রিকশা ফেরাতে বলল।
সিঁড়ির পাশে রিকশা থামতে লাফিয়ে নেমে পড়ল।
যশোমতী নিশ্চল দাঁড়িয়ে। কিন্তু তার বুকের ভেতরটা গুড়গুড় করছে আবার।
–চলুন।
যশোমতী চেয়ে আছে।
যশোমতী চেয়েই আছে।
বিরক্তি চাপতে গিয়েও সেটা প্রকাশ হয়েই পড়ল—আপনাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে কিছুই নেই। বাসে ব্যাগ হারাবার পরেও ফিরে যাওয়ার কথাটা মনে হল না আপনার….দেখছেন কি, উঠুন রিকশায়।
পায়ে পায়ে নেমে এসে যশোমতী রিকশায় উঠল। আশ্রয় পাওয়ার পর দ্বিধা, ভাল করল কি মন্দ করল জানে না। যে সঙ্কটে পড়েছে, ভাল থোক মন্দ হোক কিছু একটা করতেই হবে। গাঁয়ের এই স্টেশনে রাত কাটাবার কথা ভাবতেও তার দম বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছিল।
সে বসার পর পাশে যেটুকু জায়গা থাকল, সেখানে কোনো অচেনা পরপুরুষের বসার প্রশ্ন ওঠে না। তবু সভয়ে তাকালে যশোমতী।
চল–। রিকশা চালাতে হুকুম করে শঙ্কর সারাভাই হনহন করে আগেই হেঁটে চলল। তারপর পিছন ফিরে বলল, মালগুলোর দিকে দয়া করে লক্ষ্য রাখবেন পড়ে-টড়ে না যায়, আর খেয়াল খুশিমতো কোনটা ফেলে দেবেন না আবার।
রিকশাওয়ালা আবার রিকশা তুলে নিল। হঠাৎ খুব হালকা আর খুব নিশ্চিন্ত লাগছে যশোমতীর। বিপদের থেকে আরো বিপদের মধ্যে পা বাড়ায় নি, এ আশ্বাস যেন নিজের ভিতর থেকেই পাচ্ছে সে। লোকটার নাম পর্যন্ত জানে না এখনো, কিন্তু আবছা সন্ধ্যায় এরকম একটা সুযোগ পেয়েও যে রিকশায় উঠে বসল না, বা বসার কথা একবার ভাবলও না–তাতেই লোকটা যে ভদ্র তাতে আর সন্দেহ থাকল না। ভেবে ভাবনার কূল-কিনারা পাবে না যশোমতী জানে, তাই হঠাৎ সমস্ত ভাবনা-চিন্তা রসাতলে পাঠাতে ইচ্ছে করল। ….ভদ্রই যদি হয় তাহলে জলে পড়বে না। ভেবে ভেবে মাথা খারাপ হবার দাখিল, আর ভাবতে পারে না। দেখা যাক।
রিকশাওয়ালা তার পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলল। যশোমতী তাকালে একবার। আবছা অন্ধকার সত্ত্বেও পাশ কাটাবার মুখে স্পষ্টই দেখতে পেল। রাজ্যের বিরক্তি মুখে এটে মাথা গোজ করে চলেছে লোকটা। রিকশা এগিয়ে যেতে হঠাৎ হেসেই ফেলল সে। বাসের টিকিট নিয়ে বিভ্রাটের পর থেকে একজন সঙ্গী পেয়েছে বটে!
দু’ধারে মাঠ, মাঝে রাস্তা। নির্জন। যশোমতী আর একবার তাকালো পিছন ফিরে। তারপর কি ভেবে রিকশাওয়ালাকে বলল, আস্তে চলতে, পিছনের লোকের সঙ্গে আসতে।….হাসি পেয়েছিল বটে, কিন্তু হাসিটা যে ছেলেমানুষি, তার থেকে বেশি কে আর জানে। কোথায় কার বাড়ি যাচ্ছে, কি দেখবে সেখানে গিয়ে কে জানে। সেখানে যারা আছে তাদের মুখ দেখাবে কি করে? তাদের জেরার কি জবাব দেবে? কি ভাববে তারা? কিন্তু উদ্বেগের তাড়নায় কিনা বলা যায় না, একটু আগের স্বতঃস্ফূর্ত আশ্বাসটুকুই আঁকড়ে ধরে থাকতে চেষ্টা করল যশোমতী।….সেই বাস থেকে যেমন দেখে আসছে এই অচেনা অজা সহযাত্রীটিকে, তার মেজাজ যেমনই হোক, বা হিসেবের মুঠোটা যত শক্তই হোক, তার ভিতরের একটা চেহারা যেন সে দেখেছে। সেটা মানুষেরই চেহারা, মেয়েছেলের বিপদ দেখে হীন সুযোগ নেবার মতো নয়। আপাতত এই নির্ভরতাটুকুই সম্বল।
রিকশার গতি শিথিল হবার ফলে পিছনের মানুষ পাশে আসতে যশোমতী উৎসুক মুখে তাকালো। শঙ্করও ঘাড় ফেরাল। আর তক্ষুনি বোঝা গেল মেজাজ তখনো ঠাণ্ডা হয়নি। হয়নি বলেই যেন বেশি নিশ্চিন্ত বোধ করছে। এবারে বিব্রত মুখে যশোমতী চিরাচরিত সৌজন্যের কুণ্ঠাই প্রকাশ করল।
–আপনার হেঁটে যেতে কষ্ট হচ্ছে….
দৃষ্টিটা তার মুখের ওপর আটকে নিয়ে শঙ্কর বলল, কষ্ট হলে কি আর করা যাবে, ওখানে উঠব?
ওখানে অর্থাৎ রিকশায়। কি রকম মেয়ে বোঝার জন্যেই ফিরে বক্র প্রশ্ন ছুঁড়েছে শঙ্কর।
থতমত খেয়ে যশোমতী তাড়াতাড়ি জবাব দিল, না না, বলছিলাম আর একটা রিকশা করলে হত….
–তার ভাড়াটা কে দিত, আপনি না আমি?
এই জবাবই বোধহয় সব থেকে ভাল লাগল যশোমতীর। এরই থেকে মন বুঝতে সুবিধে হয়, অন্তত মনের গতি সোজা পথে চলছে কিনা সেটা বোঝা যায়। ভাল মুখ করে বলল, এখন আপনিই দিতেন, পরে না হয় আমি দিয়ে দিতাম।
যে-রকম হিসেবী, আরো কিছু বললে মাথা একটু ঠাণ্ডা হবে মনে হল। রিকশার গতি আর একটু না কমলে কথা বলার সুবিধে হচ্ছে না। আগে রিকশাওয়ালাকে নির্দেশ দিল, এই, আরো আস্তে চলল। তারপর পাশের লোকের দিকে ফিরে সবিনয়ে বলল, আমার জন্যে আপনার অনেক খরচা হয়ে গেল, কিন্তু আপনার কিছু লোকসান হবে না, আমি সব মিটিয়ে দেব।
জবাবে শঙ্কর সারাভাই একটা তপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল শুধু। পরমুহূর্তে আচমকা প্রশ্ন করল, আপনার নাম কি?
ঠিক এই মুহূর্তে এ-প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না। হকচকিয়ে জবাব দিল, লি-লীলা।
লীলা কী?
প্রশ্নের সুরটা খট করে কানে লাগল কেমন যশোমতীর। চোখ কান বুজে যে পদবী মনে এল তাই বলে দিল।
-লীলা নায়েক। কেন….?
জবাব পেল না। আবছা আলোয় আর একবার যেন তাকে ভাল করে দেখে নিল লোকটা।
কি ভেবে হঠাৎ রিকশাওয়ালাকে রিকশা থামাতে বলল যশোমতী। শঙ্কর দাঁড়িয়ে গেল। যশোমতী নামল। বলল, রিকশাওয়ালা চলুক, আমিও হেঁটেই যাই।
শঙ্কর সারাভাই আপত্তি করল না। তার মনে নানা সংশয় আনাগোনা করছে। বাস থেকে এ-পর্যন্ত অনেক কিছুই অস্বাভাবিক লাগছে তার। রিকশাওয়ালাকে চলতে ইঙ্গিত করে এগিয়ে চুপচাপ চলল। শুধু বলল, বাড়ি এখনো আধ মাইল পথ।
