সামনেই সেই লোকটা। অর্থাৎ সারাভাই। মোটগুলো রেখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। কুলি আসতে মুখ ঘুরিয়ে নিল, অর্থাৎ দরকার নেই। তখনই তাকে যশোমতী দেখল। দেখল শঙ্কর সারাভাইও। একটু লক্ষ্য করেই দেখল যেন।
আপনি কি এই মৌল প্যাসেঞ্জারে যাবেন?
জায়গার নাম অথবা গাড়ির নাম জীবনে এই প্রথম শুনল যশোমতী। কিন্তু ভাবার সময় নেই, মাথা নাড়ল। অর্থাৎ তাই যাবে।
এই মালগুলো দু’মিনিট দেখবেন দয়া করে, আমি টিকিটটা কেটে নিয়ে আসি, যাব আর আসব।
বাসের টিকিট কেটে দিয়েছে যখন, এটুকু উপকার দাবি করতে তার দ্বিধা নেই। যশোমতী মাথা নাড়ল। দেখবে।
শঙ্কর সারাভাই হনহন করে চলে গেল। কিন্তু কাউন্টারে ভিড়, ফিরতে দেরিই হল একটু। ঘেমে সারা। ব্যস্তসমস্ত হয়ে মোটগুলো তুলতে তুলতে বলল, ভিড়ের ঠেলায় প্রাণান্ত, তার ওপর নড়তে চড়তে দিন কাবার। গাড়ি ছাড়তে আর খুব বেশি দেরি নেই
বড় মালটা এক হাতে নিল, অন্য সব কটা মাল অপর হাতের আয়ত্তে আনতে একটু অসুবিধেই হচ্ছিল। যশোমতী তাড়াতাড়ি মাঝারি সাইজের ঝোলাটা তুলে নিয়ে বলল, সব একলা পারবেন কেন, এটা আমি নিচ্ছি–চলুন!
এই সৌজন্যটুকু প্রত্যাশিত নয়। শঙ্কর সারাভাই থমকে মুখের দিকে তাকালো একটু, তারপর এগিয়ে চলল। এও বাসের টিকিট কাটার প্রতিদান ধরে নিল সে।
খানিকটা এগিয়ে আসার পর কি মনে পড়তে ফিরে তাকালো আবার। জিজ্ঞাসা করল, আপনি কোন্ ক্লাসে যাবেন?
যশোমতীর ভাবতে সময় লাগল না একটুও, এত মোট নিয়ে একটা কুলি পর্যন্ত করল না যে, সে কোন্ ক্লাসে যাবে জানা কথাই। মোটের জন্য বাসের একটা বাড়তি টিকিট কাটা নিয়ে কণ্ডাক্টরের সঙ্গে ঝগড়াও এরই মধ্যে তোলবার নয়।
থার্ড ক্লাস–
লোকটা নিশ্চিন্ত হল যেন একটু। মনে মনে হাসিই পাচ্ছে যশোমতীর। জীবনে দুর্ভাবনা করার অবকাশ এ পর্যন্ত হয়নি বললেই চলে। তাই এ-রকম দুর্বিপাকে পড়া সত্ত্বেও ভিতরে ভিতরে কৌতুক বোধ করতে পারছে। অসুবিধে বোধ করা মাত্র সেটা দূর হতে সময় লাগে না এ-রকম দেখেই অভ্যস্ত সে। এই প্রথম এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে সে যেখানে সুবিধে অসুবিধের কোনো প্রশ্নই নেই।
ঢোকার মুখে গেটে চেকার দাঁড়িয়ে। কিন্তু ভিড়ের জন্যই হোক বা যে জন্যই হোক নির্বিঘ্নে ঢোকা গেল। লোকাল গাড়ির ভিড়ে অত কড়াকড়ি নেই হয়তো। তবু একটু ভয়-ভয়ই করছিল যশোমতীর।
লোকটা তার সামান্য আগে আগে চলেছে। তার বগলের খবরের কাগজটা হাতের মালের বোঝা সামলাতে গিয়ে দুই-একবার পড়-পড় হয়েছে। ওই কাগজটা চক্ষুশূল যশোমতীর। তার সমস্ত ত্রাস আপাতত ওই এক জায়গায় পুঞ্জীভূত।
আবার ফ্যাসাদে পড়ার ভয়ে প্রথম সুযোগে পিছন থেকে কাগজটা টেনে নিল সে। শঙ্কর সারাভাই ফিরে তাকাতে মিষ্টি করে হেসে বলল, আপনার অসুবিধে হচ্ছিল, আমার কাছে থাক।…. আপনি যাবেন কোথায়?
এই সুতৎপর জিজ্ঞাসার হেতু আছে যশোমতীর। একটু বাদেই হয়তো লোকটা তাকে এই প্রশ্ন করবে, তার গন্তব্য স্থান জানতে চাইবে। প্ল্যাটফর্মে ঢোকার পর কাতারে কাতারে এত অচেনা মুখ দেখে একটু যে অসহায় বোধ করছে যশোমতী তাতে সন্দেহ নেই। ভরসা যদি একটুও কারো ওপর করতে হয়, যার সঙ্গে এই যোগাযোগ, তার ওপরে করাই ভাল।
শঙ্কর সারাভাই জবাব দিল, একেবারে শেষপর্যন্ত–মৌলা। আপনি?
যশোমতী মাথা নাড়ল। অর্থাৎ, এক জায়গাতেই যাচ্ছে। পাছে। আর কিছু জিজ্ঞাসা করে সেই ভয়ে ভিড়ের দরুনই যেন একটু তফাতে পড়ে গেল সে।
ঠাসাঠাসি ভিড়। এগোতে এগোতে আর জায়গার খোঁজে কম্পার্টমেন্ট দেখতে দেখতে বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে শঙ্কর বলল, এই ঘণ্টার গাড়িতে ভিড় লেগেই আছে–
যাই হোক, গায়ের জোরেই ঠেলাঠেলি করে একটা কামরায় আগে উঠল সে। মালের ঠেলায় অনেকে এদিক-ওদিক সরে যেতে বাধ্য হল। বলতে গেলে বেশির ভাগই আধাভদ্র আর নিম্নশ্রেণীর যাত্রীর ভিড়। অবশ্য ভদ্রলোকও দু’পাঁচজন নেই এমন নয়। নিজে উঠে হাত বাড়িয়ে যশোমতীর হাতের ঝোলাটা নিল শঙ্কর সারাভাই। তারপর দু’হাতে ভিড় ঠেলে সরিয়ে তাকে ওঠাবার চেষ্টা করতে করতে বার কয়েক হাক দিল, এই ভাই সরো না, মহিলা উঠতে পারছেন না দেখছ না!
ভিড় ঠেলে ওঠার অভ্যেস থাকলে যশোমতী উঠতে পারত। নেই বলেই পেরে উঠছে না। এক হাতের মুঠোয় কাগজ, অন্য হাতে হ্যাণ্ডেল ধরেছে কোনো রকমে। কিন্তু তারপর লোক ঠেলে ওঠা আর সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু এরই মধ্যে তার চাকতে মনে হল কি। এক বিপদের ফাঁকে আর এক বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার আশা। মুহূর্তে শঙ্কর সারাভাইয়ের দিকে একবার চোখ চালিয়ে সকলের অলক্ষ্যে অন্য হাতের খবরের কাগজটা টুপ করে ফেলে দিল সে।
ওদিকে সৰিক্ৰমে দু’হাতে ভিড় সরিয়ে শেষে একহাতে প্রায় তাকে টেনেই তুলল শঙ্কর সারাভাই। তবু দু’দিকের চাপাচাপিতে যশোমতীর মুখ লাল। ঘেমেই উঠেছে। শঙ্কর সারাভাই এবারে একে মিষ্টি কথা বলে, ওকে রূঢ় কথা বলে নিজের মাল রাখার জায়গা করল আগে।
ওদিকে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।
যশোমতী বসার জায়গা পায় নি তখনো। গা বাঁচিয়ে একটু সরে দাঁড়াবে কোথাও, এমন ফাঁকও নেই। বিশ বছর বয়েস পর্যন্ত সে এই জগতেই বিচরণ করে এসেছে কিনা ঠাওর করতে পারছে না। যাদের দেখছে, তাদের যেন আর কখনো সে দেখে নি।
