বামের কোন কোন ভদ্রলোক রমণীর প্রতি অনুকম্প বশত ছি-ছিও করে উঠল। যশোমতীর সমস্ত মুখ টকটকে লাল। খানিক আগের বচসার পর এই লোকটাই অর্থাৎ শঙ্কর সারাভাই আবার বিনা টিকিটের যাত্রিণীর পক্ষ নিয়েছে বলেই হয়তো কণ্ডাক্টরের গো চাপল। বলে উঠল, আমার ডিউটি পয়সা আদায় করা, টিকিট চেয়েছি তার মধ্যে অত কথার দরকার কি? ব্যাগ হারিয়েছে বলে আপনার অত দরদ হয়ে থাকে তো আপনিই দিয়ে দিন না ভাড়াটা-টার্মিনাস পর্যন্ত দশটা পয়সা তো ভাড়া এখান থেকে।
আমি দিয়ে দেব! পয়সা দেবার নামেই শঙ্কর সারাভাইয়ের গলা শমে নেমে এল।–বা রে, ভদ্রমহিলা হঠাৎ বিপদে পড়েছেন তাই বলছিলাম, আমি–আমি দিতে যাব কেন?
কণ্ডাক্টর বলল, তাহলে আর বেশি সহানুভূতি না দেখিয়ে চুপ করে বসে থাকুন।
ওদিক থেকে রসালো উক্তি, দিয়েই ফেলুন দাদা–দশ পয়সায় হীরো হবার মওকা ছাড়বেন না।
আবার হাসির রোল, আবারও ভদ্রলোকদের কারো কারো ছি ছি। বাসটা থামলে যশোমতী নেমে পড়ে বাঁচত। কিন্তু তার মুখের দিকে চেয়ে সামনের লোকটার কি হল কে জানে। শঙ্কর সারাভাই মুহূর্ত থমকালো মুখের দিকে চেয়ে। ইচ্ছেয় হোক অনিচ্ছেয় হোক, একটা হাত আপনা থেকেই নিজের পকেটে গিয়ে ঢুকল, তারপর পকেট থেকে ব্যাগ বার করে দশটা পয়সা কণ্ডাক্টরকে দিয়ে বলল, একটু ভদ্রতা শিখতে চেষ্টা করো? বুঝলে কণ্ডাক্টরের কাজ আর কশাইয়ের কাজ এক জিনিস নয়–এই নাও তোমার টিকিটের দাম।
স্বাস্থ্যের দিকে চেয়েই হোক বা যে কারণেই হোক, কণ্ডাক্টর বিনাবাক্যে টিকিট কেটে সেটা শঙ্করেরই হাতে দিল।
–এই নিন। টিকিটটা যশোমতীর দিকে বাড়িয়ে চাপা রুক্ষ মেজাজে শঙ্কর বলল, বাসে উঠলে ব্যাগ খোয়া যায়, পথে-ঘাটে একা বেরোন কেন আপনারা!
আর মনে মনে বলল, দশ-দশটা পয়সা গচ্চা, কি কুক্ষণে মুখ খুলতে গেছলাম–
যশোমতীর মনে হল, তার বাবার মতোই কেউ যেন আবার একপ্রস্থ বিদ্রূপ করল। রাগ হচ্ছে, আবার অসহায় বোধ করছে। টিকিটটা লোকটার মুখের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে নেমে গেলে হয়। কিন্তু নেমে যাবে কোথায়? হঠাৎ বুঝি দিশেহারা হয়ে পড়েছে সে। পরক্ষণে বিরক্তমুখ লোকটা আবার কাগজে মন দিতে যাচ্ছে দেখে ত্রাসে চমকে উঠল। কোন্ দিক সামলাবে যশোমতী?
নষ্ট করার মতো সময় নেই, ফোটো চোখে পড়লেই হয়েছে। কি মনে পড়তে তাড়াতাড়ি টিকিটটা আবার তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করল, এতে আপনার ঠিকানাটা লিখে দিন দয়া করে।
কেন?
কেন বুঝতে পারছেন না? দু’চোখ একটু বেশি স্পষ্ট করেই তার মুখের উপর তুলে ধরল।
পয়সা ফেরত দেবেন? বাসের মধ্যে আমি কলম নিয়ে বসে আছি?
বিরক্ত মুখেই অন্য দিকে ফিরল শঙ্কর সারাভাই। এদিকে বাসের মধ্যে আবার একটা লঘু রসের সূচনা হতে যাচ্ছে দেখে যশোমতী চুপ করে গেল। কিন্তু যেটুকু হল, তাতেই লোকটার কাগজের প্রতি মনোযোগ কমেছে মনে হল। উসখুস দৃষ্টিটা দুই-একবার ফিরল এদিকে। সদ্য-সঙ্কটে এর থেকে বেশি আর কিছু কাম্য নয়, তাই দুই একবার পাল্টা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পুরুষের রূঢ়তায় অপমানিত বোধ করার মততই মুখ করে বসে রইল যশোমতী।
স্টেশন।
মোটের বোঝা নিয়ে লোকটা নামল। পিছনে যশোমতী। স্টেশনে যাবে বলেই বাসে উঠেছিল সে-ও। তারপর কোথায় যাবে ঠিক করেনি। সবার আগে এই জায়গাটাই ছাড়তে চেয়েছিল সে। সবার আগে বাবার কাছ থেকে দূরে সরতে চেয়েছিল। ভেবেছিল, ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে দূরপাল্লার যে-কোনো একটা ট্রেনে উঠে পড়বে, তারপর বেশি রাতে যে-কোনো একটা স্টেশনে নামবে। তারপর যা হয় হবে।
কিন্তু মাথায় আকাশ ভেঙেছে এখন। ব্যাগ চুরি যাবার দরুন নিজের ওপরেই ভয়ানক রাগ হচ্ছে তার। সকলের ওপর রাগ হচ্ছে। এমন কি ওপরওয়ালার ওপরেও। তাকে জব্দ করার জন্যই এ যেন চক্রান্ত একটা। জব্দ কি সোজা জব্দ! পঙ্গু অবস্থা। যশোমতী কি করবে এখন? ওই রকম চিঠি লিখে কাল বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, আর আজ নিজেই ফিরে যাবে? বাবা কিছু বলবে না, কিন্তু মনে মনে হাসবে। প্রাণ খুলে হাসবে। সে-হাসি যশোমতী যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। মেয়েরা কত অসহায় আর কত অপদার্থ, সেই নজিরই পাকা-পোক্ত হয়ে থাকবে বাবার মনে। দুনিয়া দেখতে বেরিয়ে একদিনেই এ-রকম নাজেহাল হয়ে ফিরে যাবে? আভিজাত্যের শো-কেসই যে তাদের উপযুক্ত জায়গা, ফিরে গিয়ে এটাই ঘটা করে প্রমাণ করবে?
তার থেকে মরে যাওয়া ভাল। রাগে দুঃখে ক্ষোভে মরে যেতেই ইচ্ছে করছে যশোমতীর। কিছুটা নিজের গোচরে কিছুটা বা অগোচরে স্টেশনেই এসে দাঁড়াল সে। আর সেই মুহূর্তেই স্থির করল নিজে থেকে সে কিছুতে বাড়ি ফিরবে না, এর থেকে বাবার তল্লাসীর জালে ধরা পড়ে বাড়ি ফেরা ভাল। কাগজে ছবি তো ছাপিয়েইছে। আরো কতভাবে খোঁজাখুজি চলেছে কে জানে। ধরা পড়েই যদি তাতে সম্মানটা অন্তত বাঁচবে। কেউ বলবে না অযোগ্য বলে ফিরে এলো। বাবা রাগ করতে পারে, হাসবে না।
আর ধরা যদি না পড়ে, যা কপালে থাকে হবে। গায়ে যা গয়না আছে তারও দাম নেহাত কম হবে না। অবশ্য বেশি ভারী গয়না সে পরে না। তবু হাতের হীরে-বসানো বালা দুটোর দামই তো যা খোয়া গেছে তার থেকে ঢের বেশি। তার ওপর হার আছে, দুল আছে–আঙুলে মুক্তোর আংটি আর কব্জিতে দামী ঘড়িও আছে। দেখা যাক–
