিক লজ্জাকর পরিস্থিতিতে পড়তে হত না। শঙ্কর সারাভাইয়ের দিদি ওদিকে খাবার ব্যবস্থা করতে গেছে। যশোমতীর মনে হল দেরি হচ্ছে। মুখ হাত ধোয়া হয়েছে। শাড়িও একটা হয়েছে। এখন তার রীতিমত খিদে পেয়ে গেছে। ফলে আরো খারাপ লাগছে। কিন্তু ঘড়ির দিকে চেয়ে অবাক। রাত মাত্র সাড়ে সাতটা। মনে হচ্ছিল অনেক রাত হয়েছে।
দরজার দিকে চোখ পড়তে সচকিত হল। সেখানে দাঁড়িয়ে গভীর এবং গম্ভীর মনোযোগে তাকে লক্ষ্য করছে পাঁচ বছরের ক্ষুদ্রকায় মূর্তি। রাজু। ভিতরে ঢুকতে খুব ভরসা পাচ্ছে না, কারণ এই একজনকে উপলক্ষ করেই তার কিছু অপমানের কারণ ঘটেছে। নতুন মানুষ দেখেই মায়ের উদ্দেশে ও ভাবে হাঁক দেবার ফলে মামা হঠাৎ এরকম তেড়ে মারতে আসতে পারে-কল্পনাও করেনি। মামা যে রকম মেজাজেই থাকুক না কেন তার সঙ্গে অন্তত এত খারাপ ব্যবহার কখনো করে না। অতএব কৌতূহল সত্ত্বেও সে খুব ভরসা করে অপরিচিতার কাছে এগিয়ে যেতে পারছে না। যদিও ইচ্ছে বেশ করছে, কারণ তার বিবেচনায় কাছে আসার মতোই লোভনীয় মনে হচ্ছে।
এমন এক পরিবেশে এসে পড়ে যশোমতীরও মুখ খুলতে সঙ্কোচ। কিন্তু ছেলেটা ভারী সুন্দর। দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে। মুখ না খুলে হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। কিন্তু মনস্থির করে ছেলেটা তবু কাছে এগোতে পারল না। মামা ধারে কাছেই আছে, টের পেলে এসে দু’ঘা বসিয়েই দেবে কিনা ঠিক কি।
যশোমতী উঠে এসে হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে গেল। চৌকির ওপর বসালো। নিজেও বসল।
কি দেখছিলে?
তোমাকে….
আমাকে কেন দেখছিলে?
কথায় ছেলে চটপটে বেশ। জবাব দিল, মা আমাকে বলছিল, তুমি খুব সুন্দর দেখতে।
তক্ষুনি আলাপের প্রসঙ্গ ঘোরাল যশোমতী। তোমার নাম কি।
রাজু। তোমার নাম?
যশোমতী আবার মুশকিলে পড়ল। একটু ভেবে বলল, আমার নাম মাসি।
