….অথচ একলা বেরিয়েছে। কিন্তু একলা বেরিয়ে যে অভ্যস্ত সে রকম একটুও মনে হয় না।
ওদিকে একের পর এক নাজেহাল হয়ে যশোমতী সত্যিই রেগে গিয়েছিল। রাগে ক্ষোভে তার চোখে জল আসার উপক্রম হয়েছিল। আর কিছু বললে সেও চুপ করে থাকত না ঠিকই। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে যা মুখে আসে তাই বলে বসত হয়তো। কিন্তু লোকটার হাব-ভাব হঠাৎ এ-ভাবে বদলে যেতে আত্মস্থ হল। ফলে শুধু লজ্জা নয়, সঙ্কোচ বোধ করতে লাগল। বনেত্রে সেও বার-কতক লক্ষ্য করল তাকে।
দুই একবার চোখোচোখি হয়ে গেল। যশোমতীর মনে হল, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ির জন্যেই বেশি রুক্ষ লাগছে লোকটাকে….শেভ করলে বেশ ভব্য-সভ্যই দেখাবার কথা। স্বাস্থ্য রীতিমতো ভাল, গায়ের জোরের দেমাকেই লোকের সঙ্গে ঝগড়া করে বেড়ায় বোধহয়। কিন্তু অন্য লোকের সঙ্গে ঝগড়ার বেশির ভাগ তার জন্যেই করেছে–এ সত্যটাও মনে মনে অস্বীকার করতে পারল না যশোমতী। ইচ্ছে করে লোকটার কাগজ ফেলে দেবার পরেও সেই কিনা উন্টে চোখ রাঙিয়ে বসল। আর তার ফলে ভদ্রলোক….ভদ্রলোকই তো মনে হচ্ছে….এ ভাবে চুপ করে যাবে আশা করে নি। করে নি বলেই যশোমতীর চিন্তা কিছুটা সঙ্গত পথে চলল। মানুষটার রুক্ষ হাব-ভাব আচরণের তলায় একটা যেন দরদী মনই আবিষ্কার করে ফেলল সে। ব্যাগ চুরি যাবার ফলে এখন তো বিপদের পাহাড় যশোমতীর মাথার ওপর। কেউ সামান্য সহায় হলেও সেটা সামান্য ভাবার কথা নয়। ভাবল না। এতবড় বিপদে এত লোকের মধ্যে এই নিতান্ত অপরিচিত একজন ছাড়া কে আর তার সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। আর তো কেউ ফিরেও তাকায় নি। টিকিট-চেকারের হাতে ধরা পড়ার ফলেই তো এতক্ষণে সব ফাস হয়ে যাবার কথা। তাকে টেনে নামিয়ে জেরা শুরু করলেই ট্রাঙ্ক-টেলিফোনে বাবার কাছে খবর না পাঠিয়ে করত কি? আর তারপর….তারপর কেলেঙ্কারি হাসাহাসি, ঢি-ঢি।
এ-পর্যন্ত এই অপরিচিত মানুষটাই সর্বভাবে তার মান মর্যাদা রক্ষা করেছে। নইলে কি-যে হত কে জানে।
বক্র কটাক্ষে তাকালে আবার। আবারও চোখোঁচাখি হয়েগেল। ধমক খাবার পর এই মুখ দেখে প্রায় হাসিই পাচ্ছে যশোমতীর। এত চিন্তা-ভাবনার ফাঁকে ফাঁকেও মনের তলায় কোথায় যেন একটু ভাল লাগার অনুভূতি উঁকিঝুঁকি দিতে লাগল। শুধু সামান্য পয়সা –যে পয়সাকে কোনদিন পয়সা বলে ভাবার দরকার হয়নি যশোমতীর তাই নিয়ে লোকটার ও-ভাবে মাথা গরম করাটা ভাল লাগে নি।….হতে পারে গরীব, তাই বলে এমন তুচ্ছ লোকসান নিয়ে এ-রকম হিসেব-নিকেশ করার মন কেন? তার একটু প্রীতির আশায় কত জনে কত টাকা বাতাসে উড়িয়ে কৃতার্থ হবার জন্য প্রস্তুত ঠিক নেই।
মেয়েটাকে এক-একবার দেখেছে আর ভাবছে শঙ্কর সারাভাইও। সেই গোড়া থেকে অর্থাৎ বাসের যোগাযোগের শুরু থেকে তলিয়ে ভাবছে। ….না, যত দেখছে আর যত ভাবছে, মাথায় ছিট আছে বলে মনে হচ্ছে না তার। আচরণে অসঙ্গতি কোথাও দেখে নি। বাসে, বাসের থেকেও অনেক গুণ বেশি এই ট্রেনে–টিকিট না থাকার দরুন যে অসহায় মূতি লক্ষ্য করেছে, তাতে কোনরকম বিকৃতির লক্ষণ ছিল না। বিকৃতি নয় মনে হতেই ভিতরে ভিতরে আবার রাগ হতে লাগল শঙ্করের। স্টাইল করে একা বেরিয়েছে, তার ওপর কাগজ হারিয়ে উলেট আবার চোখ রাঙিয়েছে তাকে। ….দেখতে সুন্দর, ভেবেছে সকলে শুধু মুখ দেখেই ভুলে যাবে। সুন্দর মুখ দেখেই সে একের পর এক এতগুলো লোকসান বরদাস্ত করেছে কিনা মনে হতে নিজের ওপরেই উষ্ণ হয়ে উঠল। কেন অত করতে গেল? বাসের টিকিট দিতে গেল কেন,কেনই বা বিনা টিকিটে ট্রেনে ওঠার খেসারত দিতে গেল?….আশ্চর্য।
ট্রেন থামল। দিনের আলোয় টান ধরেছে। সন্ধ্যার ছায়া নেমেছে। মৌলা। লোকাল ট্রেনের যাত্রা শেষ।
কামরায় যে সাত-আটজন লোক ছিল তারা আগে নেমে গেল। শঙ্করের তাড়া নেই। ধীরে-সুস্থে মালপত্র গুছিয়ে সে নামার উদ্যোগ করল। এবারে আবার চোখ টান করে তাকে দেখছে যশোমতী। স্টেশনের দিকে এক নজর তাকিয়েই তার ভিতরটা দুমড়ে গেছে। দু’দণ্ড নিশ্চিন্ত হবার মতো কিছুই কি বরাতে জুটবে না আজ? খোলা স্টেশন, মাথার ওপর ছাদ নেই। ওদিকে খুপরির মতো ছনের ছোট ছোট অফিস-ঘর গোটা দুই-তিন, ওয়েটিংরুম আশা করা দুরাশা বোধহয়। স্টেশনের এদিক-ওদিক যতদূর চোখ যায় ধু-ধু মাঠ।
আগে মালগুলো সব নামিয়ে আর একবার উঠে বেঞ্চির তলায় উঁকি দিয়ে দেখে নিল শঙ্কর, টুকিটাকি জিনিস কিছু থলে থেকে গাড়িতে পড়েছে কিনা। তারপর নেমে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
যশোমতী বসে আছে। শুধু বসে আছে নয়, তার দিকেই চেয়ে আছে। মেয়েটার এই দৃষ্টি আবার যেন কেমন অসহায় মনে হল শঙ্করের।
তবু আর বোধহয় মাথা গলাতে না সে, সেই থেকে অনেক শিক্ষা হয়েছে–কিন্তু মেয়েটির টিকিটের রসিদও যে তারই কাছে। তাছাড়া, এভাবে বসে থাকতে দেখে অবাকও কম হয়নি। হাব-ভাব গোলমেলেই লাগছে।
দাঁড়িয়ে দেখল একটু। গম্ভীর মুখে জানান দিল, এটা মৌলা স্টেশন।
জবাব নেই।
–আপনি নামবেন কি এখানে? খানিক বাদে গাড়ি আবার ফিরে যাবে।
অগত্যা যশোমতী উঠল। তার পিছনে পিছনে নামল। স্টেশন না এলে, এই পথ এত শিগগীর না ফুরোলেই বাঁচত বুঝি। আবার এক সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্যে প্রস্তুত হতে চেষ্টা করেছে প্রাণপণে।
