শঙ্কর সারাভাই মালপত্রগুলো দু-হাতের দখলে আনতে চেষ্টা করল। আসার সময়ের মতো স্বাভাবিক সৌজন্যবশতই হোক বা একটু সাহায্য করার তাগিদেই হোক, সেই ঝোলাটা নেবার জন্য হাত বাড়ালো যশোমতী।
তার আগে শঙ্কর তাড়াতাড়ি ওটা দখলই করল যেন। বলল, থাক এটা খোয়া গেলে আবার আমাকে এই গাড়িতেই ফিরতে হবে।
টিকিট দিয়ে বাইরে এলো। যশোমতী কি করবে এখন জানে না। দিনের আলোয় যে সাহসে বুক বেঁধেছিল, আসন্ন রাতের ছায়া নামতে তা যেন উবে গেছে। এর থেকে গাড়িতে বসে থাকলে ভাল হত বোধহয়। গাড়ি আবার ফিরে যেত অবশ্য। গেলেও বড় স্টেশনে রাত কাটানো যেত। দিনের আলোয় আবার ভাবা যেত কি করা যায়।
বাইরে আসার পর লোকটা যেন আর চেনেই না তাকে। ও-ধারের আঙিনা ছাড়িয়ে রাস্তায় নেমেই রিকশায় মালপত্র তুলতে লাগল। যশোমতী কি করবে? কেমন লোক–ভাল কি মন্দ কিছুই জানে না। কিন্তু এ-রকম দিশাহারা অবস্থায় পড়ে তার মনে হল, এতক্ষণের এই চেনা লোক যেন নির্লিপ্ত নিষ্ঠুরের মতো তাকে বিপদের মধ্যে ফেলে চলে যাচ্ছে।
যশোমতী সিঁড়ির ওপরেই দাঁড়িয়েছিল। রাস্তায় নামে নি। লোকটা তার দিকে আর ফিরে তাকাবে কিনা জানে না, আর একবারও তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করবে কিনা জানে না। তবু সঁাড়িয়ে আছে যশোমতী, তবু প্রতীক্ষা করছে। সাধারণ স্থলে এ-রকম বেখাপ্পা পরিস্থিতিতে এই বয়সের কোনো মেয়ের আলাপ-পরিচয় ঘটলে পুরুষের দিক থেকে অন্তত একটু ঘনিষ্ট হবার কথা। আর কিছু না হোক, তার একটু কৌতূহল হবার কথা। কিন্তু এ-রকম নীরস গদ্যকারের পৃথিবী যশোমতী আর দেখে নি। চলে যেতে দেখে লোকটার ওপর এখন রীতিমতো রাগ হচ্ছে তার–পাঁচ টাকাও খরচ হয়নি ওর জন্যে, কিন্তু সেই লোকসানের শোকেই অস্থির।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত গেল না, ফিরে তাকালো। আর, তক্ষুনি প্রাণের দায়ে যশোমতী কিছু বলবে এ-রকম কিছু আভাসই প্রকাশ করল। হয়তো। বিস্ময়ের আঁচড় পড়তে লাগল লোকটার মুখে। সে যে এখনো দাঁড়িয়ে আছে, তাও এতক্ষণ খেয়াল করে নি বোধহয়।
যশোমতীর রাগ হবারই কথা।
যাক, ফিরে আসছে।
যশোমতী জিজ্ঞাসা করল, এখানে রাতে থাকার মতো কোনো হোটেল-টোটেল বা সেরকম কিছু নেই?
জবাব না দিয়ে শঙ্কর সারাভাই অবাক চোখে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ। মেয়েটিকে আবার নতুন করে দেখল একপ্রস্থ। শুধু দেখা নয়, বুঝতেও চেষ্টা করল।আপনি যাবেন কোথায়?
যশোমতী নিরুত্তর।
-এখানে আপনার চেনা-জানা কেউ নেই?
সুবোধ মেয়ের মতো তক্ষুনি মাথা নাড়ল। নেই। শঙ্কর সারাভাই দেখছে। রাগ নয়, একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি। মনের তলায় দুর্বোধ্য জটিলতার ছায়া পড়ছে।
–আপনি এখানে এসেছেন কেন?
এই প্রশ্নের একটাই জবাব হতে পারে। যশোমতী তাই বলল। চাকরির খোঁজে….
চাকরিকি চাকরি?
–কোনো স্কুল-টুলে–
–স্কুলে চাকরি! মেয়েদের স্কুল বলতে তো এখানে একটা পাঠশালা আছে শুধু।
যশোমতী সাগ্রহে বলল, সেখানেই একটা কা-কাজ পাওয়া যেতে পারে শুনেছিলাম
শঙ্কর সারাভাই হাঁ করে তবু মুখের দিকে চেয়ে রইল খানিক। আবার একটা গণ্ডগোলে পড়ে যাচ্ছে ভেবেই চিরাচবিত অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পেল কিনা কে জানে। বলে উঠল, চাকরি পাওয়া যেতে পারে শুনেছিলেন তো সকালের গাড়িতে এসে দেখাশোনা করে যান নি কেন? এখানে কি হোটেল-রেস্তরার ছড়াছড়ি যে মনে হল আর একা মেয়েছেলে ভর-সন্ধ্যায় হুট করে চলে এলেন? দৃষ্টি ঘোরালো হল পরক্ষণেই।–সঙ্গে তো টাকাকড়ি কিছু নেই, হোটেল থাকলেই বা আপনার কি সুবিধে হত?
যশোমতী কি জবাব দেবে? তবু মরিয়া হয়েই বলল, ভদ্রলোকের হোটেল হলে কোনো মহিলা বিপদে পড়েছে শুনলে সাহায্য করতেন বোধহয়। আমি ফিরে গিয়েই আবার টাকা পাঠিয়ে দিতুম। গয়না বেচে দেনা শোধ করে যেত সেটা আর বলতে পারল না।
শঙ্কর সারাভাইয়ের নিজেরই যেন বুদ্ধিসুদ্ধি সব ঘুলিয়ে যাচ্ছে কেমন। হাঁ করে আবার ও মুখের দিকে চেয়ে রইল খানিক। অস্বস্তি বাড়ছেই। কেন যেন আর মাথা গলানো ঠিক নয় মনে হল তার। তিরিক্ষি মেজাজে পকেট থেকে ব্যাগ টেনে একটা টাকা বার করে তার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল, একটা রিকশা নিয়ে যেখানে যাবার কথা চলে যান, রাত করে আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য তো পাঠশালা খুলে বসে আছে সব। মোটকথা, যা ভাল বোঝেন করুন। ভাল দিন পড়েছে আজ আমার
যশোমতী চেয়ে রইল শুধু। হাত বাড়াল, বা টাকা নিল না। বিপুল ঐশ্বর্যের উত্তরাধিকারিণীর এই দুরবস্থা সে যেন নিজেই এখনো কল্পনা করতে পারছে না।
–কই, নিন! এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কি হবে?
–থাক, আপনি যান।
কি করে বলল, সত্যিই চলে গেলে কি হবে যশোমতী জানে না। তবু মুখ দিয়ে এই কথাই বেরুল তার।
ব্যাগের টাকা আবার ব্যাগে পুরে হনহন করে এগিয়ে গিয়ে রিকশায় উঠে বসল শঙ্কর সারাভাই। রিকশাওয়ালা এতক্ষণ হাঁ করে দেখছিল তাদের। এবারে রিকশা তুলে নিল। দু’চার গজ এগিয়েই শঙ্কর পিছন ফিরে তাকালো।
যশোমতী দাঁড়িয়ে আছে। স্থির, নির্বাক। এদিকেই চেয়ে আছে।
আরো পাঁচ-সাত গজ গেল। আবারও ফিরে তাকালো শঙ্কর সারাভাই।
যশোমতী তেমনি দাঁড়িয়ে।
অস্বস্তির একশেষ। শঙ্করের কেবলই মনে হল, মেয়েটি বিপদে পড়েছে। এই চেহারার….এই গয়না আর সাজ-পোশাকের মেয়ে পাঠশালার চাকরির খোঁজে এসেছে শুনে সন্দেহ উঁকিঝুঁকি দিয়েছে বটে, কিন্তু এই মুহূর্তে আসন্ন সন্ধ্যার টান-ধরা আলোয় এই মুখের দিকে চেয়ে কেন যেন বিপদে পড়া ছাড়া আর কিছু ভাবা গেল না। যেমন অসহায়, তেমনি করুণ…আবার তেমনি সুন্দর।
