মাল সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হবার পর এবারে বসার চিন্তা শঙ্কর সারাভাইয়ের। একজন মেয়েছেলে ভিড়ের মধ্যে এ-ভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে দেখতেও বিসদৃশ। শঙ্কর এদিক-ওদিক উঁকি দিয়ে দেখল, ভিতরের দিকে এগিয়ে যেতে পারলে বসার ব্যবস্থা হতেও পারে। ও-দিকটায় হাত-পা ছড়িয়েও বসে আছে কেউ কেউ। অতএব আবার চেষ্টা।
ইশারায় যশোমতীকে আসতে বলে ভিড় ঠেলে সে এগোতে লাগল–ও-দিকের লোকগুলো একটু সঙ্কুচিত হলে একজনের মতো বসার জায়গা অনায়াসে হতে পারে। কিন্তু দরজার দিক থেকে ভিতরে ঢোকাই মুশকিল।
মেয়েছেলে ওদিকে যাবে, একটু জায়গা দাও না ভাই। এই একটু একটু করতে করতে যশোমতীকে নিয়ে সত্যি একপ্রান্তের দুই বেঞ্চির মাঝে এসে দাঁড়াল।
বুড়ো মতো এক ভদ্রলোকের উদ্দেশে সবিনয়ে আবার বলল, একটু সরে সরে বসুন না সার দয়া করে, মেয়েছেলে বসবে–
বার বার মেয়েছেলে মেয়েছেলে শুনে যশোমতীর লজ্জাই করছে। বিতিকিচ্ছিরি ভিড়ের দরুন তার গা-ও ঘুলোচ্ছে। এর ওপর আবার অস্বস্তিতে ফেললে ওই বুড়ো মতো ভদ্রলোক। সরি বলা সত্ত্বেও তার মেজাজ প্রসন্ন থাকল না। ঠাস করে বলে বসল, এ-রকম ভিড় দেখেও মেয়েছেলে নিয়ে ওঠেন কেন মশাই। একটা গাড়ি ছেড়ে উঠলেই তো হয়–
সঙ্গে সঙ্গে জবাব শুনেও দুই চক্ষু বিস্ফারিত যশোমতীর। শঙ্কর সারাভাই হাসিমুখে সাদা-সাপটা জবাব দিল, ভুল হয়ে গেছে, আপনার সঙ্গে আগে দেখা হলে পরামর্শ করেই উঠতাম। উঠে যখন পড়েছি, মেয়েছেলে সঙ্গে থাকলে তাকে ফেলেই বা উঠি কি করে। দোষ-ত্রুটি না ধরে আপনি এখন দয়া করে একটু চেষ্টা করে দেখুন, ব্যবস্থা হয় কি না।
বুড়োর রুক্ষু মুখ বিকৃত হল। বচন শুনে এপাশ-ওপাশের কেউ কেউ হাসছে। লোকটার কথায় না থোক, যশোমতীর দিকে চেয়ে অনেকেরই একটু জায়গা করে দেওয়ার আগ্রহ হল। ফলে জায়গাও হল। যশোমতী বসে বাঁচল। তার দু’হাত দূরে শঙ্কর সারাভাই দাঁড়িয়ে। নিজের জায়গার জন্য আর ঝগড়া-ঝাঁটি করার ইচ্ছে নেই বোঝা গেল। পকেট থেকে তোয়ালের মতো একটা রুমাল বার করে ঘাম মুছছে।
ছোট লাইনের লোকাল ট্রেন। কাছাকাছি স্টেশন। দুটো। স্টেশন পার হয়ে গেল। কিছুলোক নেমে গেল। দাঁড়িয়ে যারা ছিল তারা কেউ কেউ বসতে পেয়ে গেল। যশোমতীর উল্টোদিকের বেঞ্চিতে শঙ্করও বসার মতো জায়গা পেল একটু। মনটা তার ভালো নেই খুব। গাড়িতে উঠে নিশ্চিন্ত হবার পর মনে পড়েছে কিছু। নিরুপায় হয়ে মেসোর কাছ থেকে যেভাবে টাকা আনতে হল সেটাই ভিতরে খচখচ করেছে। বসতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বিবেকের খচখচানি বাতিল করে দিয়ে পকেট থেকে ছোট হিসেবের বই বার করল। মন দিয়ে কেনা-কাটার হিসেবটা সেরে ফেলতে লাগল সে।
যশোমতী এক-একবার আড়চোখে দেখছে তাকে, আবার বাইরের দিকে মুখ করে বসে থাকছে। এদিকে ফিরবে কি, আবার কার হাতে খবরের কাগজ চোখে পড়বে–মনে মনে এখন সেই অস্বস্তি। আজই কাগজে ছবি বেরিয়ে গেছে যখন, তার চিঠিখানা প্রত্যাশিত সময়ের আগেই বাবা-মায়ের হাতে পড়েছে। লিখে আসা সত্ত্বেও এ-ভাবে ঢাক পিটিয়ে খবরের কাগজে ছবি ছাপিয়ে তাকে বিব্রত করার দরুনও বাবার ওপর রাগ হতে লাগল। তাকে ধরার জন্য আরো কি করেছে আর করছে, কে জানে। সত্যি সত্যি শো-কেসের পুতুল ভাবে বলেই এত ভাবনা, তার কাছে মেয়েদের একটুও মর্যাদা থাকলে দু’দিন অন্তত সবুর করে দেখত।
–এঁর টিকিট? একটু ঘুরে ইঙ্গিতে যশোমতীকে দেখিয়ে তার টিকিট চাইল চেকার।
-আমি কি জানি! বলতে না বলতে হঠাৎ কোন্ অস্পষ্ট চেতনার ঘায়ে শঙ্কর সারাভাই বিমূঢ় যেন। যশোমতীর দিকেই তাকালে সে। চোখাচোখি হওয়ামাত্র বিপদ স্বতঃসিদ্ধ মনে হল। তবু জিজ্ঞাসা করল, আপনার টিকিট কোথায়?
যশোমতী নিরুত্তর। ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়ার সুযোগ থাকলে সে লাফিয়েই পড়ত।
শঙ্কর আরো রুক্ষ মেজাজে বলে উঠল, কি আশ্চর্য, টিকিট আছে না নেই?
নিরুপায় যশোমতী সামান্য মাথা নাড়ল শুধু।
সঙ্গে সঙ্গে তার পাশের সেই বুড়ো ভদ্রলোক বক্র মন্তব্য ছুড়ল, মেয়েছেলের টিকিট তার হাতে দেওয়া কেন, নিজের সঙ্গে রাখলেই হত।
তিক্ত-বিরক্ত হয়ে শঙ্কর সারাভাই তাকেই ঝাঁঝিয়ে উঠল প্রথম, আপনি থামুন তো মশাই!
যশোমতীর দিকে ফিরল আবার। গলার স্বর সংযত রাখা দায়। –টিকিট নেই তো গাড়িতে ওঠার সময় সেটা মনে পড়ল না–বিনা টিকিটে দিবি গাড়িতে উঠে বসলেন? আমার কাছে কি টিকিট গজাবে এখন! আরো কি বলতে যাচ্ছিল, যশোমতীর নিষ্প্রভ পাংশু মুখের দিকে চেয়ে থেমে গেল। চেকারকে সবিনয়ে বলল, দেখুন, স্টেশনে আসার সময় বাসে ওঁর ব্যাগটা চুরি হয়ে গেছে, সে জন্যেই আর কি
বাস-কণ্ডাক্টরের সঙ্গে টিকিট চেকারের খুব একটা তফাত নেই। শুনে ঠাণ্ডা মুখে বলল, আপনি টিকিট করে নিন এখন, গার্ডকে বলে ওঠেন নি, কিছু ফাইনও লাগবে। মৌল তো?…. টিকিট একটাকা দশ আনা আর ফাইন দেড় টাকা–তিনটাকা দু আনা দিন—
যাঃ কলা! শঙ্কর সারাভাই প্রথমে বিমুঢ়, পরে তিক্ত-বিরক্ত। –আমি দিতে যাব কেন?
একটা মজার সূচনা দেখে অনেকেরই দৃষ্টি এদিকে এবারে। চেকারও ঈষৎ বিস্মিত তাহলে কে দেবে? উনি আপনার সঙ্গে নন?
–আমার-মানে–আমার সঙ্গে আবার কি।
সঙ্গের মহিলা বিব্রত বোধ করছে দেখেও শঙ্কর সারাভাইয়ের এরকম ব্যবহার মনঃপুত হল না অনেকেরই। ভিড়ের মধ্যে মালপত্র লটবহর সমেত মেয়েটিকে সুদ্ধ টেনে গাড়িতে তুলে কি ভাবে জায়গা করে নিয়েছে–এরই মধ্যে সেটা কারো ভোলার কথা নয়। সেই বুড়োলোকটিই চুপ করে থাকতে না পেরে তিক্ত মুখে ফোঁড়ন কাটল আবার।–টিকিট নেই যখন চুপচাপ টাকাটা গুণে দিয়ে ঝামেলা মিটিয়ে দিন না, টাকাটা বাঁচানো গেল না যখন কি আর করবেন উনি আপনার সঙ্গের কেউ কিনা সেটা আমরা সকলেই জানি।
