খুব মনঃপূত হল না যেন। ভয়ে ভয়ে যেন যাচাই-ই করে নিতে গেল।মামী না?
চকিতে দরজার দিকে একবার তাকিয়ে যশোমতী মাথা নাড়ল।-না।
আর একবার তাকে দেখে নিয়ে রাজু মন্তব্য করল, মা তো বলে মামা মামী আনবে। বিহারীকাকাও বলে–
ছেলেটার মাথায় ‘মামী’ ঢুকে আছে। যশোমতী সঙ্কোচ বোধ করছে আবার। কানে লাগছেও কেমন। সকালে সেই বাসের থেকে এ পর্যন্ত ভদ্রলোক উপকার কম করল না। তার মেজাজের দিকে না চেয়ে কৃতজ্ঞ থাকাই উচিত। যশোমতী অকৃতজ্ঞ নয়। বাড়িতে কেউ তাকে এভাবে চোখ রাঙালে বা ও-রকম করে তার সঙ্গে কথা কইলে হাতে মাথাই কাটত। তার সঙ্গে এ-রকম ব্যবহার করার কথা কেউ কল্পনাই করতে পারে না। কিন্তু তবু যশোমতী তেমন রাগ করেনি লোকটার ওপর, রাগ হলেও তা চাপতে চেষ্টা করেছে, আর কৃতজ্ঞ বোধ করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু পাঁচ বছরের শিশুর মুখেও এ-রকম অসম্ভব সম্পর্কের কথা শুনে সে অস্বস্তি বোধ করছে।….কালচারের ছিটে-ফোঁটা নেই লোকটার, সামান্য চক্ষুলজারও বালাই নেই, ব্যবসা বলতে দিন আনে দিন খায় গোছের কিছু করে হয়তো। অবস্থা অনেকেরই খারাপ হতে পারে, কিন্তু ব্যবহার যা–ইস্কুল-কলেজের মুখ দেখেছে কিনা কোনদিন সন্দেহ।
পাঁচ বছরের শিশুও ওই গোছের একটা সম্পর্ক কল্পনা করলে অস্বস্তি।
আলাপ আর জমার অবকাশ পেল না। খাবার ডাক পড়ল। দিদি নিজেই এসে ডেকে নিয়ে গেল।
সামনের বারান্দার মেঝেতে তিনটে জায়গা করা হয়েছে দুটো হারিকেন। শঙ্কর পিঁড়িতে বসে আছে। হাব-ভাব নরম একটু। সদয় মুখে ভাগ্নেকে ডাকল, আয়–
এই আলোয় আর এ-রকম মেঝেতে বসে খেতে হবে যশোমতীর সেটা তেমন খেয়াল ছিল না। বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে নেমন্তন্ন উপলক্ষে মেঝেতে বসে হয়তো দু-চারদিন খেয়েছে, কিন্তু এ-রকম আলোয় খেতে বসার অভিজ্ঞতা নেই। বারান্দার চারদিকে যতদূর চোখ যায় অন্ধকার বলেই দুটো হারিকেনের আলোও একেবারে নিষ্প্রভ ঠেকছে।
তার মুহূর্তের দ্বিধা লক্ষ্য করেই দিদি জিজ্ঞাসা করল, শঙ্করের সামনে বসে খেতে তোমার লজ্জা করবে নাকি? আর তো জায়গা নেই আমাদের, একসঙ্গে না বসলে তো দেরি হয়ে যাবে–সেই কখন খেয়ে বেরিয়েছ।
যশোমতী তাড়াতাড়ি বসে পড়ে বাঁচল। দিদি নিশ্চিন্ত মনে খাবার আনতে গেল। যশোমতী লক্ষ্য করল, ওদিকে মামা-ভাগ্নের। মধ্যে নিঃশব্দে খোঁচাখুচি লেগে গেছে। ভাগ্নের মান ভাঙাবার চেষ্টায় মামা এক-একবার তার গায়ে হাত রাখতে চেষ্টা করছে, নয়তো পিঠে একবার আঙুলের খোঁচা দিয়ে অন্য দিকে তাকাচ্ছে। আর ভাগ্নে ছোট্ট শরীরটাকে ঝাঁকিয়ে বা কুকড়ে মামার সঙ্গে অসহযোগ ঘোষণা করছে, নয়তো হাত দিয়ে আমার হাত ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। সমস্ত দিন বাদে বাড়িতে ঢুকেই মামা তাকে রীতিমত অপমান করেছে, এখন সাধাসাধি করলেও সে এত সহজে ভাব করতে রাজি নয়।
যশোমতীর ভালো লাগছে। ভালো লাগছে কারণ, লোকটার রুক্ষ মুখে হাসির আভাস এই বোধহয় প্রথম দেখল।
দিদি খাবার নিয়ে এলো। মোটা মোটা চালের লালছে ভাত। আর তরকারীর চেহারা দেখেও ভিতরে ভিতরে আবার অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে যশোমতী। ভব্যতা জ্ঞান তার যথেষ্ঠই আছে, কিন্তু হাতে তুলে এই সব গলাধঃকরণ করবে কি করে ভেবে পাচ্ছে না।
কিন্তু খাওয়া শুরু করতেই অন্যরকম। খিদের মাথায় মনে হল অমৃত খাচ্ছে। এই চেহারার ভাত-ডাল-তরকারী এরকম উপাদেয় কি করে হয় সে ভেবেই পেল না। তবু তার খাওয়ার ধরন-ধারণ দেখে দিদিটির বোধহয় খটকা লাগার কারণ ঘটল কিছু। খানিক লক্ষ্য করে শেষে বলেই ফেলল, তোমার বোধহয় অসুবিধে হচ্ছে খুব, আমাদের এইরকমই খাওয়া-দাওয়া।
যশোমতী তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল। অর্থাৎ, একটুও অসুবিধে হচ্ছে না। ওদিক থেকে তার ভাইটিও মাঝে মাঝে আড়চোখে তার খাওয়া লক্ষ্য করছে। পুরুষের সঙ্গে বসে খেতে বা খাওয়া নিয়ে হৈ-চৈ করতে কোনদিন এতটুকু সঙ্কোচ বোধ করেনি যশোমতী। সঙ্কোচের অনুভূতিটা এই প্রথম।
খানিক বাদেই ভাই-বোনের কথাবার্তার মোড় একেবারে অন্যদিকে ঘুরে গেল। আর তাই শুনে যশোমতী অবাক মনে মনে। বাইরের একজনের সামনে যে প্রসঙ্গ তোলাটাও অস্বাভাবিক, সেই প্রসঙ্গ নিয়েই ভাই-বোনে বলতে গেলে কথা-কাটাকাটিই হয়ে গেল একপ্রস্থ। যশোমতীর মনে হল, দিদিটিরও মেজাজপত্র কোনো কোনো ব্যাপারে তার ভাইয়ের ওপর দিয়ে যায়। এই এক বিষয়ে অন্তত ভাই-বোনের প্রগাঢ় মিল। কে আছে কাছে বা কে শুনছে এ নিয়ে চক্ষুলজ্জার বালাই নেই। মেজাজ চড়লে ভব্যতার এই দিকটার প্রতি তারা সচেতন নয় একজনও।
কি মনে পড়তে আহাররত ভাইয়ের দিকে চেয়ে দিদি হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, হা রে, একরাশ মালপত্র নিয়ে এলি, তার ওপর দেরাজে আবার অতগুলো টাকা রাখলি দেখলাম, রায়ার তাড়ায় জিজ্ঞেস করতে মনে ছিল না। অনেকগুলো টাকাই তো মনে হল–এত টাকা হঠাৎ পেলি কোথায়?
যশোমতী লক্ষ্য করল, ভাইয়ের মুখে হঠাৎ বিরক্তির ঘন ছায়া পড়েছে। প্রসঙ্গটা অবাঞ্ছিত বোঝা গেল। মুখ তুলে একবার, তার দিকে তাকালো সে। তারপর খেতে খেতে ক্ষুদ্র জবাবে প্রশ্নের ইতি টানতে চাইল।–যোগাড় করেছি।
দিদি শঙ্কিত। যোগাড় করেছিস! গলাকাটা সুদে আবার ধার-ধোর করিসনি তো কোথাও থেকে? সেবারের কথা মনে হলে আমার এখনো গা কঁপে।
