অর্থাৎ, সঙ্গিনীর টিকিট না কেটে টাকা বাঁচাতে চেষ্টা করা হয়েছিল–ধরা পড়ার পরে সুড়সুড় করে টাকা বার করে দেওয়াই এখন বুদ্ধিমানের কাজ।
সীট ছেড়ে শঙ্কর সোজা উঠে দাঁড়াল একেবারে। ফলে জোড়া চোখ তার মুখের দিকে ধাওয়া করল। সশঙ্ক ব্যাকুল চোখে তাকালো যশোমতীও।
ধীর গম্ভীর মুখে বুড়ো লোকটাকে ভাল করে দেখেই যেন নিজেকে সংযত করতে চেষ্টা করল শঙ্কর সারাভাই। কিন্তু পেরে উঠল না। আগে সহ্য করেছে বারকয়েক, কিন্তু এই উক্তি বরদাস্ত করার মতো নয়। বলল, ফের অপিনি মুখ খুলবেন তো ওই জানলা দিয়ে আপনাকে আমি ছুঁড়ে ফেলে দেব, বুঝলেন?
বুড়োর মেজাজও তেমনি। রুখে গর্জে উঠল তৎক্ষণাৎ, কি? কি করবে তুমি! মগের মুলুক এটা, কেমন? একগাদা লোক ঠেলে বিনা টিকিটে মেয়েছেলে নিয়ে উঠে আবার–
শঙ্কর কি করবে? সাদা চুল দেখল, দাঁত নেই দেখল। না, কিছু করার নেই। বুড়োটা অতি বুড়ো, সেটাই তার জোর। রুদ্ধ নোষে এক ঝটকায় যশোমতীর দিকে ফিরল। কিন্তু তার মুখের দিকে চেয়েও থমকে গেল। যা বলতে যাচ্ছিল বলা হল না। চেয়েই রইল একটু। তারপর চেকারের দিকে ফিরল।
–কত দিতে হবে বললেন?
–তিন টাকা দু আনা।
–ফাইনও দিতে হবে?
হবে।
–আচ্ছা রিসিট লিখুন।
মানিব্যাগ টেনে নিয়ে টাকা বার করল। একগোছ নোটই আছে বটে এখনো, তবে সবই হিসেবের টাকা।
টাকা গুণে দিয়ে রিসিট নিল। নিয়েই রাগের মাথায় সেটা যশোমতীর দিকে বাড়িয়ে দিল। যশোমতী ভয়ে ভয়ে তাকালে তার দিকে। কি ভেবে শঙ্কর সারাভাই পরক্ষণে আবার হাত টেনে নিয়ে রিসিটটা নিজের ব্যাগেই রাখল।
চেকার চলে গেল। শঙ্কর নিজের আসনে গুম হয়ে বসল। যশোমতী ওদিকে ফিরে জানলার বাইরে মুখ আড়াল করেছে আবার। অপমানের চূড়ান্তই হয়ে গেছে যেন। তিন টাকা দু আনার জন্য এরকম পরিস্থিতিতে কেউ পড়ে এ যশোমতীর স্বপ্নেরও অগোচর। এরপর সে কি করবে, পরের স্টেশনে নেমে গিয়ে বাড়িতে টেলিগ্রাম করার ব্যবস্থা করবে একটা? তারপর বাড়ি গিয়ে বাবাকে বলবে, দুনিয়া দেখতে বেশিদিন লাগল না–একদিনেই দেখা হয়ে গেছে? বলবে তুমি ঠিকই বলেছ, নিজের জোরে বাঁচার শক্তি নেই আমাদের–আমরা শো-কেসে থাকারই উপযুক্ত?
তার থেকে গলায় দড়ি দেবার মতো দড়ি জুটবে না একটু? কিংবা ডুবে মরার মতো একটু জল? আর রেললাইন আর রেল গাড়িও তো আছেই। বাবারই মেয়ে বটে সে, সে রকমই গো। যত অপদস্থ হল, ততো বেশি গো চাপল তার। বাড়ি ফেরার চিন্তা সমূলে হেঁটে দিল, আর আত্মহত্যার পর নিজের চেহারাটা কল্পনা করতে একটুও ভাল লাগল না। সেটা ভয়ানক বীভৎস ব্যাপার। মনে মনে ভাবল, যত নষ্টের মূলে ওই চোর হতভাগা–বাস থেকে যে তার ব্যাগ নিয়েছে। তাকে হাতে পেলে আর ক্ষমতা থাকলে এই মুহূর্তে তাকে ফাঁসি দিত বোধহয়।
স্টেশন আসছে, যাচ্ছে। কামরার লোক কমছে।
একটা প্রশ্ন কানে ঢুকতেই আবার সচকিত কণ্টকিত হয়ে উঠল যশোমতী। এদিকে ফিরল না। লোকটা জিজ্ঞাসা করছে, আমার কাগজটা–কাগজটা কি করলেন?
প্রাণপণে বাইরের দিকে ঝুঁকে মাটি দেখছে যশোমতী। কিন্তু রেহাই পেল না।
–ইয়ে, শুনছেন? আমার কাগজটা আপনার হাতে ছিল, কোথায় রাখলেন?
অগত্যা নিরুপায় যশোমতী মুখ ফেরালো। আবারও বিপদের সম্মুখীন। তবে লোকজন নেমে যাওয়ার ফলে ওদিকের আসন অনেক ফাঁকা, এদিকে কারো চোখ নেই, আর সেই বুড়ো লোকটাও কখন নেমে গেছে।
–আমার কাগজটা? তিনবার একই কথা জিজ্ঞাসা করতে হল বলে শঙ্কর সারাভাইয়ের বিরক্তি।
যশোমতী কি আর জবাব দেবে, অসহায় চোখে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। কাগজ বলে একটা বস্তুর অস্তিত্ব এই যেন প্রথম শুনল।
সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ চড়তে লাগল শঙ্কর সারাভাইয়ের। যশোমতীর এপাশ ওপাশ আর বেঞ্চির তলায় চোখ চালিয়ে সে-ই খুঁজে নিল একটু। তারপর রুক্ষস্বরে বলে উঠল, এটাও হারিয়েছেন? বলি এভাবে একা স্টাইল করে আপনারা বেনোন কেন? আপনার কি ত্রিভুবনে কেউ নেই? সেই–সেই বাসে আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে আমার কত লাভ হয়েছে বুঝতে পারছেন? দেখছেন কি? আমার অসুবিধা হচ্ছে বলে কাগজখানা আপনি টেনে নিয়েছিলেন– সেটা কি করলেন?
কি যে হল যশোমতীর কে জানে। একটু দূরে দূরে যারা ছিল তারাও এবারে সবিস্ময়ে ঘুরে বসেছে। ঠিক বুঝতে পারছে না হয়তো কি নিয়ে লোকটার মেজাজ চড়েছে–কিন্তু কথাবার্তার সুর তাদের কানে বেসুরো লাগছে নিশ্চয়ই।
সমস্ত মুখ লাল যশোমতীর। অনুচ্চ কঠিন প্রায় রূঢ় জবাব দিয়ে বসল, ফেলে দিয়েছি।
ফেলে দিয়েছেন। জবাবটা অথবা জবাবের এই সুরটাই হয়তো ঠিক বোধগম্য হয়নি শঙ্করের।মানে আমার কাগজটা আপনি ফেলে দিয়েছেন?….কেন? কেন?
–আমার খুশি।
শঙ্কর অবাক। এতক্ষণ যে মেয়ে দুই ঠোঁট সেলাই করে বসে ছিল, তার এই জবাব শুনে এতগুলো ক্ষতির হিসেব পর্যন্ত ভুল হবার দাখিল। নইলে এতখানি লোকসানের পর এরকম উক্তি বরদাস্ত করার লোক নয় সে।
হঠাৎ ভিতরে একটা অজ্ঞাত অস্বস্তি গুড়গুড় করে উঠতে লাগল শঙ্করের। মাথায় গণ্ডগোল নেই তো কিছু! যে ভাবে এখন মুখের দিকে চেয়ে আছে, মনে হল আর কিছু বললে সে-ও ঠাস করে মুখের ওপর জবাব দেবে।
অতএব আর কিছু না বলে শঙ্কর অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরালো, কিন্তু আড়ে আড়ে বার-কতক লক্ষ্য করল মেয়েটাকে। পরনের বেশ-বাস এমন কি পায়ের জুতোজোড়া পর্যন্ত দামী মনে হয়। হাতের হীরে বসানো মোটা বালা-দুটো আর আংটি ঝকমক করছে। কানের ঝোলানো দুল দু’টাও। গলার হারও কম দামী নয়, হাতে দামী লেডীস রিস্ট-ওয়াচ। মেসোর থেকে ও-ভাবে টাকা আনার দরুন, আর সেই বাস থেকে একের পর এক ব্যবসায়ের পয়সা অকারণে খোয় যাবার দরুন মেজাজ বিগড়ে ছিল বলেই হয়তো খুব ভাল করে লক্ষ্য করা হয়নি এতক্ষণ। পয়সার ব্যাপারে শঙ্করের কড়াক্রান্তি হিসেব তার ওপর এ তো বলতে গেলে প্রাণের দায়ে চুরি করা বহু কষ্টের পয়সা।….কিন্তু এই প্রথম মনে হল শঙ্কর সারাভাইয়ের, দেখলে দেখার মতোই বটে মেয়েটি। মুখখানা যে ভারী ভারী মিষ্টি তাতে কোন সন্দেহ নেই।
