কিন্তু দশ পয়সার বাড়তি টিকিটের এই নাটকটা ভয়ানক বিস্ময় কর মনে হল তার। স্থান-কাল ভুলে সামনে উপবিষ্ট লোকটাকেই হাঁ করে দেখছে সে। দশটা পয়সার জন্য একজন এ-রকম করছে বলে সঙ্কোচ যেন তারই। দেখল লোকটারই জিত হল, বাড়তি দশটা পয়সা শেষ পর্যন্ত দিলই না। কণ্ডাক্টর হাল ছাড়ল বটে, কিন্তু তার মুখ রাগে কালো।
কণ্ডাক্টরকে ছেড়ে যশোমতী সামনের বিজেতা মূর্তিটি নিরীক্ষণ করতে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভিতর প্রচণ্ড ধাক্কা। আচমকা একটা সঙ্কট বুঝি গ্রাস করতে আসছে তাকে। লোকটার মুখের সামনে খবরের কাগজ বাস চলার বাতাসে কাগজের একটা কোণ উড়তে ভিতরের পাতাটা দেখা যাচ্ছে। বার বার দেখা যাচ্ছে। সেই পাতায় কি দেখল যশোমতী পাঠক?….একবার….দু-বার….তিন বার দেখা গেল ভিতরের ছবিটা। নিজের ছবি নিজের কাছে এমন বিপদের কারণ হতে পারে সে-কি কল্পনা করাও সম্ভব? কাগজের তলার কোণটা বাতাসে ওপরের দিকে উঠলেই ছবিটা দেখা যাচ্ছে– তারই ফোটো।
যশোমতী কি যে করবে ভেবে পেল না। মুখ লাল, কান গরম, দম বন্ধ করে ছটফট করতে লাগল সে। ধরা বুঝি পড়েই গেল। এই মুহূর্তে দুনিয়ায় ওই কাগজটা ভিন্ন আর বুঝি কোনো সমস্যা নেই তার সামনে। ইচ্ছে করল লোকটার হাত থেকে কাগজটা কেড়ে নিয়ে জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
টিকিট?
যশোমতী চমকে উঠে আত্মস্থ হল। তারই টিকিট চাইছে কণ্ডাক্টর। এতক্ষণ ভিড় ঠেলে আসতে পারেনি বলে টিকিট হয়নি। তাড়াতাড়ি পাশের বড় শৌখিন ব্যাগটার উদ্দেশে হাত বাড়ালো যশোমতী। কিন্তু হাতে কিছু না ঠেকতে সবিস্ময়ে পাশের দিকে। মুখ ফেরালো।
ব্যাগ নেই।
যশোমতী প্রথমে বিমূঢ়, তারপর রাজ্যের বিস্ময়। সে ঠিক দেখছে কিনা বা ম্যাজিক দেখছে কিনা, বুঝছে না। পাশে ব্যাগ রেখে সে নিশ্চিন্ত মনে এই অভিনব গণ-যাত্রার কষ্ট আর রোমাঞ্চ অনুভব করছিল। তারপর সামনের লোকটার এই দশ পয়সার ঝগড়া দেখতে দেখতে কিছুই আর খেয়াল ছিল না। আর তারপর ওই ছবির ধাক্কা। পাতা ওল্টালে যে ছবি চোখে পড়বেই, আর তারপর….ধরণী দ্বিধা হও….
টিকিট? বিরক্ত কণ্ডাক্টর দ্বিতীয়বার তাড়া দিল।
মাথায় যেন আকাশ ভেঙেছে যশোমতীর। এ-দিক ও-দিক আর বেঞ্চির নিচেটা দেখল একবার। নেই। নেই কেন তখনো মাথায় আসছে না। তখনো বুঝতে পারছে না পাশ থেকে ব্যাগটা কোথায় উড়ে যেতে পারে। যশোমতী জেগে আছে না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কেবল বিপদের স্বপ্ন দেখছে!
সুদর্শনা রমণীর মুখের এই বিমুঢ় সঙ্কট-কারু অনেকেই লক্ষ্য করল। চোখ পড়লে চোখ ফেরানো শক্ত। যেন চাপ রক্ত এসে জমছে মুখে। কিছু একটা হয়েছে সেটা অন্তত বোঝা গেল। একজন যাত্রী জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে? ।
আমার ব্যাগটা….!
কোথায় ছিল? কোথায় ছিল? কি ব্যাগ? কেমন ব্যাগ? অনেকে মুখর, অনেকে উৎসুক।
যশোমতী পাশের চার আঙল শূন্য জায়গাটার দিকে অসহায় চোখে তাকালে শুধু।
কতবড় ব্যাগ? এই ভিড়ে ব্যাগ কেউ পাশে রাখে! এক মুখেই কৌতূহল আর উপদেশ।
আর একজন মন্তব্য করল, নিয়ে সরে পড়েছে কেউ, উপকার করেছে–
অন্য একজনের মন্তব্যে প্রচ্ছন্ন সংশয়, ব্যাগ সত্যি সত্যি ছিল তো, না উনি আনতে ভুলে গেছেন?….হাতের ওপর থেকে ব্যাগ টেনে নিলে টের না পাবার কথা নয়। এক কথায়, ব্যাগ হারানোটা অজু হাত কিনা এও বিবেচনার বিষয়।
যশোমতী জবাব দেবে কি, সে অকূলে পড়েছে। সমস্ত মুখ ঘেমে লাল। অসহায় দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকাতেই চোখাচোখি হল যার সঙ্গে, সে শঙ্কর সারাভাই। মুখের সামনে থেকে কাগজ সরিয়ে সে ঘটনাটা বুঝতে চেষ্টা করছে।
এই মুহূর্তে ভিতরের পাতার ছবি চোখে পড়ার সঙ্কট থেকে যশোমতী বাঁচল বটে, কিন্তু তপ্ত কড়া থেকে জ্বলন্ত আগুনে পড়ার মতো অবস্থা তার।
কণ্ডাক্টরের মেজাজ এখনো প্রসন্ন হয়নি, তাছাড়া পথে-ঘাটে এ-রকম অনেক আধুনিকার চাল-চলন তার জানা আছে। পয়সা ফাঁকি দেওয়ার ব্যাপারে অতি আধুনিকারা ছেলেদের থেকে কোনো অংশে কম যায় না বলেই তার ধারণা।
সুন্দর মুখ দেখে সে ভুলল না, গম্ভীর মুখে বলল, তাহলে নেক্সট স্টপে নেমে যান।
অমনি শঙ্কর সারাভাইয়ের পুরুষকার চাড়িয়ে উঠল। কণ্ডাক্টরের অকরুণ উক্তি বরদাস্ত করা সম্ভব হল না। প্রতিবাদ করল, ব্যাগ চুরি গেছে মহিলার, এ-ভাবে বলার অর্থ কি?
কণ্ডাক্টর তার দিকে ফিরল, গম্ভীর মুখে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল, ব্যাগ চুরি গেছে আপনি দেখেছেন?
–আমি দেখব মানে! দেখলে চুরি যাবে কেন?
তাহলে চুপ করে থাকুন।
–কেন চুপ করে থাকব, শঙ্কর সারাভাই গর্জন করে উঠল, একজন মহিলার ব্যাগ চুরি গেছে শুনেও তুমি এভাবে কথা বলবে কেন? ভদ্রতাজ্ঞান নেই?
ব্যস, দ্বিতীয় প্রস্থ শুরু হল। যশোমতী পাঠক নির্বাক দর্শক। ভিড়ের ওধার থেকে একজন টিপ্পনী কাটল, একটু আগে তো নিজের স্বার্থে দিবি এক-প্রস্থ লড়েছেন। এখন কণ্ডাক্টর তার ডিউটি করছে তার মধ্যেও আপনার অত শিভালরি দেখাবার কি হল মশাই?
মুখ আড়াল করে ওধার থেকে আর একজন প্রায় অভব্য টীকা ছুঁড়ল, আ-হা, আপনারই বা কি কাণ্ডজ্ঞান মশাই, শিভালরি দেখাবার মতো সীচুয়েশন যে!
রাগে শঙ্কর সারাভাই ভিড়ের মধ্য থেকে বক্তা দুটিকে তক্ষুনি আহ্বান জানালো, কারা বলছেন এদিকে এগিয়ে আসুন মশাই সাহস করে, আড়াল থেকে কেন–
