সঙ্গে সঙ্গে যশোমতী জিজ্ঞাসা করল, আপনার বাড়িতে কে আছেন?
বিরক্ত মুখে কিছু বলতে গিয়েও শঙ্করের খেয়াল হল, এই বয়সের মেয়ে অপরিচিত লোকের বাড়ি যাচ্ছে, খোঁজ নেওয়াই স্বাভাবিক।
–দিদি আছে, আর বাচ্চা ভাগ্নে আছে।
দিদি আছে শুনে খানিকটা নিশ্চিন্ত যশোমতী।–আর কেউ নেই?
আর বিহারী আছে–পুরনো চাকর।….আপনি স্কুলে কাজ পাবেন জেনে এসেছেন, না কাজের চেষ্টায় এসেছেন?
ঢোঁক গিলে যশোমতী জবাব দিল, চেষ্টায়….
স্কুলের যারা চাকরি দেবার মালিক তারা আপনাকে এসে দেখা করতে লিখেছিল?
-না….মানে, আমার এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম এসে চেষ্টাচরিত্র করলে কাজ হতে পারে….এসে গেলাম। আপনার তাদের সঙ্গে চেনা-জানা আছে?
জবাব পেল না। আবছা অন্ধকার সত্ত্বেও যশোমতীর মনে হল লোকটার চোখে কিছু সংশয় ঘন হয়ে উঠেছে।
দুই-এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে শঙ্কর হঠাৎ আবার জিজ্ঞাসা করল, কোথায় থাকবেন ঠিক না করেই অজানা অচেনা জায়গায় দেখা-সাক্ষাৎ করতে বেরিয়ে পড়েছেন? এখানে আসতেই সন্ধ্যে হয়ে যাবে আপনি জানতেন না?
রিকশা থেকে না নামলেই ঠিক হত বোধহয়। মিথ্যে বলা অভ্যেস নেই যশোমতীর। দরকারও হয়নি কখনো। মিথ্যে কেউ বললে সে তাকে ঘৃণাই করত। কিন্তু ইচ্ছে না থাকলেও মিথ্যে না বলে পারা যায় না এ কে জানত। প্রাণের দায়ে অম্লানবদনে মিছে কথা বলার জন্যেই প্রস্তুত হল সে।
প্রথমে মাথা নাড়ল, সন্ধ্যা হবে জানতাম না। তারপর অস্ফুট বিশ্বাসযোগ্য সুরেই বলল, এ-রকম অবস্থায় পড়ে যাব ঠিক ভাবিনি।
–স্কুলে দেখা করে কাল ফিরে যাবেন?
–চাকরি না হলে তো ফিরতেই হবে, তবে ঠিক ফেরার ইচ্ছে ছিল না….এখানে না হলে আবার অন্য কোথাও চেষ্টা করতে চলে যাব ভেবেছিলাম। অত ভিড়ের মধ্যে বাসে ব্যাগটা চুরি হয়ে গিয়েই সব গণ্ডগোল হয়ে গেল।
ঘাড় ফিরিয়ে শঙ্কর সারাভাই খপ করে আবার জিজ্ঞাসা করে বসল, ব্যাগে আপনার কত টাকা ছিল?
পা-পাঁচ-পাঁচশো। পাঁচ হাজার বলতে গিয়েও কোন রকমে সামলে নিয়ে পাঁচশো বলল। এমনিতেই অবিশ্বাস উঁকিঝুঁকি দিয়েছে বুঝতে পারছে, পাঠশালার চাকরি পাবার আশায় পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বেরিয়েছিল শুনলে সঙ্গে সঙ্গে আবার হয়তো স্টেশনের রাস্তাই ধরতে বলবে তাকে। পাঁচশো টাকা বলার ফলেই প্রায় সেই গোছের মুখ।
পাঁচশো টাকা সঙ্গে নিয়ে এখান থেকে এখানে আপনি চাকরির চেষ্টায় এসেছিলেন?
–ব-বললাম তো আর ফেরার ইচ্ছে ছিল না–যা ছিল সব নিয়ে বেরিয়েছিলাম। চুপচাপ কয়েক মুহূর্ত। পরের প্রশ্ন শুনে প্রায় আঁতকেই উঠল যশোমতী।
বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছেন?
-পা-পালাব মানে! যশোমতী রেগেই গেল।–পালাতে যাব কেন, বনিবনা হচ্ছিল না, চলে এসেছি। বলে এসেছি, নিজের রাস্তা নিজে দেখে নেব, আর ফিরব না।
ইচ্ছে করেই এতটা বলল যশোমতী। এই বলার ফলে আখেরে সুবিধে হতে পারে।
আবার গভীর প্রশ্ন।– বাড়িতে কে আছে? কার সঙ্গে বনিবনা হয়নি।
ভিতরে ভিতরে নাজেহাল যশোমতী। তবু জিজ্ঞাসাবাদের ফয়সালা এখানেই যে হয়ে যাচ্ছে, সেটা এক পক্ষে ভাল। অজানা অচেনা বাড়িতে গিয়ে ওঠার পর সকলের জেরার সামনে পড়তে হলে আরো বিতকিচ্ছিরি ব্যাপার হবে।
–দা-দাদার আর দাদার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আর বউদির সঙ্গে।
অন্ধকার ঘন হয়েছে। অদূরের রিকশাটাকেও আবছা দেখাচ্ছে। তবু পার্শ্ববর্তিনীকে আর একবার ভাল করে দেখতে চেষ্টা করল শঙ্কর সারাভাই।–আপনার দাদা অবস্থাপন্ন?
জেরার ফলেই মাথা খুলছে যশোমতীর। এক মুহূর্তেই মনে হল, তার যা বেশবাস, অবস্থাপন্ন না বললে বিশ্বাসযোগ্য হবে না। তৎক্ষণাৎ জবাব দিল, খুব। বড় অবস্থা বলেই তো মান বাঁচাতে সরে দাঁড়াতে হল।
যাক। এবারে জেরা শেষ হয়েছে মনে হল। আর মাথা খাঁটিয়ে যেভাবে জবানবন্দী দিল সে, খানিকটা বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে বলেও মনে হল তার।
–আপনার দাদা কি করেন?
ব্যবসা। এর পর আর কিছু জিজ্ঞাসা করলে রাগই হবে যশোমতীর।
-কিসের ব্যবসা?
ফের জেরার আগেই তড়বড় করে অনেক কথা বলে ফেলল যশোমতী। পাঁচ রকমের ব্যবসা, আমি অত খবর রাখিনে। মোট কথা তাদের ব্যবহারে সেখানে থাকতে আমার অপমান লাগছিল, তাই যা হোক একটা চাকরিবাকরি নিয়ে থাকব ঠিক করে চলে এসেছি। সেট। কি অন্যায় কিছু করা হয়েছে?
জবাব পেল না। ক্রমাগত মিথ্যে বলে যেতে হচ্ছে বলে রাগ হলেও ফলাফল তার অনুকূলেই যাচ্ছে মনে হল। এভাবে একা বাড়ি ছেড়ে আসার পিছনে একটা মোটামুটি স্বাভাবিক কারণ। উপস্থিত করা গেছে সন্দেহ নেই।
অনেকখানি নিশ্চিন্ত হবার পর যশোমতীর খারাপ লাগছে না। ভিতরে ভিতরে এখন বেশ মজাই লাগছে। বাড়ির দিদিটি কেমন কে জানে, বাড়িটা পছন্দ হলে আর নিরাপদ মনে হলে দু’-পাঁচ দিন থেকে গিয়ে সত্যিই হয়তো পাঠশালায় চাকরির চেষ্টাও করা যেতে পারে। যে ছাদে বাড়ি ছাড়ার গল্প ফাঁদা হয়েছে, ঠকবে না। আর চাকরি একটা পেয়ে গেলে কড়া-ক্রান্তিতে এই লোকের দেনা শোধ তো নিশ্চয় করবে।
….দেনা। দেনার অঙ্ক মনে হতে যশোমতীর হাসিই পেয়ে গেল। রিকশার ভাড়া ধরলেও এ-পর্যন্ত পাঁচ টাকা হবে না হয়তো। পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বেরিয়েছিল, এখন দেখছে পাঁচ টাকার দামও কম নয়। দুনিয়া দেখতে না বেরুলে এ-রকম অভিজ্ঞতা তার হত না ঠিকই।
