কিন্তু পাঠাবার মতো হলেও শঙ্কর সারাভাই তা পাঠাত না নিশ্চয়। কারণ তার ধারণা, চেম্বারের বিচারকদের মান যাচাইয়ের পর্বটা প্রহসন মাত্র। এ যাবত অনেকবার সে একজিবিশনে গিয়ে স্বচক্ষে সব স্যাম্পল পরখ করে এসেছে। তার বিবেচনায় যে কাপড়ের পুরস্কার পাওয়া উচিত, তা একবারও পায়নি। অতএব তার বিশ্বাস ধরপাকড় তদবির-তদারক আর সুপারিশের জোর যার বেশি পুরস্কার শুধু সে-ই পেয়ে থাকে। আর, চেম্বারের দিক থেকে ওই ঘটা করে পুরস্কার দেওয়ার একমাত্র লক্ষ্য শুধু যে আত্মপ্রচার, একজিবিশন এলাকার মধ্যে দাঁড়িয়েই সে অনেক সময় নির্দ্বিধায় সেই মতামত ব্যক্ত করেছে। সমস্ত কাগজে বড় বড় হরপে প্রতিষ্ঠানের উৎসবের বিজ্ঞপ্তি বেয়োয়, অনুষ্ঠানের বিবরণ ছাপা হয় ক’দিন ধরে, পুরস্কার-সভার বড় বড় ছবি বেরোয়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের প্রতি চেম্বারের দরদের কথা ফলাও করে লেখা হয়। এই প্রচার-গত সুনামের মূল্য এক লক্ষ টাকার পুরস্কার মূল্যের অনেক গুণ বেশি।
এই কারণেই শঙ্করের নিস্পৃহতা। কিন্তু তা হলেও প্রতিষ্ঠানের নিয়ামকটির অর্থাৎ চন্দ্রশেখর পাঠকের শক্তির বুদ্ধির আর বিচক্ষণতার প্রশংসা না করে পারে না সে। মানুষটি ব্যবসার ধারা আমূল বদলে। দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর সামান্য অবস্থা থেকে শিল্পপতিদের মধ্যে ভলোক আজ সর্বাগ্রগণ্য যে তাতেও ভুল নেই। আজ তাকেই দেখল।
অনেকক্ষণ অন্যমনস্ক ছিল শঙ্কর। সমস্ত পথ মেসো কি বলল আর কি উপদেশ দিল কানেও ঢোকেনি ভালো করে। মনটা মাঝে মাঝে বিষণ্ণ হয়ে পড়ছিল। দুই একবার মনে হয়েছে, থাক্ কাজ নেই মাসির বাড়ি গিয়ে, মেসোকে যা-হোক দুই এক কথা বলে এখান থেকেই চলে গেলে হয়। কিন্তু অদৃশ্য একটা টানে এসেই গেল শেষ পর্যন্ত। মৌলার বাড়ি থেকে বেরুবারে আগে পর্যন্ত অনেক ভেবেছে, সমস্ত পথ ট্রেনে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে করতে এসেছে। এখন এফরাও শক্ত। না, ফিরতে সে চায় না। ফ্যাক্টরীর কথা মনে হলেই অটুট সঙ্কল্পে চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে যায় তার, এক একটা সঙ্কটে সমস্ত নীতিবোধ আর বিবেকের যাতনা দু’হাতে ঠেলে সরিয়েই সে যেন সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়। ব্যবসাটা তার চোখে যেন বিকলাঙ্গ অপুষ্ট শিশু একটা। সরঞ্জাম যোগাতে পারলে আর পুষ্টির ব্যবস্থা করলে সেটা শক্ত সমর্থ পরিণত রূপ ফিরে পেতে পারে।
শঙ্কর সারাভাই কোনো ব্যবস্থাই করতে পারছে না। চোখের সামনে ওই শিশুর তিলে তিলে ক্ষয় দেখছে সে। এই পরিতাপের শেষ নেই। তাই আজ সে বিবেক নামে বস্তুটার একেবারে বিপরীত দিকে মুখ করে মেলা থেকে রওনা হয়ে পড়েছে।
তাকে দেখামাত্র মাসি অনুযোগ করল একপ্রস্থ। দু’মাসের মধ্যে দেখা নেই এমন আপনার জন এলেই বাকি না এলেই বা কি, ইত্যাদি ইত্যাদি।
শেষে বোনপোর প্রস্তাব শুনে মাসির দু চোখ কপালে। এক হাজার টাকা চাই। এ আবার কি সাতিক কথা। এক হাজার টাকা কি দুই একশ টাকা নাকি সে চাইলেই বার করে দিতে পারবে।
মাসি মহিলাটি বাইরে রুক্ষ ভিতরে নরম। একটা ব্যাপারে তার খটকা লাগতে পারত, কিন্তু লাগল না। বোনপো সাধারণত টাকা গয়না চাইতে হলে মেসোর আড়ালে চায়। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে দু’জনে একসঙ্গে এসেছে আর হাজার টাকা চাওয়া সত্ত্বেও ঘরের লোকটার মুখ বিকৃত হল না। টাকার অঙ্কটা বড় বলে মাসির নিজেরও একটু ধাক্কা লেগে থাকবে হয়তো, তাই মেসো মুখ ভার বা মনোভাবের প্রতি তক্ষুনি সচেতন হতে পারেনি। শঙ্কর বলল, টাকা না দিলে এবারে মরেই যাব মাসি-মস্ত একটা বায়না নিয়েছি, কাজ শেষ হলেই এই প্রথম মোটা কিছু ঘরে আসবে–ব্যবসা দাঁড় করানোর ধকলও কিছুটা সামলে যেতে পারব হয়তো। মাত্র সাত দিনের মতো চাই, লাভের চার আনা অংশও না হয় আসলের সঙ্গে ফেরত দিয়ে যাব–কিন্তু টাকাটা না দিলেই নয়।
মাসি তক্ষুনি রেগে গিয়ে জবাব দিল, তোর লাভের টাকা তুইই ধুয়ে জল খাস, আমাকে আর লোভ দেখাতে হবে না। কিন্তু আমি টাকা পাব কোথায়, বড় জোর পঞ্চাশ ষাট টাকা দিতে পারি।
মাসির মনে মনে ধারণা এই করে বড় জোর একশ টাকার মধ্যে রফা করে ফেলবে। কিন্তু ধারণাটা গণ্ডগোলের দিকে টেনে নিয়ে গেল ঘরের লোকটাই।
ঈষৎ সহানুভূতির সুরে মহাদেব বলল, মুশকিল হয়েছে এটাকে এক রকমের বিপদও বলা যেতে পারে আবার সুদিনের আশাও বলা যেতে পারে। অর্ডার ক্যানসেল করতে হলে বিপদ, সাপ্লাই করতে পারলে আশা।….দিন রাত ফ্যাক্টরীটাকে নিয়ে এত খাটছে এত পরিশ্রম করছে, হাজার খানেক টাকায় দিন যদি ফেরে….দিলে হত।
এবারে অবশ্য একটু অবাক হবারই পালা মাসির। কিন্তু সেই সঙ্গে একটা উল্টো ধারণা জন্মালে আবার। হাজার টাকারই দরকার তাহলে, আর সেটা এমনই দরকার যে ঘরের লোক পর্যন্ত সদয়। বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে মহিলা বলে উঠল, কিন্তু অত টাকা আমি পাব কোথায়, ঘরে থাকে নাকি?
মাথা চুলকে মেসো জবাব দিল, তাই তো ঘরে আর এত টাকা কোথায়।
চকিত ইশারাটা শঙ্করের বুঝে নিতে একটুও বেগ পেতে হল না। বলল, ঠিক আছে, মেসো চেক্ দিক একটা, কাল প্রথম দিকেই ভাঙিয়ে নিয়ে কাজ সারব।
মাসি কিছু বলার আগে মেসো মন্তব্য করল, তাতে যদি হয় তোর সে ব্যবস্থা অবশ্য করা যেতে পারে নইলে ঘরে কার আর অত টাকা মজুত থাকে….
