মেসোর এত উদারতায় পাছে মাসির সন্দেহ হয় সেই ভয়ে শঙ্কর তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ঠিক আছে। এবার আমাকে শিগগীর কিছু খেতে দাও মাসি, সকাল থেকে এখন পর্যন্ত কিছু খাওয়াই হয় নি।
০৬. এক হাজার টাকা
এক হাজার টাকা মাসি ঘরের বাক্স থেকেই বার করতে পেরেছিল। বলেছে, কুড়িয়ে বাড়িয়ে হয়ে গেল দেখছি, আবার ব্যাঙ্কে যাবি, চেক ভাঙাবি–তোর সুবিধেই হল।
সকালে বাড়ি থেকে বেরোবার আগে মেসো বার পাঁচেক তাকে সাবধান করেছে আবার যেন টাকাটা খোয়া না যায়। কোথায় কোন্ পকেটে রাখল, অন্য কাগজপত্রের সঙ্গে মিশে গেল কিনা দেখে নিয়ে আর এগিয়ে দিতে এসে শেষ বারের মতো আরো বার দুই সতর্ক করে তবে ভদ্রলোক ছেড়েছে তাকে।
আবারও মনটা খিঁচড়ে গেছে শঙ্কর সারাভাইয়ের। টাকাটা মেসোর পকেটে গুঁজে দিয়ে পালাতে ইচ্ছে করেছে। না পেরে নিজের ওপরেই দ্বিগুণ আক্রোশে জ্বলছে। চোয়াল দুটো শক্ত হয়েছে তার। ফ্যাক্টরী বাঁচানো নিজে বাঁচার সামিল। ওটার সঙ্গে তার সত্তার যোগ। সে শেষ দেখবে। শেষ দেখার আগে এই যোগ ছি ভূতে দেবে না।
কি-কি চাই তার লম্বা লিস্ট একটা করাই ছিল। নগদ টাকা ফেললে মাল তুলতে কতক্ষণ আর। মস্ত একটা সুতোর মোট আর অন্যান্য বহু টুকিটাকি উপকরণের তেমনি বড়সড় একটা বোঁচকা নিয়ে প্রায় গলদঘর্ম হয়ে স্টেশনের বাসে উঠল শঙ্কর সারাভাই।
ওঠার মুখেই ছোটখাট অপ্রিয় ব্যাপার ঘটে গেল একটা। সেদিনের অর্থাৎ কুড়ি বছর আগের পাবলিক বাসের অবস্থা আজকের মতো ছিল না। লোক গুণে ভোলা হত না। ঠাসাঠাসি ভিড় হত, যার শরীরের তাগত বেশি সে-ই উঠে পড়ত। আর স্টেশনের বাসে ভিড় তত লেগেই আছে।
পর পর দুখানা বাস ছাড়তে হয়েছে। সঙ্গের মোট দেখে ড্রাইভার বাধা দিয়েছে। তাছাড়া ভিড়ও খুবই বেশি ছিল। মেজাজ এমনিতেই বিগড়ে ছিল শঙ্কর সারাভাইয়ের। মাসির হাত থেকে টাকা হাতে নেবার সঙ্গে সঙ্গে ভিতরটা সেই যে তেতে আছে এখনো ঠাণ্ডা হয়নি। ফাঁক পেলেই ভিতর থেকে কে যেন চোখ রাঙাচ্ছে এরকম মিথ্যা আর ভাওতাবাজির ওপর ক’দিন চলবে? পরক্ষণে নিজের ওপরে দ্বিগুণ বিরক্ত, মাসির কাছে তো একেবারে মিথ্যে বলতে হয়নি, আধা-সত্যি যা তাই জেনেছে মাসি। টাকা ব্যবসার জন্যেই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাত দিনের মধ্যে টাকা ফেরত দেওয়া যে সম্ভব হবে না সেটা শঙ্করের থেকে বেশি আর কে জানে? তাছাড়া শিগগীর আর এই শহরে আসা হবে না। এলেও মেসোর কাছ থেকে গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। মাসিকে অবশ্য মেসো কখনোই বলতে পারবে না কোন্ মতলবে সে-ও দরাজ মুখে টাকা বার করে দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। ফলে বাড়িতে অন্তত মেসো প্রকাশ্যে রাগারাগিও করতে পারবে না। কিন্তু মনে মনে তাকে ভস্ম করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। টাকা হাতে এলে বা দিন ফিরলে মেসোর টাকা সে কড়ায়-ক্রান্তিতে শোধ করে দেবে কেবল একটু সময় চাই। আবার এও মনে হল, তেমন দিন কোনোদিন আসবে এমন ভরসা শঙ্কর সারাভাই করে কি করে?
এর ওপর দু’দুটো বাস ছাড়তে হওয়ায় মেজাজ আরো গনগনে হয়ে আছে। ওপরওয়ালার কিছু চক্রান্ত ছিল বলেই শঙ্কর সারাভাই তৃতীয় বাসখানায় উঠতে পারল।
বাস-কণ্ডাক্টর বাধা দেবার অবকাশ পেল না। পেল না বলেই তার রাগ। ভিড়ের মধ্যে মাল নিয়ে ওঠার জন্য গজগজ করতে লাগল। তার কথায় ভ্রূক্ষেপ না করে শঙ্কর সারাভাই যতটা সম্ভব ভিতরে সেঁধিয়ে যেতে চেষ্টা করল। তাতে লোকের অসুবিধে হল বটে কিন্তু নিজে সুফল পেল। ঠিক সামনের সীটটির থেকেই একজন উঠল আর সঙ্গে সঙ্গে একে-ওকে ঠেলে শঙ্কর সারাভাই সে জায়গাটি দখল করল।
ঘেমে নেয়ে গেছে। ঘাম মুছে ঠাণ্ডা হতে না হতে কণ্ডাক্টর টিকিটের জন্য হাত বাড়াল। তারপরেই তুমুল বচসা।
কণ্ডাক্টর মালের জন্য দু’খানা বাড়তি টিকিট নেবে, শঙ্কর সারাভাই একটার বেশি বাড়তি টিকিট করবে না।
কণ্ডাক্টর না-ছোড়, মালের জন্য দুটো টিকিট কাটতে হবে। শঙ্কর সারাভাই তিরিক্ষি মেজাজে প্রতিবাদ করল, কেন, দুটো টিকিট কাটব কেন?
তাহলে নেমে যান।
কি? আবদার নাকি? একটা মাল তো বেঞ্চির তলায় ঢুকিয়েছি–একটা টিকিট নিচ্ছি এই বেশি।
ঝগড়া বেধে গেল। কণ্ডাক্টরও ছাড়বে না, সে-ও দেবে না। যাত্রীরা অনেকে বিরক্ত, অনেকে দুই দলে ভাগ হয়ে গেল। বচসাটা একজনের মুখ থেকে আর একজন লুফে লুফে নিতে আরম্ভ করল। এদিকে পাশের লেডীস সীটে বসে কোনো সুদর্শনা রমণী যে দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে দুনিয়ার তাজ্জব কাণ্ড দেখছে কিছু– শঙ্কর অন্তত তা আদৌ লক্ষ্য করেনি। দশ পয়সার একটা টিকিটের জন্য যে জগতে এরকম কাণ্ড হয় বা হওয়া সম্ভব, মেয়েটির ধারণা নেই।
ওপরওয়ালার চক্রান্ত জটিল বলেই বাসের এই মেয়ে যশোমতী পাঠক। জীবনে এই প্রথম সে বাসে উঠেছে। ওঠার পর থেকে। তার দম বন্ধ হবার উপক্রম। ঠাসাঠাসি ভিড়। ওপরের রড থেকে হাত ফসকালে একসঙ্গে পাঁচ সাতটা লোক তার গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়া বিচিত্র নয়। উঠেই ভেবেছিল নেমে গিয়ে ট্যাক্সি করলে হয়। এভাবে মানুষ যায় সেটা আগে সে চোখে হয়তো দেখেছে, কষ্টটা অনুভব করেনি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কেউ যেন চোখ রাঙালো তাকে। সে মাটির ওপর দিয়ে চলবে বলেই বেরিয়েছে। মাটির ওপর দিয়ে হাঁটবে বলেই বাবার আভিজাত্যের শো-কেস থেকে বেরিয়ে এসেছে। না, আরামের প্রশ্রয় দেবে না, এত লোক যাচ্ছে কি করে?
