–আপনার নাম কি? এবারের প্রশ্ন যশোমতীর।
–শঙ্কর–শঙ্কর সারাভাই।
–আপনি এখানে চাকরি করেন বুঝি?
না, ব্যবসা।
যশোমতীর মনে পড়ল, তার মালপত্রর সঙ্গে একরাশ সুতোও দেখেছে। তাই কিসের ব্যবসা জানার কৌতূহলও হল। কিন্তু ভরসা করে জিজ্ঞাসা করতে পারল না, কারণ যেটুকু জবাব দিয়েছে তাতেই বিরক্তি লক্ষ্য করেছে। অথচ ওর বেলায় যেন পুলিসের জেরা শুরু করে দিয়েছিল।
০৭. টালির ঘরের বাড়ি
পাশাপাশি দুটো টালির ঘরের বাড়ি। ঘরের মেঝে শুধু সিমেন্টের। মাটির দেয়াল। সামনে উঠোন। উঠোন পেরুলে ফ্যাক্টরি। ফ্যাক্টরি বলতে টিনের চালার বড় ঘর আর একটা। তাতে গোটা দুই পুরনো তাত, ঝরঝরে পাওয়ার মেশিন একটা, আর তেমনি কুড়িয়ে পাওয়া গোছের আনুষঙ্গিক কিছু সরঞ্জাম। অন্ধকারে ভয়ে ভয়ে চারদিকে তাকিয়ে নবাগতা শুধু ঘর ক’টাই দেখল।
দু ঘরের একটা ঘরে যশোমতীকে ঢুকিয়ে দিয়ে দিদিকে নিয়ে এদিকের ঘরে এলো শঙ্কর। ভাইয়ের সঙ্গে হঠাৎ এ-রকম সুশ্রী একটা মেয়েকে দেখে দিদি অবাক। তার থেকে আরো বেশি অবাক বোধহয় পাঁচ বছরের ভাগ্নেদেবরাজ ওরফে রাজু। মামাকেসে-ই আগে দেখেছে। তার সঙ্গে রমণীমুর্তি দেখে সে-ই আগে হতভম্ব হয়েছে। কিন্তু চিন্তাশক্তি তার রীতিমত চটপটে। প্রথমে যা মনে এলো তাই অবধারিত সত্যি ধরে নিল। মায়ের কাছে যেমন শোনা ছিল, অর্থাৎ মামার ঘরে একজনেরই আসতে বাকি–সে মামী। সেটাই সে ভেবে নিয়েছে তৎক্ষণাৎ। চোখ বড় বড় করে আগে যশোমতীকে দেখেছে একটু, তারপরেই ঘুরে মায়ের উদ্দেশে চিৎকার।মা! দেখো এসে–মামা মামী নিয়ে এসেছে।
মামার মেজাজ এমনিতেই সপ্তমে চড়া। ভাগ্নের এরকম উত্তেজিত এবং উল্লসিত অভ্যর্থনার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিল না সে। চিড়বিড় করে উঠেছে সঙ্গে সঙ্গে।–দেব এক চড়ে মুণ্ডু ঘুরিয়ে, যা বেরো এখান থেকে।
মামার উগ্র মূর্তি দেখে ছেলেটা সভয়ে দুপা সরে গেল। তারপর ফ্যালফ্যাল করে অপরিচিতার দিকে চেয়ে রইল। মামার এ-রকম ক্ষেপে ওঠার মতো অন্যায়টা কি করল, বোঝার চেষ্টা। যশোমতী হতচকিতের মতো দাঁড়িয়ে গেছে। সমস্ত মুখ লাল। ফুটফুটে হতভম্ব ছেলেটাকে হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিতেও ইচ্ছে করেছে। কিন্তু ভরসা করে পারেনি।
দিদি ছেলের ডাক শুনে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে ততক্ষণে। বিধবা। যশোমতীকে দেখে তারও বিস্ময়ের সীমা-পরিসীমা নেই। শঙ্করের তাতেও বিরক্তি। জীবনে মেয়ে যেন এই প্রথম দেখল।
ভালো করে আর একবার দেখে নিয়ে বিস্ময় সামলে দিদি অনুচ্চ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, কে…?
বলছি। যশোমতীর দিকে ফিরে শঙ্কর বলল, আপনি ওই ঘরে গিয়ে বসুন–
বসতে বলার এই সুরটাও আর যাই হোক খুব সদয় আপ্যায়নের মতো নয়। দ্বিধান্বিত পায়ে যশোমতী দরজার পাশে জুতো খুলে সামনের ঘরে ঢুকে থমকে দাঁড়াল। ঘরে ইলেট্রিক নেই। এক কোণে একটা ছোট লণ্ঠন জ্বলছে। রাতে সাদাটে আলো দেখা অভ্যস্ত চোখ বড় বড় হয়ে উঠেছে। এই আলো ঘরের অন্ধকার দূর করলেও যশোমতীর অস্বস্তি বাড়িয়েছে।
দিদিকে নিয়ে শঙ্কর পাশের ঘরে এলো। দু ঘরের মাঝের দেয়াল আর ছাদের মধ্যে দু হাত প্রমাণ ফাঁক। অর্থাৎ, দেয়ালটা একটাই বড় ঘরের পার্টিশনের মতো। ও-ঘরের কথা এ-ঘরে স্পষ্টই শোনা গেল। যশোমতী শোনার জন্য কান পেতেছেও। আর ও-ঘরে কথা যে বলছে, সে আর কেউ শুনছে কি না-শুনছে সেই পরোয়াও করে না বোধহয়।
অল্প দু-চার কথায় দাদার বাড়ি ছেড়ে মেয়েটার চাকরির চেষ্টায় আসার ইতিবৃত্তি শেষ করল শঙ্কর। বুদ্ধি থাকলে কেউ এভাবে আসে না সেই মন্তব্যও জুড়ল। একা পথে-ঘাটে বেরোয় নি, বাসে ব্যাগ হারানোটাই তার প্রমাণ–সেই মতও ব্যক্ত করল। তারপরেই নিজের লোকসানের খেদ। দেখা হওয়ার পর থেকে শুধু খরচাই যে হয়েছে, এমন কি খবরের কাগজটাও যে খোয়া গেছে, সেই বিরক্তিও গোপন থাকল না। বলল, বাসের টিকিট কেটে দিয়েছি, ট্রেনের টিকিট কেটেছি আর জরিমানা দিয়েছি, তারপর রিকশা ভাড়া দিয়ে সমস্ত পথ হেঁটে এসেছি-বুঝলে?
দিদির বরং সন্ত্রস্ত চাপা গল কানে এলো যশোমতীর, চুপ কর, শুনতে পাবে যে! ভদ্রলোকের মেয়ে বিপদে পড়েছে, খরচা হয়েছে হয়েছে।
ফলে পুরুষকণ্ঠ আরো চড়ল, শুনতে পাবে তার কি, আমি কি মিছে কথা বলছি।
এ-ঘরে দাঁতে করে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে যশোমতী। সামনে একটা চৌকিতে বিছানা পাতা। ক্লান্ত লাগলেও বসেনি।
আরো কানে এল। দিদি বলছে, আ-হা, মুখখানা বড় সুন্দর, বেশ বড় ঘরের মেয়েই মনে হয়, ভাইটা চণ্ডাল ছাড়া আর কি। যশোমতীর মুখ লাল, বাসের ব্যাগ চোরকেই আর এক দফা ভস্ম করতে ইচ্ছে করছে তার। দিদি বলে চলেছে, রাজুর হাঁক শুনে আর দেখে আমি তত আকাশ থেকে পড়েছিলাম। বড়লোক ভাই-ভাজের কি-রকম না জানি ব্যবহার নইলে এভাবে বাড়ি থেকে বেরোয়।…. তার ওপর কত রকমের লোক আছে সংসারে, তুই না সেদিন কার কথা বলছিলি, কে এক ব্যবসাদার নিজের ভাইঝিকেসুদ্ধ টেনে এনে কারবারের চটক বাড়াচ্ছে আর বড় বড় লোকদের হাত করছে এও কি ব্যাপার কে জানে, মেয়েটি খুব ভাল না হলে এভাবে বেরিয়ে আসবে কেন? কে ভাই, কি-রকম ভাই তুই খোঁজ-টোজ করেছিলি?
দিদির গলা এবং সমস্ত বক্তব্য খুব কান খাড়া করেই শুনতে এবং বুঝে নিতে হয়েছে যশোমতীকে। শুনে ভুরু কুচকেছে, মুখও আর এক দফা লাল হয়েছে। কিন্তু তবু ওই দিদিটিকে বেশ সরলই মনে হয়েছে তার।
